ফিলিস্তিনে সংঘাত
ড. হাসান আল নাবিহ, শিক্ষক, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব গাজা
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৪ ১৪:৪৪ পিএম
গাজায় ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞে বেসামরিক অবকাঠামো, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, হাসপাতাল, খাবারের দোকানÑকিছুই অবশিষ্ট নেই। গত এক বছরে গাজায় নিহতের সংখ্যা ৪২ হাজার ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছেন এক লক্ষাধিক মানুষ। ১০ হাজার মানুষ নিখোঁজ। ক্ষতিগ্রস্তের অধিকাংশই নারী ও শিশু। অক্টোবরে হামলার পর থেকেই আমি জাতিসংঘের একটি বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছি আমার পরিবারসহ। বাস্তুচ্যুত হওয়ার হতাশা তো রয়েছেই, পাশাপাশি মায়ের মৃত্যুতেও আমি ভেঙে পড়েছি। আমার মা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বাধায় পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাননি।
গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অভিযানে পেশাগতভাবেও আমি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব গাজা ধ্বংসের পর আমার কর্মক্ষেত্র নেই। গাজায় আরও ১৮টি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দেওয়ায় অন্তত ৮৭ হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষাবঞ্চিত। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পর আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিই ১৯৯৭ সালে। এখানেই স্থানীয়ভাবে গবেষণা করি এবং ফিলিস্তিনের সাহিত্য নিয়ে অনেক নিবন্ধ লিখি। মাস্টার্সের কয়েকজনের থিসিসেরও সুপারভাইজ করেছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭ হাজার শিক্ষার্থী ছিল যার ৬৩ শতাংশই নারী। সারা বছর শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে ভালো শিক্ষা অবকাঠামোগত সুবিধাই দেওয়া হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগটিই সবচেয়ে বড়। ১৫০০ শিক্ষার্থী অন্তত ৬টি ভিন্ন প্রোগ্রামে ভর্তি হতে পারেন। যেহেতু শিক্ষকতা আমি উপভোগ করি, তাই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ক্যাম্পাসটি ধ্বংস করে দেওয়ার পর আমার হৃদয় একেবারে ভেঙে পড়েছে।
গত বছর অক্টোবরেই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালায়। তারা নভেম্বর পর্যন্ত হামলা চালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো অবকাঠামো ধ্বংস করে ফেলে। এখন সেখানে কিছুই নেই। গত ১২ মাসে আমি কোনো ক্লাস নিতে পারিনি। করোনা মহামারির সময়েও অন্তত অনলাইনে ক্লাস নিতে পেরেছি। এখন জানিও না আমার শিক্ষার্থীরা কে কোথায় আছে। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা করছে। বিশেষত টেলিকমিউনিকেশন যন্ত্রগুলোকে তারা প্রথমেই নিশানা করে। গাজায় যেন কোথাও শিক্ষাদান না করা যায় সে লক্ষ্য তাদের ছিল। সামান্য হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ দেখার জন্য এখন আমাকে ইন্টারনেট টিকিট কিনতে হয়। তাও আশ্রয়কেন্দ্র থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেক দূর যেতে হয়। এত বাধা সত্ত্বেও আমি আমার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেছি। আমরা এখন ফোন কিংবা টেক্সটে কথা বলি। যখনই কথা হয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিচারণ করে আমরা কাতর হয়ে উঠি।
গাজার শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত। তবে আমি তাদের সঙ্গে আলাপ করে বুঝেছি, ঝুঁকিতে ইতিবাচক মনোভাব রাখাও একধরনের প্রতিবাদ। ফিলিস্তিনে যত শিক্ষক আছে তাদের সবার এখন এই দায়িত্বপালন করতে হবে। সবচেয়ে ভয়াবহ সময়েও আশার সামান্য আলোর সঞ্চার করতে হবে। এজন্যই এই লেখাটিকে আমি বর্তমানকালে বলে যাচ্ছি। আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়কে এখনও অস্তিত্বমান ভাবি। বিশ্ববিদ্যালয়টি নেই তা বলিনি। এর কারণও আছে।
এবারই প্রথম গাজার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসরায়েলিরা হামলা করেছে এমন নয়। অতীতেও একাধিকবার করা হয়েছে। প্রতিবারই গাজার শিক্ষাঙ্গনকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আবার সেগুলোকে গড়ে তোলা হয়েছে। শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশও ফিরিয়ে আনা হয়েছে। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থায় অভিযোগ জানিয়েছে। ফিলিস্তিনের শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষার অধিকার নিশ্চিতের জন্যও কাজ হচ্ছে। তবে বিষয়টি এখনও গুরুত্ব সহকারে কেউ আলোচনা করেনি। তবে অনেক সাংবাদিক বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। কোনো একটি অঞ্চলে তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষাবঞ্চিত করার অভিযোগটি তারাই উত্থাপন করছে। এভাবে ফিলিস্তিনের মানুষের প্রতি বিশ্বসমর্থন আরও বেড়েছে।
ইতোমধ্যে গাজার বেইরজিত বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। তারা শিক্ষার্থী ও গবেষকদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছে। গাজায় একাডেমিক কার্যক্রম বৃদ্ধি করার মাধ্যমে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সক্ষম করার বিষয়টি জোর পাচ্ছে। ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে স্থানীয় ও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে চুক্তি করেছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন ইরাসমাস ও এক্সচেঞ্জ স্কলারশিপের মাধ্যমে নিজেদের বড় স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। অনেকে ইতোমধ্যে আমাকে রিকমেন্ডেশন লেটার লিখে দেওয়ারও আবেদন করেছেন। আমি সাগ্রহে লিখে দিয়েছি। ইউটিউবে আমার কয়েকটি কোর্স রয়েছে। সম্প্রতি একজন একটি মেইলের মাধ্যমে জানিয়েছে, সে আমার এই লেকচার শুনে অনুপ্রাণিত হয়েছে এবং সে উচ্চশিক্ষার জন্য সুযোগ পাচ্ছে। তবে উচ্চশিক্ষা শেষে সে আবার গাজায় ফিরবে। এখানের উন্নয়নে অবদান রাখবে। মেয়েটির ল্যাপটপ ইসরায়েলি হামলায় হারিয়ে গেছে। তাও সে আমাকে মেইল করেছেÑ যাতে আমি তাকে কিছু অতিরিক্ত ফাইল দিতে পারি। অর্থাৎ শিক্ষা নেওয়ার কী অদম্য আগ্রহ মেয়েটির মধ্যে। আমি তার এই সংগ্রামকেও নিচু করতে চাই না। মেইলটি পাওয়ার পর বরং আমি নিজ আগ্রহেই তাকে ফাইল পাঠাই।
সম্প্রতি আমার এক থিসিস ছাত্রীকেও আমি জানাইÑ সে যেন ভাইভা সম্পন্ন করে। সে আগ্রহী। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় না থাকলেও শিক্ষার ভাবনা ও একাত্মতা রয়েছে। আমরা যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গেই ভাইবা সম্পন্ন করি। গাজায় এভাবেই এখন শিক্ষাদান সম্পন্ন হচ্ছে। অনেক শিক্ষক তার দায়িত্বপালন করছেন। হয়তো আমাদের যোগাযোগ নেই এবং আমরাও জানিও নাÑ কে কীভাবে আছেন। কিন্তু সবার মধ্যেই নিজ দায়িত্বপালনের আগ্রহ রয়েছে। গত এক বছর গাজার মানুষের জন্য ভয়াবহ কেটেছে। কিন্তু আমাদের হাল ছাড়লে চলবে না। এই সবকিছুরই শেষ আছে। আমরা থাকি কিংবা হারিয়ে যাইÑআমাদের লিগ্যাসি চালিয়ে যেতে হবে। ইসরায়েলি আগ্রাসন থামতে বাধ্য। গাজার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আবার গড়ে উঠবে। ফিলিস্তিনিদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হবেই।
আলজাজিরা থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন