শারদীয় দুর্গোৎসব
স্বামী দেবধ্যানানন্দ
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৪ ০৯:১২ এএম
স্বামী দেবধ্যানানন্দ
কী অদ্ভুতই না ব্যাপারটাÑ বিল্ববৃক্ষের পাদদেশে বসে সেই বৃক্ষে দেবতার অধিষ্ঠান চিন্তা করে, ধূপ-ধুনা জ্বালিয়ে, মন্ত্র উচ্চারণ ও নৈবেদ্য নিবেদন করে দেবতাকে জাগ্রত করছেন ভক্ত-পূজারি! দুর্গাপূজার ষষ্ঠী-সন্ধ্যায় সেই ব্যাপারটি সম্পাদিত হয়। আপাতদৃষ্টিতে এ রূপ অদ্ভুত ব্যাপার চর্চার মধ্য দিয়েই বাইরের অবলম্বনে (প্রতীক বা প্রতিমায়) দেবতার জাগরণের সঙ্গে সঙ্গে নিজ নিজ অন্তরে দেবত্বের (সদ্ গুণাবলির) বিকাশ ঘটিয়ে আসছেন সনাতন ধর্মাবলম্বরীরা অতি প্রাচীনকাল থেকে। কিন্তু বিল্ববৃক্ষকেই-বা কেন দুর্গা-বোধনের অবলম্বনরূপে নির্বাচন? এ রহস্য উদ্ঘাটনে সত্যানুসন্ধানকারীরা বেদ-পুরাণের তথ্যভান্ডার থেকে যে রসদ এনেছেন তার কিয়দংশ পরিবেশন করা যেতে পারে। তাতে জিজ্ঞাসুর তৃপ্তি যেমন মিটতে পারে আবার ভক্তিমানদের ভক্তি-বিশ্বাসেও নিষ্ঠা আসতে পারে। ব্রাহ্মণ সাহিত্যে বিল্ববৃক্ষকে সূর্যের প্রতীক বলা হয়েছেÑ ‘বিল্বং জ্যোতিরিতি আচক্ষতে। তাই সূর্যকে সর্বশক্তির আধার মনে করে তার কাছে মহাশক্তির আবাহন করা হয়। দুর্গাপূজা তো মহাশক্তিরই পূজাÑ ‘যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা। নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমো নমঃ’Ñ শ্রীশ্রীচণ্ডী ৫/৩২, ৩৩, ৩৪।
পুরাণ ও তন্ত্র সাহিত্যে বিল্ববৃক্ষকে শিবের প্রতীকরূপে কল্পনা করা হয়েছে। বিল্ববৃক্ষের ধ্যানমন্ত্রে বলা হয়েছেÑ ‘ওঁ চতুর্ভুজং বিল্ববৃক্ষং রজতাভং বৃষস্থিতম।/ ব্যাঘ্রচর্মাম্বরধরং শশিমৌলি-ত্রিলোচনম।’ বিল্ববৃক্ষ আবার দেবী অম্বিকার (দুর্গার) খুব প্রিয়Ñ‘শ্রীফলবৃক্ষ! ত্বমম্বিকায়াঃ সদা প্রিয়।’ শিবের অধিষ্ঠান হেতু বিল্ববৃক্ষ শিবসঙ্গিনী শিবারও (দুর্গা) অধিষ্ঠান হবেÑ এটিই সঙ্গত। তাই শিব ও দুর্গাÑ উভয়েরই প্রতীক রূপে বিল্ববৃক্ষে পূজার বিধান। বৈদিক অশ্বমেধ যজ্ঞে যজ্ঞবেদীর সামনে রাখা হতো বিল্ব, খদির, উদুম্বর বা পলাশগাছের একটি স্তম্ভ। সে স্তম্ভরই প্রতিভূ মনে করা হয় দুর্গাপূজায় বিল্ববৃক্ষকে। অনুষ্ঠানের কলেবর ও প্রক্রিয়া বিবেচনায় বিদ্বদ সমাজের মতÑ ‘দুর্গাপূজা’ বৈদিক অশ্বমেধ যজ্ঞেরই পরিবর্তিত রূপ। সূক্ষ্ম বিষয়কে অনুধাবন করতে স্থূল অবলম্বন আবশ্যক হয়। ভগবতী রূপ অনন্ত সত্তাকে ভাবতে তাই বিল্ববৃক্ষ রূপ স্থূল-আলম্বনে দেবীর বোধন ও পূজার আয়োজন। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় শ্রীভগবানও তার অনন্ত সত্তাকে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে অর্জুনকে সূর্য, চন্দ্র, অশ্বত্থবৃক্ষ, অগ্নি, সাগর ইত্যাদি ভগবানের কতিপয় বিভূতিকে ধ্যানের আলম্বন রূপে ভাবতে বলেছেন।
দেবতাকে জাগিয়ে দেবতার পুজো করাÑ এ বিধান আবার কোত্থেকে এলোÑ এ প্রশ্ন ওঠার প্রেক্ষাপটে পুঁথিপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে শাস্ত্রকাররা এ সম্পর্কে জানাচ্ছেন, “রুদ্রযামল গ্রন্থে দুর্গাপূজাকে ‘দুর্গাযাগ’ বলা হয়েছেÑ ‘স্বর্গাপবর্গ-সিদ্ধিশ্চ দুর্গাযাগাৎ প্রজায়তে।’ যাগের পূর্বদিন ‘পুরো নুবাক্যা’ পাঠ দ্বারা দেবতাকে উদ্দীপিত করে পরদিন যাগ আরম্ভ করতে হয়। দুর্গাযাগেও তেমনি ‘বোধন’ অনুষ্ঠানের দ্বারা দেবী দুর্গাকে উদ্বোধিত করে পরদিন থেকে প্রকৃত পূজানুষ্ঠান করতে হয়। ‘পুরো নুবাক্যের কাজ দেবতার প্রকাশন, উদ্বোধন ও উদ্বীপনÑ ‘পুরো নুবাক্যয়া দেবতায়াঃ প্রকাশনাৎ।”
তবে উৎসের চর্চ্চায় বেশ দাপটের সঙ্গে জনমানসে স্থান দখল করে নিয়েছে ত্রেতাযুগের শ্রীরামচন্দ্র কর্তৃক দেবী-বোধন ও দেবী-পূজা। শ্রীরামচন্দ্র ও রামায়ণ-কথা কার না অজানা! লোকের মুখে মুখে ছিল একসময় এ কাহিনী। রামঘরনী সীতাকে হরণ করে নিয়ে গেছে লঙ্কেশ্বর দুষ্ট রাবণ। জানকী বল্লভ শ্রীরামচন্দ্র প্রাণসম-স্ত্রী সীতাকে হারিয়ে বিমর্ষ, দিশেহারা ও ভীষণ বেদনায় ভারাক্রান্ত। সীতা উদ্ধারে রামবাহিনীর সঙ্গে রাবণ বাহিনীর যুদ্ধ শুরু হয়েছে লঙ্কায়। এদিকে অকালে কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ হয়েছে। দেবতারা দেখলেনÑ রামচন্দ্রের সমূহ বিপদের আশঙ্কা, মহামায়ার কৃপা ছাড়া রামচন্দ্রের জেতা সম্ভব নয়। রামচন্দ্রের সাহায্যার্থে এগিয়ে এলেন তারা। তখন চলছিল সূর্যের দক্ষিণায়ন। দেবতারা সাধারণত নিদ্রিত থাকেন দক্ষিণায়নে, জেগে থাকেন উত্তরায়ণে। বৃহদ্ধর্ম পুরাণ জানাচ্ছেন, রামচন্দ্রের কল্যাণার্থে দেবী মহামায়ার (দুর্গা) স্তব শুরু করেছেন ব্রহ্মাদি দেবতারা। ‘হে দেবী, তুমি গিরিবাসিনী, বিল্বদলবাসিনী, তুমি দুর্গা, দুর্গতিহরা... । হে দেবী তুমি স্বাহা, তুমি স্বধা... তুমিই ত্রিবিধপ্রসবিনী, তোমাকে নমস্কার।’ স্তবে তুষ্ট হয়ে দেবী কুমারীরূপে দেবতাদের দর্শন দিলেন এবং পরদিন বিল্ববৃক্ষমূলে দেবীর বোধন করতে বললেন।
মর্তে এসে দেবতারা বিল্ববৃক্ষের শাখায় পরমাসুন্দরী এক নারী মূর্তি দেখলেন এবং যথানির্দেশনা দেবীর বোধন ও শ্রীরামচন্দ্রের জন্য পূজা-প্রার্থনা করলেন। দেবতাদের স্তবে তুষ্ট হয়ে বিনিদ্রতা নারী বালিকামূর্তি ছেড়ে চণ্ডিকারূপে আবির্ভূত হলেন এবং বললেন, ‘সপ্তমী তিথিতে আমি রামচন্দ্রের দিব্য ধনুর্বাণে প্রবেশ করব, অষ্টমীতে রাম-রাবণের ভীষণ যুদ্ধ হবে, অষ্টমী নবমীর সন্ধিক্ষণে রাবণের দশমুণ্ড ছিন্ন ও পুনর্যোজিত হবে। নবমীতে রাবণ বধ হবে। দশমীতে রামচন্দ্র বিজয়োৎসব করবেন।’ দেবীর অনুগ্রহে শ্রীরামচন্দ্র রাবণ বধ করে সীতা উদ্ধার করেন। শ্রীরামচন্দ্রের শরৎকালীন এ দেবী-পূজার বিশদ বিবরণ আছে কালিকা পুরাণ ও কৃত্তিবাসী রামায়ণে। অকালে (দেবতাদের নিদ্রাকালে) অনুষ্ঠিত হলেও কালক্রমে বিশেষ প্রসিদ্ধ লাভ করে শ্রীরামচন্দ্রের দেবীপূজা। প্রচলিত মতÑদেবী দুর্গার যে বোধন ও পূজা করেছিলেন শ্রীরামচন্দ্র তাই পরম্পরাক্রমে বিবর্তন যন্ত্রে আবর্তিত হয়ে বর্তমানে শারদীয় দুর্গাপূজার রূপ পরিগ্রহ করেছে।
পূজা-পার্বণের নিয়ম ও সূচি নিয়ে যাতে কোনো গোল না বাধে, সেজন্য স্মৃতিশাস্ত্রবিশারদরা কালক্রমে এসব ব্যাপারে স্মৃতির নানা বিধান সংকলন করে সংবিধান রচনা করেছেন। তাতে দুর্গাপূজা ও বোধনের ব্যাপারে যে বিধান পাওয়া যাচ্ছে, তা জানা থাকলে তিথিকৃত্য ও পূজাকৃত্য সম্পর্কে ভ্রান্তি-বিভ্রান্তি হয় না। অধিকন্তু, শাস্ত্রে বলা হয়েছেÑ শাস্ত্রবিধি না মেনে ইচ্ছামাফিক কাজ করলে কাজে সিদ্ধি লাভ হয় না। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৬/২৩।
স্মৃতিকাররা বলছেন, দুর্গাপূজায় সাতটি কল্প বা প্রকার রয়েছে। তন্মধ্যে ‘তৃতীয় কল্প’ পূজার জনপ্রিয়তাই সর্বাধিক। এ ব্যাপারে স্মৃতির বিধান : ‘আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতে আরম্ভ করে নবমী পর্যন্ত যে পূজা, তাই তৃতীয় কল্প। তৃতীয় কল্পের পূজায় বোধনের ব্যাপারে বলা হয়েছেÑ ‘ষষ্ঠী তিথিতে সন্ধ্যাকালে বিল্ববৃক্ষে দেবীর বোধন করবে।’Ñ ভবিষ্যপুরাণ। এ বচন অনুসারে, তৃতীয় কল্পে ষষ্ঠীতে সায়ংকালে বিল্ববৃক্ষে দেবীর বোধন করবে। দুই দিন সন্ধ্যাকালে ষষ্ঠী থাকলে, যুগ্মশাস্ত্র অনুসারে পরদিন বোধন করবে। দুই দিনই ষষ্ঠী না থাকলে পরদিন পূর্বাহ্ণে ষষ্ঠীতে বোধন করবে।’
উল্লিখিত পূজানুষ্ঠান, পুরাণ-পুঁথির পশ্চাতে যে দর্শন লুকিয়ে আছে তার খানিকটা দর্শন করা যাক। তবে একটি প্রচল কথা আছেÑ একই বস্তু ভিন্ন ভিন্ন রঙের চশমায় ভিন্ন ভিন্নরূপে প্রতীয়মান হয়। সেরূপ দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতায় একই বিষয়ের দর্শনেও ভিন্নতা থাকা অযৌক্তিক নয়। ‘যিনি পূজক তিনি স্থিত শ্রীরামচন্দ্রের ভূমিকায়। সংসারে সাধারণ নরনারীর ‘রাবণরূপ দারিদ্র্যই’ মহাবিপদ, ঐশ্বর্যই মহাসম্পদ, জীবন যাত্রাই যুদ্ধ। এ যুদ্ধে জয়লাভ করে মহাবিপদের হাত থেকে অব্যাহতি পেয়ে ‘সীতারূপ মহাসম্পদ’ লাভ জগন্মাতার অনুগ্রহেই হয়ে থাকে। ‘দারিদ্র্যদুঃখভয়হারিণী কা ত্বদন্যা’Ñ শ্রীশ্রীচণ্ডী ৪/১৭। যারা যোগী, সাধনই তাদের সমর, বিষয়-বন্ধনই মহাবিপদ, মুক্তিলাভই মহাসম্পদ। জগজ্জননীর অর্চনায় যোগী সাধন সমরে জয়লাভ করে সংসার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে পরমানন্দ লাভ করেন। ‘যা মুক্তিহেতুরবিচিন্ত্যমহাব্রতা চ’Ñ শ্রীশ্রীচণ্ডী ৪/৯।”
বিষয়টি ভিন্ন ভিন্নভাবেও দেখা যেতে পারে। বোধন মানে জাগরণ। শ্রীশ্রীচণ্ডীতে আছেÑ যা দেবী সর্বভূতেষু চেতনেত্যভিধীয়তে। নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমো নমঃÑ ৫/১৭, ১৮, ১৯। সকলের অন্তরে যে দেবী চেতনারূপে বিরাজ করছেন তাকে জাগ্রত করা ব্যাপারটি অযৌক্তিক নয় কি? অযৌক্তিক বটে। তাহলে ‘বোধন’-এর রহস্য কী? শাস্ত্র বলছেনÑ ‘দেবো ভূত্বা দেবং যজেৎ’Ñ পাঞ্চরাত্রাগম। অর্থাৎ নিজেকে দেবস্বরূপ ভাবনা করতে করতে দেবতা হয়ে দেব-বন্দনা বা দেবপূজা করবে। স্পষ্টতই লক্ষণীয়, ভক্ত-পূজারী দেবার্চ্চনা করতে গিয়ে তার পূর্বে জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারেই নিজ অন্তরে শুভভাব বা দেবভাব জাগরণ ঘটান। এভাবেই দেবতার ‘বোধন’ হয়ে উঠে ভক্ত-পূজারির অন্তর্নিহিত দেবত্ব বিকাশের অনন্য উপায়। দেবভাব কী? সত্যনিষ্ঠ হওয়া, কাউকে হিংসা না করা, অন্যের দোষ না ধরা, ক্ষমা করা, অন্যকে ভালোবাসা, অন্যের উপকার করা ইত্যাদি ভালো বৈশিষ্ট্য। চিনির তৈরি উট, পাখি, হাতি, ঘোড়াকে শিশু বা অজ্ঞব্যক্তিরা উট, পাখি, হাতি, ঘোড়ারূপেই প্রত্যক্ষ করেন, চিনিরূপে নয়; কিন্তু জ্ঞানী জানেন এসব চিনি ছাড়া কিছু নয়। পূজা-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অন্তরে দেবত্বের বিকাশ হলে ভক্ত-পূজারি জগন্মাতার দেবস্বরূপকেই প্রত্যক্ষ করেন অন্তরে ও বাইরে, বৃক্ষরূপে নয়।
ভগবান বা ভগবতীই এ জগৎরূপ ধারণ করেছেনÑ নিত্যৈব সা জগন্মূর্ত্তিস্তয়া সর্ব্বমিদং ততম্Ñশ্রীশ্রীচণ্ডী ১/৬৪। স্বামী বিবেকানন্দের দৃষ্টিতেÑ মানুষ ‘নররূপী নারায়ণ’। দেবতার জাগরণ মানে জীব বা মানুষরূপী দেবতার উন্নয়ন। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়Ñ যখন আমরা অন্যের কথা ভাবি, অন্যকে ভালোবাসি, অন্যের উপকার ও উন্নতির চেষ্টা করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই স্বার্থপরতা, ঈর্ষা ও অহংকার বিসর্জন দিতে হয়। এভাবে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একে অন্যের উন্নয়ন-চেষ্টার ও পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার মধ্য দিয়ে স্বার্থপরতা ও ক্ষুদ্রতা বিনষ্ট হয়ে আমাদের অন্তরে বিশ্বপ্রেমের জাগরণ ঘটে। এটিই দেবত্বের জাগরণ বা বোধন। স্বামী বিবেকান্দের ভাষায় বলা যেতে পারেÑ ‘বাহ্য ও অন্তঃপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে এই দেবত্বের বিকাশ সাধন করাই জীবনের লক্ষ্য। এটিই তো ধর্মের আদি-অন্ত।’