× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অর্থনীতি

নতুন চাহিদা পূরণে প্রয়োজন সঠিক অর্থনৈতিক পদক্ষেপ

ড. নীলাঞ্জন কুমার সাহা

প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৪ ১৪:৩৯ পিএম

নতুন চাহিদা পূরণে প্রয়োজন সঠিক অর্থনৈতিক পদক্ষেপ

বিগত এক দশকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও ক্রনি ক্যাপিটালিজমের কারণে বৈষম্যও বেড়েছে। পদচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সরকারসংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়েছে। এ ধরনের অবস্থাকেই আমরা বলি ক্রনি ক্যাপিটালিজম। তা ছাড়া প্রভাবশালী গোষ্ঠীদের হাতে অনেকগুলো ব্যাংক চলে যাওয়ায় মানুষের আমানত রাখার নিরাপদ স্থান ব্যাংকিং ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে। এই মুহূর্তে তারল্য সংকটের কারণে অনেক ব্যাংক গ্রাহকদের অর্থ বিতরণ করতে পারছে না। আর ব্যাংক যখন অর্থ বিতরণ করতে পারে না, তখন লেনদেন থেকে শুরু করে যাপিত জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিগত এক দশকে অর্থনীতির যে সম্ভাবনাগুলো দেখা গেছে তাতে সাধারণ মানুষের জন্য কর্মসংস্থান ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ কম তৈরি হয়েছে। ফলে শ্রমিকশ্রেণি এবং নিম্নবিত্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হয়েছে। গত দেড় দশকেরও বেশি সময়ে দেশে অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থা, বিদেশি বিনিয়োগের অভাব, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিকাশে নানা প্রতিবন্ধকতা, উদ্যোক্তাদের ভোগান্তির সঙ্গে যুক্ত হয় দুর্নীতির করালঘাত। আর এসবই মূলত আর্থিক খাতের বৈষম্যকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যেও একটি গুরুতর সমস্যা প্রকাশ পেয়েছেÑআয় ও সম্পদের বৈষম্য। বৈষম্যের এই বাস্তবতা শুধু শহর-গ্রাম কিংবা রাজধানী ও সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়। বৈষম্য এখন অর্থনৈতিক নানা খাত থেকে মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলেছে। আমরা দেখছি, নারী শ্রমিক, কৃষক, অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষ, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক ও আর্থিক বৈষম্য নানাভাবে বেড়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী এবং পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দারাও নানাভাবে বৈষম্যের শিকার। বাংলাদেশে আয়বৈষম্য নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, জিনি সহগ নামে পরিচিত বৈষম্য সূচক ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। ২০০৯ সালে এই সূচক ছিল ৩২.৪, যা ২০২৩ সালে বেড়ে হয়েছে ৪৩.০। অর্থাৎ সমাজের সবচেয়ে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে আয়ের ব্যবধান বাড়ছে। এ বৈষম্য শহর এবং গ্রামবাসীর আয়ের মধ্যে বেশি দেখা যায়। গ্রামাঞ্চলে শহরের মতো কর্মসংস্থান নেই। কৃষিনির্ভর এই দেশে গ্রামাঞ্চলে কৃষি অর্থনীতিই প্রধান। তবে কৃষি অর্থনীতি শুধু ফসল চাষেই সীমাবদ্ধ নয়। এই বৃহৎ খাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থ, বাজার, সার, রসদসহ অনেক কিছু। কিন্তু কৃষি উৎপাদনে স্থবিরতা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চলতি বছর বন্যা ও অতিবৃষ্টির মতো আকস্মিক দুর্যোগ আমাদের সংকট আরও বাড়িয়েছে। নিতান্ত বাধ্য হয়েই অনেকে শহরে এসে ভিড় করছেন। কিন্তু শহরে এসেও তাদের কর্মসংস্থান হয়নি। তারা প্রয়োজনীয় কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না। অনেকে রিকশা চালানো কিংবা মুটে-মজুরের কাজ খুঁজছেন। ফলে শ্রমের মূল্যও এখানে কমে গেছে। 

বৈষম্যের এই চিত্র নারীদের ক্ষেত্রে আরও ভয়াবহ। অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীর শ্রমের কোনো মূল্যায়ন নেই। তাই এ ধরনের খাতে তাদের মজুরিবৈষম্য বেড়েছে। শ্রমবাজারে তাদের মজুরি পুরুষের তুলনায় প্রায় ২০-৩০ শতাংশ কম। অনেক নারী শ্রমিক কঠোর পরিশ্রম করেও তাদের ন্যায্য মজুরি পান না। তা ছাড়া কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা, নারীর স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিত এবং নারীকেন্দ্রিক শিল্প খাত গড়ে তোলার বিষয়েও রয়েছে অনাগ্রহ। কোভিড মহামারির পর দেশের অর্থনীতিতের যে বিরূপ প্রভাব পড়ে তার সঙ্গে পরবর্তীতে যোগ হয় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। গত দুই বছরে দেশে রাজনৈতিক কারণেও অর্থনীতি নানাভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে। এ সময় অর্থনৈতিক গতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের পদক্ষেপ ছিল ধীর ও অপর্যাপ্ত। আর সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় এই মানুষগুলো বৈষম্যের চক্রে বন্দি থেকেছে। 

বাংলাদেশে বয়স্ক জনগোষ্ঠীও বৈষম্যের বড় শিকার। জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে পড়ছে, কিন্তু সমাজ বা রাষ্ট্র বয়স্কদের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারছে না। বর্তমানে দেশে মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বয়স্ক, যারা অবসরকালীন সুরক্ষা বা পেনশনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সমাজে এই প্রবীণ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিকভাবে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। জনসংখ্যার একটি বড় অংশ দ্রুত বয়স্ক হয়ে পড়ছে, কিন্তু সমাজ বা রাষ্ট্র বয়স্কদের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারছে না। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও বৈষম্য প্রকট। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ কম হওয়ায় তারাও সমাজে পিছিয়ে পড়ছে। পর্যাপ্ত সুযোগের অভাবে এবং নীতিসহায়তার ঘাটতির কারণে তাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ অর্থ অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যয় হয়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে এই বিনিয়োগের প্রতিফলন দেখা যায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিরতা এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে সেখানে বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কার্যক্রম পিছিয়ে পড়েছে। এতে করে পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মানুষ আরও বেশি বৈষম্যের শিকার হয়েছে, যা তাদের জীবনমানের উন্নয়নে বড় বাধা সৃষ্টি করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগষ্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতিতে যে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে, তা জনগণের মধ্যে নতুনভাবে সংস্কার নিয়ে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের মূল দাবি ছিল বৈষম্য নিরসন। দেশের মানুষ এখন ন্যায়সংগত সমাজ, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, শোষণমুক্ত অর্থনীতি এবং একটি টেকসই উন্নয়নের জন্য সংস্কার চায়।

এক দশকে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, দুর্নীতি এবং অর্থনীতিতে অসামঞ্জস্য দেশকে এমন একপর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখানে দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার ছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হবে। তবে এই সংস্কার আলোচনা যতটা রাজনীতি এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে হচ্ছে, ততটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে হচ্ছে না। অর্থনৈতিক দুর্দশা কাটিয়ে ওঠার জন্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যথাযথ সংস্কার আনা অত্যাবশ্যক। বস্তুত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সংস্কার ছাড়া সমাজ ও রাজনীতিতে প্রত্যাশিত সংস্কার বাস্তবায়নের দৃষ্টান্ত নেই বলেই চলে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসনে এক্ষেত্রে সংস্কার অবশ্যই করতে হবে।

অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসনে যে কটি সংস্কার জরুরি তার মধ্যে নারী-পুরুষ মজুরিবৈষম্য নিরসনে কাজ করতে হবে। নারী শ্রমিক, কৃষক এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সরকারকে একটি ন্যূনতম মজুরি কাঠামো তৈরি করতে হবে; যা আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য জীবিকা নির্বাহের উপযুক্ত হবে এবং নারী-পুরুষের মধ্যে মজুরির বৈষম্য দূর করবে। দেশে শ্রমিকদের মজুরি অত্যন্ত কম। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে আমরা তৈরি পোশাক খাতের কর্মীদের আন্দোলন করতে দেখেছি। ন্যায্য মজুরির নিশ্চয়তা ও শ্রমিকদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার আনা দরকার। শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যক্রমকে বাধা না দিয়ে তাদের দাবি বিবেচনার জন্য একটি সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। লক্ষণীয় দেশের কর ব্যবস্থা ধনীদের পক্ষে ঝুঁকে আছে। বৈষম্য কমাতে বর্তমান কর ব্যবস্থারও সংস্কার দরকার। বিশেষ করে আয়করের পরিধি বৃদ্ধি করা দরকার, কর প্রশাসনে দুর্নীতি নির্মূল করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দেশে এখন অনেক বেকার। তাই সরকারি অবকাঠামো উন্নয়নের প্রকল্পগুলোয় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ যেমন হয়েছে, তেমনি অন্যান্য সেক্টরে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শ্রমঘন শিল্প স্থাপনের দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। সমতলের নৃগোষ্ঠী এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের জন্য সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হবে। সেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রকল্প নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈষম্য তখনই নিরসন সম্ভব, যখন দুর্নীতি থামানো যাবে। দুর্নীতি আমাদের জন্য একটি বড় সংকট। অর্থ পাচার, ঋণখেলাপসহ দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থার মতো সমস্যার নিরসন দ্রুত করতে হবে। এজন্য সময় প্রয়োজন। কিন্তু কার্যক্রম দৃশ্যমান করতে পারলে দেশের মানুষ সহযোগিতা করবে। কারণ একটি গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের আপামর জনতার মধ্যেই এক ধরনের উৎসাহ থাকে। কিন্তু যদি আবারই বৈষম্য জিইয়ে ওঠে, তাহলে এই উৎসাহ নিভে যেতে পারে। 

দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সত্ত্বেও, বৈষম্য বৃদ্ধি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। শ্রমিক আন্দোলন থেকে শুরু করে ক্ষদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর দাবি, প্রত্যেকেই একটি শোষণমুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চায়। বৈষম্য নিরসনে জরুরি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। জনগণের এই নতুন চাহিদা পূরণে সঠিক অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে, বাংলাদেশ একটি ন্যায্য, টেকসই ও শোষণমুক্ত অর্থনীতির পথে এগিয়ে যেতে পারবে।

  • অধ্যাপক, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা