× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শারদীয় দুর্গোৎসব

গণঅভ্যুত্থান, দুর্গাপূজা ও অমীমাংসিত শঙ্কা

পাভেল পার্থ

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৪ ০৯:০২ এএম

পাভেল পার্থ

পাভেল পার্থ

প্রতিটি পটপরিবর্তনে নানামুখী শঙ্কা নানাভাবে প্রকাশিত হয়। সহস্র শঙ্কার ময়দানে সর্বদাই প্রান্তিক ও অনালোচিত থাকে বহু ‘অমীমাংসিত শঙ্কা’। ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের পর বহু শঙ্কা চারধারে উজালেও এমন কিছু মৌলিক জিজ্ঞাসা আছে, যা আমরা জোর করে তলিয়ে রাখছি। সকল রেজিম, সকল কর্তৃত্ববাদই এসব শঙ্কাকে অমীমাংসিত রেখেছে। জনপরিসরের মৌলিক জিজ্ঞাসাকে দাবিয়ে রেখে আমাদের সামনে বারবার হাজির করা হয়েছে নানা বাইনারি বিভাজন। উস্কে দেওয়া হয়েছে প্রবল দোষারোপ আর অসহিষ্ণুতার সমীকরণ। আমরা এই কর্তৃত্ববাদী সমীকরণ চুরমার করে নিম্নবর্গের অমীমাংসিত জিজ্ঞাসার জমিনে নিজেদের হাজির করতে পারছি না। অথচ জুলাই গণঅভ্যুত্থান অমীমাংসিত জিজ্ঞাসাগুলোর জন্যই আওয়াজ তুলেছিল। বাঙালি, পাহাড়ি, টিপ, হিজাব কিংবা সেক্যুলার বনাম মৌলবাদের নামে যত বাইনারি বিভাজন আমাদের সামনে হাজির তার এক বিঘত আলাপও আমরা দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ে তুলিনি। কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন কিংবা প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশের সংকট নিয়ে আমাদের কোনো মৌলিক রাজনৈতিক জিজ্ঞাসা নেই। রাজপথে মিছিল বা মঞ্চে বাহাস নেই। এই যে একক সময়ে অতিবর্ষণের ফলে ফেনী থেকে শুরু করে শেরপুর তলিয়ে গেল বন্যায়, আমরা কি অতিবর্ষণের মূল কারণ নিয়ে রাস্তায় নেমেছি? নিজ দেশের ভাটিতে নদীর সব প্রাণপ্রবাহ খুন করে, আমরা কেবল উজানের কর্তৃত্ব নিয়ে কিছু গলাবাজি করেছি। নিদারুণ বন্যায় নিযুত প্রাণের ক্ষয়ক্ষতি নিয়েও আমাদের খুব একটা দায়বোধ নেই। কলিজায় কোনো দরদ নেই। জলবায়ু সংকটে নাকাল বিশ্ব, যার ভোগান্তি পড়ছে দেশের সর্বত্র। আমাদের রাজনৈতিক প্রবণতাগুলো কখনই এসব মৌলিক প্রশ্নে সোচ্চার নয়। তাহলে নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আর সংস্কার কীভাবে সম্ভব? জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশব্যাপী গ্রাফিতি এঁকেছে। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও আদিবাসী সবাই মিলে বাংলাদেশ।

গণঅভ্যুত্থান ইনক্লুশনের আওয়াজ নিয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর টিকে থাকা এই নিওলিবারেল বাস্তবতায় এই ধর্মীয় ইনক্লুশনকে আমরা কীভাবে পাঠ করব? প্রতিটি ধর্ম কেবলমাত্র বিশ্বাস আর দর্শন নয়; বিরাজিত আছে চারধারের প্রাণ-প্রকৃতির সঙ্গে জটিল বহুমাত্রিক সম্পর্ক আর বিন্যাসের ওপর। একটি গাছ বা একটি পাখি কিংবা কোনো জলধারা ধর্মের রূপ ও রূপকল্পের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে সম্পর্কিত। তো সেই গাছ, পাখি বা পানিপ্রবাহকে মুমূর্ষু পরাধীন রেখে কীভাবে ধর্মের বিকাশ ঘটতে পারে? কিংবা সেসব অমীমাংসিত রক্তাঘাত নিয়ে কীভাবে ইনক্লুশন ঘটতে পারে? চলতি আলাপখানি প্রাণ-প্রকৃতির এই অমীমাংসিত শঙ্কাকে কেন্দ্রে রেখে দুর্গাপূজা নিয়ে একটা আলাপ তুলছে। বাইনারি বিভাজন থেকে বের হয়ে এসে বরং দুর্গাপূজা টিকে থাকার পরিবেশগত জটিল সংকট সমাধানে দরদ ও ইনসাফের রাজনৈতিকতাকে স্পষ্ট করার আহ্বান জানায় চলতি আলাপ। মন্দির ও মূর্তি ভাঙার পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানে মাজার, ভাস্কর্য, জাদুঘর, পাঠাগার ভাঙার নয়াপ্রবণতা পাঠের ক্ষেত্রেও বাইনারি বয়ানই প্রবল হয়েছে। যেন মূর্তি ভাঙা কিংবা পাহারা দেওয়ার মতো বাইনারি ন্যারেটিভ দিয়েই কেবলমাত্র দুর্গাপূজার তো জনকৃত্য সুরক্ষিত থাকতে পারে। কিন্তু এটি আদৌ সম্ভব নয়। ভাঙা কিংবা পাহারা দুর্গাপূজার ক্ষেত্রে একেবারেই একধরনের বাইনারি কাঠামোগত কৌশল। এর কোনোটিও যদি না ঘটে, কোনো বাহাদুরি বা কন্সপিরেসি কিছুও যদি না থাকে, তাহলেও কি এই জলবায়ু-দুর্গত সময়ে দুর্গাপূজার সার্বভৌম আয়োজন সম্ভব? রাষ্ট্র দুর্গাপূজার মূর্তি, প্যান্ডেল, মন্দির বা আয়োজন সুরক্ষা করতে পারে, কিন্তু পূজার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রাণ-প্রজাতির সুরক্ষা কি নিশ্চিত করতে পারে? যেহেতু আমরা দুর্গাপূজা নিয়েই কথা বলতেছি, এই পূজার সঙ্গে জড়িত নানা পদের মাটি, উদ্ভিদ প্রজাতি, দেশি ধানের জাত কিংবা লোকায়ত জ্ঞান সুরক্ষিত না হলে দুর্গাপূজার ‘পাহারা’ কি আদতেই কোনো মানে দাঁড় করায়? গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের জন্য আমাদের কোন ইশারা জানায়? বাস্তুতন্ত্রের প্রাণবৈচিত্র্যের সঙ্গে মিশে আছে দুর্গাপূজার কৃত্য আচার ও পরিবেশগত দর্শন। দেশব্যাপী এসব প্রাণ-প্রজাতির ব্যাপক ক্ষয় ঘটছে। প্রতিদিন নিদারুণভাবে আমরা প্রাণবৈচিত্র্য হারিয়ে ফেলছি। নিওলিবারেল কর্তৃত্ববাদ এই জুলুম আর ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। এই কর্তৃত্বকে প্রশ্ন না করে কোনোভাবেই দুর্গাপূজা ঘিরে জমা হতে থাকা অমীমাংসিত শঙ্কার সমাধান সম্ভব নয়। জুলাই অভ্যুত্থান এই জুলুম চুরমার করতেই আমাদের সাহসী করেছে।

দুর্গাপূজার নবপত্রিকা আমার বহুল আগ্রহের জায়গা। অনেকে বলেন ‘কলাবউ’। দুর্গার ডানে শাড়ি পরানো এই কলাবউ অন্য প্রতিমার জৌলুসে অনেকটাই আড়াল হয়ে যান। নবপত্রিকা কৃত্যের জন্য পত্র-বিটপ-মূলসহ ১০টি উদ্ভিদ প্রজাতির দরকার। কলাগাছ, বনকচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু, আমন মৌসুমের ধানগাছ ও সাদা অপরাজিতা। পূজার আয়োজনে আমন মৌসুমের ধান, যব, মুগ, মাষকলাই, তিল বা সাদা সরিষা এই পঞ্চশস্য দরকার হয়। দূর্বা, তুলসী, বেল, আমপাতা, হরীতকীসহ বহু ফুল প্রয়োজন হয়। প্রতিদিন বিল-জলাভূমি ছিনতাই হওয়া এই রাষ্ট্রে ১০৮টি পদ্মফুল জোগাড় করা কি সহজ কথা? রাষ্ট্র দুর্গাপূজা আয়োজনে বাজেট বরাদ্দ করে। কিন্তু কেবলমাত্র বাজেট বা তহবিল দিয়ে কি পদ্মফুলের জীবন সুরক্ষা সম্ভব? পদ্মফুলহীনতায় তাহলে কি দুর্গাপূজার স্বকীয় সত্তা বদলে যাবে? বছর বছর দেশব্যাপী দুর্গাপূজার সময়ে পদ্মফুলের তীব্র আকাল তৈরি হচ্ছে। ফুল নয় কলি এমনকি সংখ্যাও কমিয়ে কেবল ‘নিয়ম’ রক্ষার কাজ করছেন অনেকেই। তার মানে চারধারের বাস্তুতন্ত্র ও প্রাণ-প্রজাতি নিয়ে বিরাজিত কৃত্য-দর্শনের বিদীর্ণ পরিবর্তন ঘটছে। দেশব্যাপী বহু পদ্মবিল আজ নেই কেন? কারা এসব বিল-জলাভূমি পাবলিক সম্পদ দখল লুণ্ঠন করেছে? এই প্রশ্ন রাজনৈতিক, কিন্তু অমীমাংসিত।

গাজীপুরের জয়দেবপুর নরুন কাতুরিয়া কিংবা গোপালগঞ্জের করপাড়ার বলাকইড় পদ্মবিল সম্ভবত টিকে থাকা দেশের সর্ববৃহৎ পদ্মবিল। খুলনার তেরখাদার ভূতিয়ার পদ্মবিল কিংবা কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের গুজাদিয়ার সিংরইল পদ্মবিলও একসময় বিখ্যাত ছিল। অনেক বিল সর্বশেষ ক্ষয়িষ্ণু পদ্মবিল হিসেবে বাঁচার সংগ্রাম করছে। তাহলে মন্দির বা মূর্তি পাহারার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ পদ্মফুলের বিল পাহারা দেওয়া। আর এটি কেবল হিন্দুর একার বিষয় তো নয়, গ্রাম-সমাজের সর্বজনের জনব্যবস্থাপনার অংশ। এটি রাষ্ট্রের জলাভূমি নীতি ও উন্নয়ন চিন্তার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়। জলাভূমির ব্যবস্থাপনা ও জনমালিকানা প্রশ্নে তা হলো রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অবস্থান কী? রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে আমাদের এসব মৌলিক জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে হবে। তা না হলে গণঅভ্যুত্থানের আওয়াজের সঙ্গে বেইমানি করা হবে। 

প্লাস্টিক বা টাকা দিয়ে দুর্গাপূজা হয় না। জনপরিসর ও জনসম্পদের সঙ্গে একটা ঐতিহাসিক বোঝাপড়ার সম্পর্কের ধারাবাহিকতা থাকা লাগে। কলাগাছ, বনকচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু, আমন মৌসুমের ধানগাছ ও সাদা অপরাজিতা এই উদ্ভিদগুলো নতুন প্রজন্মেও কতজন চেনে ও জানে? বনকচু, মানকচু সতি অঞ্চল কি আমরা নিরাপদ রাখতে পারছি? রাষ্ট্রীয় ‘সামাজিক বনায়ন বিধিমালা ২০০০’ মূলত আগ্রাসী গাছকে বৃক্ষরোপণে প্রাধান্য দেয়। তাই দেশব্যাপী সয়লাব হয়েছে ক্ষতিকর ইউক্যালিপটাস, একাশিয়া বা ম্যাঞ্জিয়াম গাছ। অশোক, জয়ন্তী, বেল, ডালিম সুরক্ষার দায়িত্ব কি কেবলমাত্র নাগরিকের? অথচ সংবিধানের ১৮/ক ধারায় রাষ্ট্রের সকল প্রাণসম্পদ ভবিষ্যৎ নাগরিকের জন্য সুরক্ষার অঙ্গীকার করেছে। দুর্গাপূজাতে দেশি জাতের আমন মৌসুমের ধান লাগে। কিন্তু ষাটের দশকে প্রবর্তিত সবুজ-বিপ্লব এজেন্ডার ভেতর দিয়ে গ্রামের পর গ্রাম দেশি বীজ শূন্য হয়েছে। হাইব্রিড ধান কিংবা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া জেনেটিক্যালি মডিফায়েড গোল্ডেন রাইস ধান দিয়ে কি দুর্গাপূজা হয়? এসব জিজ্ঞাসা সামনে আনতে হবে। প্রাণ-প্রজাতি সুরক্ষিত থাকলেই জনমানুষের কৃত্য, দর্শন কিংবা ধর্মীয় আচার সুরক্ষিত থাকে। রাষ্ট্র এখনও এই মৌলিক সুরক্ষাবলয় গড়ে তুলতে পারেনি। আর এ কারণেই ক্ষমতা কাঠামোর সকল লুণ্ঠন, দখল আর কর্তৃত্বকে আড়াল করতে আমাদের সামনে বারবার মূর্তি বা মন্দির ভাঙা কিংবা পাহারার মতো বাইনারি প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। 

১৪৩০ বাংলায় দেশের অনেক জায়গায়ই শারদীয় দুর্গাপূজা পদ্মফুল ছাড়াই করতে হয়েছে। আশ্বিন মানে দুর্গাপূজার আগে অকালবর্ষণে বিল-জলাশয় সব ডুবে যায়। জলাবদ্ধ অবস্থায় পদ্মের কুঁড়ি ঝরে যায়, ডাঁটায় পচন ধরে। চলতি ১৪৩১ বাংলায় দেশব্যাপী কয়েকবার অতিবর্ষণ ও অকালবর্ষণ হয়েছে শরৎকালেই, দুর্গাপূজার আগেভাগে। এবারও কি পদ্মফুলহীন ‘দুর্গোৎসব’ হবে? জলবায়ু বয়ানকে সামনে হাজির করতে না পারলে কেবল মূর্তি ভাঙা রোধ বা পাহারা দিয়ে কি পদ্মফুলের জীবন সুরক্ষা সম্ভব? কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় দেশীয় ধানবৈচিত্র্যকে অগ্রাধিকার না দিয়ে কি দুর্গাপূজার নিরাপত্তা সম্ভব? এসব মৌলিক জিজ্ঞাসা আমাদের তর্কের তল হয়ে ওঠুক। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী আমাদের বয়ানগুলো বাইনারি বিভাজন থেকে বেরিয়ে, জনপরিসরের প্রাণ-প্রকৃতি ও উৎপাদনের সার্বভৌম তৎপরতাকে পাঠ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠুক। 

  • গবেষক ও লেখক

[email protected]

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা