শারদীয় দুর্গোৎসব
ড. শরদিন্দু ভট্টাচার্য
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৫৮ এএম
ড. শরদিন্দু ভট্টাচার্য
দুর্গা পৌরাণিক দেবী। চণ্ডীতে তিনি আছেন, আছেন মার্কণ্ডেয় পুরাণে। কিন্তু মূল পুরাণসমূহ বেদ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয় বলে বেদের সঙ্গে এর একটা সম্পর্ক থাকে। দুর্গার সঙ্গে কী সেই সম্পর্ক? প্রকৃতির সঙ্গেই বা কী সম্পর্ক তাঁর?
১. শিশু কৃষ্ণ একবার তাঁর মা যশোদার অদূরে দাঁড়িয়ে, মাটির একটি ছোট্ট টুকরো নিজের ছোট্ট মুখে ঢুকিয়ে দিলেন। যশোদা তা দেখে দৌড়ে ছেলের কাছে আসেন এবং মুখ থেকে মাটি সরাতে গিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। এ তো মুখ নয়, মুখের ভেতর তো মাটি নয়, অসীম বিশাল মহাবিশ্ব শিশু কৃষ্ণের মুখগহ্বরে। ২. কুরুক্ষেত্রে অর্জুন যখন যুদ্ধ করতে অনিচ্ছুক, কৃষ্ণ তখন বললেন, আমার কথা শুনো, আমিই ঈশ্বর। অর্জুন বিশ্বাস করলেন না। এ কী করে হয়? কৃষ্ণ অর্জুনকে দিব্যদৃষ্টি দান করলেন। সাধারণ দৃষ্টি দিয়ে ঈশ্বরের বিশালত্ব অনুভব করা যাবে না, বিরাট ঈশ্বরকে একসঙ্গে প্রত্যক্ষও করা যাবে না। কৃষ্ণ তাই তাঁকে দিব্যদৃষ্টি দান করলেন এবং ছদ্মবেশ ত্যাগ করে ঈশ্বরের রূপ বা প্রকৃত রূপ করলেন ধারণ।অর্জুন এবার বিস্ময়ে হতবাক। দিব্যদৃষ্টি দিয়ে তিনি যা দেখলেন তা কল্পনাতীত। কৃষ্ণ হঠাৎ এমন এক বৃহদাকার রূপ ধারণ করলেন যে, পৃথিবী তো বটেই, সমগ্র মহাবিশ্ব তাঁর মধ্যে আসীন হলো।
সব দেবতা, সব জীব, সব জড়বস্তু তাঁর মধ্যে একীভূত হয়ে এক বিশাল দেহের জন্ম দিল, আর তারপর সেটি হয়ে গেল মহাবিশ্ব।
৩. নরেন দত্ত বিবেকানন্দ হওয়ার আগে বহু সাধুসন্ন্যাসীকে জিজ্ঞেস করে জানতে চেয়েছিলেন, তাঁরা ঈশ্বরকে দেখেছেন কি না। কেউ সদুত্তর দিতে পারেননি। গদাধর ওরফে রামকৃষ্ণের সঙ্গে যখন দেখা হলো, তখন তিনি বললেন, নিজে তো দেখছেনই, তাঁকেও দেখাতে পারবেন। বিবেকানন্দের ব্যাকুলতা দেখে একদিন রামকৃষ্ণ তাঁর ডান পা ছুঁইয়ে দিলেন নরেনের শরীরে। নরেন ওরফে বিবেকানন্দ এতে ভয়ানকভাবে শিউরে উঠলেন। সবিস্ময়ে দেখলেন, ঘরের দরজা-জানালাসহ তিনি নিজে কোথায় কোন অসীমের পথে ছুটে চলেছেন। মহাবিশ্বের সবকিছু যেন এক স্থানে এসে জড় হচ্ছে। সব যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে। বলাবাহুল্য, তিনিও প্রকাণ্ড মহাবিশ্বকে প্রত্যক্ষ করলেন এবং ভীত হয়ে পড়লেন। বোঝাই যাচ্ছে, এ অখণ্ড মহাবিশ্বই ঈশ্বর। ঈশ্বর স্বয়ম্ভু, মহাবিশ্বও স্বয়ম্ভু। মহাবিশ্বের যে রূপ, সেটাই ঈশ্বরের রূপ। সমগ্র মহাবিশ্ব হচ্ছেন সমগ্র ঈশ্বর। বেদেও এ কথার সমর্থন পাওয়া যায়। বেদে দৃষ্ট হয়েছে ‘একমেবাদ্বিতীয়ম্’ শব্দটি। এর অর্থ, এ মহাবিশ্বে কেবল তিনি একা আছেন, দ্বিতীয় আর কিছু নেই। অর্থাৎ মহাবিশ্ব ছাড়া আর কিছু কোথাও নেই। অবশ্য বেদে মহাবিশ্বের চেয়েও ঈশ্বরের অস্তিত্ব কিছু বেশি মনে হয়। ওখানে বলা হয়েছে, সহস্র সহস্র অঙ্গপ্রত্যঙ্গবিশিষ্ট ঈশ্বর মহাবিশ্ব বেষ্টন করার পর দশ আঙুল পরিমাণ অতিরিক্ত থাকেন। অর্থাৎ মহাবিশ্ব তাঁর মধ্যে অবস্থান করার পরও কিছু অংশ তিনি বেশি। সমস্ত অঙ্গ নিয়ে যেমন সম্পূর্ণ মানুষ, সব দেবতা নিয়ে তেমন সম্পূর্ণ ঈশ্বর। দেবতা তবে কারা? সূর্য, চন্দ্র, শনি, বৃহস্পতির মতো গ্রহ-উপগ্রহ-নক্ষত্র হচ্ছে দেবতা। দিনরাত, নদী, সমুদ্র, পাহাড়ও দেবতা।
আমরা ছায়াপথ বা গ্যালাক্সিকেও দেবতা নিশ্চয় বলতে পারি। আমাদের প্রতিটি অঙ্গের যেমন পৃথক অস্তিত্ব এবং ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব রয়েছে, তেমন দেবতাদেরও রয়েছে পৃথক অস্তিত্ব এবং পৃথক দায়িত্ব। তবে সব অঙ্গ মিলে যেমন এক মানবদেহ, তেমন সব দেবতা মিলে এক ঈশ্বর, সব গ্রহ-উপগ্রহ-গ্যালাক্সি মিলে এক মহাবিশ্ব। যেকোনো অঙ্গ স্পর্শ করলে যেমন মানবদেহ স্পর্শ করা হয়, যেকোনো দেবতাকে স্পর্শ করলে তেমন ঈশ্বর স্পর্শ করা হয়। আমরা যেহেতু মহাবিশ্ব বা সৌরজগৎ বা পৃথিবীতে বাস করি, তাই ওই অর্থে আমরাও তার অংশ। তবে আমাদেরও আছে স্বাধীন অস্তিত্ব। চৈতন্যদেব এ বিষয়কেই বলেছেন অচিন্ত্যভেদাভেদ।
বিভিন্ন দেবতা যে তাঁর একেকটি শক্তি তথা একেকটি রূপ এবং তাঁরা যে কোনো-না কোনো ভাবে একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাঁর প্রমাণ বেদ, গীতা উভয় গ্রন্থেই পাওয়া যায়। ঋগ্বেদে বলা হয়েছে, অগ্নিই বিষ্ণু (দশম মণ্ডল, প্রথম সুক্ত)। সামবেদের পঞ্চদশ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, অগ্নিই শিব। তার মানে শিবই বিষ্ণু। একই বেদের ১৭তম অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ভিন্ন ভিন্ন নামের সব দেবতা আসলে অগ্নি। অর্থাৎ অগ্নিই বিষ্ণু, অগ্নিই শিব, আবার অগ্নিই সব দেবতা।
গীতার বিভূতিযোগে বলা হয়েছে, ‘আমি বিষ্ণু, আমি সূর্য, আমি চন্দ্র, আমি ইন্দ্র, আমি বৃহস্পতি, আমি অগ্নি, আমি কার্তিক, আমি সাগর, আমি হিমালয়, আমি বায়ু, আমিই গঙ্গা।’ অর্থাৎ একজনই সব। ২১ থেকে ৩৭ নম্বর শ্লোকে তিনি এও বলেছেন, তিনিই কৃষ্ণ, তিনিই অর্জুন, আবার তিনিই বেদব্যাস। অর্থাৎ কোথাও স্বল্পশক্তিতে, আবার কোথাও অধিক শক্তিতে তিনিই বিরাজ করছেন জড় ও জীবে। এটা প্রমাণ বা বিশ্বাস করানোর জন্যই পরবর্তী অধ্যায়ে ‘বিশ্বরূপ’ দেখানোর প্রয়োজন পড়েছে।
আমরা বিভিন্ন গ্রহকে দেবতা বলেছিলাম। পৃথিবী একটি গ্রহ, তাই পৃথিবীও দেবতা। সৌরজগতের প্রধান দেবতা সূর্য, সূর্য মানে আগুন। সৌরজগতের প্রধান দেবতা তাই অগ্নি, আগুন বা সূর্য। প্রাচীন প্রায় সব সভ্যতায় সূর্যকে বিশেষ দেবতারূপে দেখা যায়। গ্রাম বাংলায়ও সূর্য বিশেষ দেবতা হিসেবে পূজিত হতেন। এখনও কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময়ব্যাপী সূর্যব্রত অনুষ্ঠিত হয়। যেহেতু সৌরজগতের পৃথিবীতে আমাদের বাস, তাই পৃথিবীর প্রধান দেবতা আমাদের কাছে বেশি আকাঙ্ক্ষিত। পৃথিবীর প্রধান দেবতা স্বয়ং পৃথিবী। পৃথিবী মানে জল, স্থল ও প্রাণ। অর্থাৎ যথাক্রমে বিষ্ণু, শিব ও ব্রহ্মা। একত্রে ত্রিদেব।
উল্লেখ্য, বরুণ জলের দেবতা হলেও তার উৎস অনন্ত-সমুদ্রের প্রতীক বিষ্ণু। বেদে দিন হচ্ছে দেবী ঊষা, রাত্রি দেবী রাত্রি। পৌরাণিক দুর্গা এবং কালীর মধ্যে এ ঊষা ও রাত্রির ছাপ অনেকটাই। ঊষাকেই আরও অধিক শক্তিশালীরূপে দেখা যায় দুর্গার রূপের মধ্যে। যেন ঊষার আধুনিক বা পরবর্তী রূপ দুর্গা। পৃথিবী তথা সৌরজগতের প্রধান প্রধান শক্তির সম্মিলিত রূপ হিসেবে তাঁকে দেখতে পাওয়া যায়। অগ্নি, বায়ু, বরুণ, ইন্দ্রসহ সৌরজগতের বড় বড় দেবতার শক্তির সমন্বয় দেবী দুর্গার মধ্যে। পৃথিবী নামক গ্রহ তো বটেই, গোটা সৌরজগৎকে যেন মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করে এ শক্তি। বাংলা রামায়ণে দুর্গার আরাধনার কথা দেখা যায়, সংস্কৃত মহাভারতেও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে কৃষ্ণকে দুর্গার স্তব করার পরামর্শ দিতে দেখা যায়।
শক্তি ছাড়া জীবনধারণ অসম্ভব। এ শক্তি ছড়িয়ে আছে প্রকৃতির মধ্যে। প্রকৃতির এ শক্তিকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে, ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে আরাধনা করলেও দুর্গাপূজা করা হয় মূলত মহাশক্তিকে সাকাররূপে একসঙ্গে উপলব্ধি করার জন্য। ক্ষুদ্র ইঁদুর থেকে বলবান সিংহ, সুদর্শন ময়ূর থেকে ব্যতিক্রম প্যাঁচা, এমনকি কলা গাছ বা বৃক্ষও নিশ্চয় এ মহাশক্তির অংশ। উৎসবের আনন্দের সঙ্গে মহাশক্তির ধ্যান, বিশেষত সম্মিলিত ধ্যান যদি আমরা একটা সময় একসঙ্গে করতে পারি, তবে পূজার মূল উদ্দেশ্য বহুলাংশে সফল হবে।