× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নিরাপত্তা

পাহাড়ের দুঃখ নিয়ে কাব্য চলে না

ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৪৯ এএম

ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ

ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ

মোহাম্মদ রফিকুজ্জামানের লেখায় ও খন্দকার নুরুল আলমের সুরে প্রয়াত শিল্পী সুবীর নন্দী একটি কালজয়ী গানে বলেছিলেন, ‘পাহাড়ের কান্না দেখে তোমরা তাকে ঝর্ণা বল, ওই পাহাড়টা বোবা বলেই কিছু বলে না, তোমরা কেন বোঝো না যে কারো বুকের দুঃখ নিয়ে কাব্য চলে না’। ৪ অক্টোবর, ২০২৪ টেলিভিশনের পর্দায় পার্বত্য খাগড়াছড়ি হয়ে রাঙামাটির পথে চলাচল ও অপরূপ সাজেকে সব পর্যটকদের ভ্রমণ নিরুৎসাহ করার সরকারি বার্তা শুনে সুবীর নন্দীর গাওয়া গানটি মনে পড়ল। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে অদ্যাবধি এ পাহাড় ও পাহাড়িদের নিয়ে যা কিছু করা হয়েছে এবং হচ্ছে, তা যদি বোবা পাহাড় বলতে পারত, তবে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু বোবা পাহাড়ের প্রতি দায়িত্ববোধের বদলে হীনস্বার্থ উদ্ধার ও কায়েমি উদ্দেশ্যসাধনের কারণে পাহাড় ও পাহাড়িদের চোখের জল যেন ঝর্ণাধারার মতো অবিরাম বয়ে চলেছে।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলার প্রায় ২৩ হাজার ১৮৪ বর্গকিলোমিটার তথা এক দশমাংশের কিছু বেশি ভূখণ্ড নিয়ে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়ে উঠেছে। একমাত্র এ অঞ্চলটি (বান্দরবান) প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশকে স্থলভাগের মাধ্যমে সংযুক্ত করেছে। পৃথিবীর যেকোনো অঞ্চলে ত্রিদেশীয় সীমান্ত এলাকা বা ট্রায়াঙ্গেল থাকলে সে এলাকা অপরাধপ্রবণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ এসব এলাকায় অপরাধীরা যেকোনো অপরাধ করার পর গা ঢাকা দিয়ে অন্য দুটি রাষ্ট্রের যেকোনো একটিতে ঢুকতে পারে বা এক রাষ্ট্রে ঢুকে অন্য রাষ্ট্রে চলে যায় ও গোলকধাঁধার সৃষ্টি করে। এ কারণে ত্রিদেশীয় এমন সীমান্ত এলাকায় চৌকশ গোয়েন্দা কার্যক্রমের কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকার মানুষের চাওয়াপাওয়াকে মূল্যায়ন করে যথাযথভাবে তা জাতীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারকদের কাছে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা কার্যক্রমের ঘাটতি একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা। ১৬৬৬ সালের আগ পর্যন্ত ত্রিপুরা ও আরাকানের রাজা বা মহারাজারা পালাক্রমে এ পার্বত্য অঞ্চল শাসন করেছেন। ১৬৬৬ থেকে ১৭৬০ সাল পর্যন্ত প্রায় ১০০ বছর এলাকাটি ছিল মুঘলদের অধীনে। ১৭৬০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে যাওয়া এ পাহাড়ি এলাকাটি ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশের অধীনে ছিল। মাঝে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ সাক্ষীও হয় এ পাহাড়গুলো। এভাবে দেখা যায় যুগে যুগে পাহাড় ও পাহাড়িরা কেবল শাসকদের খাজনার উৎস, যুদ্ধ আর বন্য শিকারের পছন্দনীয় স্থানরূপে ব্যবহৃত হয়েছে। কোনো গোয়েন্দা তথ্য শাসকদের কাছে এ এলাকার মানুষের মূল ভূখণ্ডের মানুষের তুলনায় পিছিয়ে থাকার সঠিক তথ্য বা তাদের মূলধারার উন্নয়নের সঙ্গে তাল মেলানোর সুযোগ সৃষ্টির দিকে উদ্বুদ্ধ করেনি।

পাকিস্তান আমলে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কাপ্তাই বাঁধ ও বিশাল হ্রদ সৃষ্টি করা হলে চাকমাদের ঐতিহ্যমণ্ডিত রাজবাড়িসহ ব্যাপক এলাকা স্থায়ীভাবে হ্রদের পানির নিচে চলে যায়। এতে কেবল জীবিকাই নয়, তাদের অস্তিত্বও সংকটের মুখে পড়ে। এ সময় ক্ষতিপূরণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও মূল ভুক্তভোগীরা দুর্নীতিসহ নানা কারণে ব্যাপক লাঞ্ছনার শিকার হয়। পাহাড়িদের সে কান্না জোরজবরদস্তিমূলকভাবে চাপা দিয়ে রাখে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় নানা কারণে পাহাড়িদের একাংশ পাকিস্তানিদের পক্ষাবলম্বন করে। বিশেষত চীন এ সময় পাকিস্তানিদের পক্ষে থাকায় চীনপন্থি বিভিন্ন পাহাড়ি নেতা ও সংগঠন সঙ্গত কারণেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর দেশের সংবিধান ও জাতীয় নেতারা পাহাড়িদের বাঙালিরূপে গণ্য করেন, যা ছিল একজন চাকমা, ত্রিপুরা, বম বা আরও অনেক উপজাতির মৌলিক জাতিসত্তার প্রতি চরম অন্যায়। তখনও গোয়েন্দারা বাস্তব পরিস্থিতি প্রকাশ্যে আসতে দেননি।

পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে সমতলের মানুষ বিশেষত নদীভাঙা ও ভূমিহীনরা কখনও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আবার কখনও বা নিজস্ব কায়দায় ব্যাপকহারে বসতি গড়তে শুরু করে পাহাড়ি এলাকায়। তখন থেকেই পাহাড়ি সন্ত্রাস, ভূমি বা জমি দখল, ব্যবসার নামে আধিপত্য, সরলতার সুযোগে পাহাড়িদের ঠকানো, পাহাড়ি নারীদের উত্ত্যক্ত করা প্রভৃতি নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। এতে পাহাড়িরা ক্রমেই ফুঁসে ওঠে এবং গোপনে সশস্ত্র হয়ে ওঠে। তবে এমন পরিস্থিতির ওপরও যথাযথ গোয়েন্দা নজরদারি ছিল না। ফলে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে শান্তিবাহিনীর মতো সশস্ত্র গ্রুপ। শান্তিবাহিনীকে মোকাবিলায় এক প্রকার কঠোরতা নিয়েই পাহাড়ময় ছড়িয়ে পড়ে সেনা, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও আনসারের হাজার হাজার সদস্য। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ক্যাম্প স্থাপন ও কাউন্টার ইনসারজেন্সির নামে পাহাড়িদের জীবনজীবিকায় সরাসরি হস্তক্ষেপ তখন বহু বিতর্কের জন্ম দেয়। এসব বিতর্কের তথ্য গোয়েন্দারা যদি যথাযথভাবে তুলে ধরতেন আর সরকার তা মূল্যায়ন করত, তবে পরবর্তীকালের এমনকি বর্তমান সময়েরও বহু সমস্যা এড়ানো যেত।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি তথা শান্তিবাহিনীর মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তির বেশ কিছু ধারা ছিল বাস্তবতাবিবর্জিত। বলা যায় সেই শান্তিচুক্তির প্রায় ৬০ শতাংশই এ ২৬ বছরে (১৯৯৮-২০২৪) বাস্তবতার মুখ দেখেনি। শান্তিচুক্তির ভূমির মালিকানাসংক্রান্ত ধারাসমূহ পাহাড়িদের চলমান জীবনধারা তথা প্রচলিত কৃষি ও ভূমি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যা গোয়েন্দারা যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারলে হয়তো এমন ধারা সংযোজিত হতো না।

নব্বইয়ের দশকেই পাল্টাতে শুরু করে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশেষত ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপট। এক কঠিন বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল তৎকালীন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র বা বর্তমান রাশিয়া। অন্যদিকে দাপটের সঙ্গে দৃশ্যপটে আসে চীন, যার একান্ত অনুগত হয়ে ওঠে আমাদের পাহাড়ের পাদদেশে থাকা দেশ মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এ সামরিক জান্তা তথা চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে লেলিয়ে দেয় কয়েক ডজন সশস্ত্র উগ্রবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনকে। ফলে যুগের পর যুগ ধরে জ্বলতে থাকে মিয়ানমার। আর মিয়ানমারে লাগা আগুনের কেবল তাপই নয়, ফুলকিও এসে পড়ে আমাদের বাংলাদেশের পাহাড়ে।

আমাদের পার্বত্য এলাকার পাশেই ভারতের সেভেন সিস্টার্স খ্যাত সাতটি রাজ্যের মধ্যে ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্য অবস্থিত। এর পরই রয়েছে আসাম ও মণিপুর, যা এখন যেন এক রাজনৈতিক আগ্নেয়গিরি। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ভারতবিরোধীরা সেভেন সিস্টার্সে অস্থিরতা, উত্তেজনা ও ভিন্নতাবাদ ছড়াতে অতীতে আমাদের পাহাড়ি এলাকাকে আঁতুড়ঘর বা চারণভূমি হিসেবে ব্যবহার করেছে। সাগরপথে ১০ ট্রাক অস্ত্র এনে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে ভারতীয় সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রচেষ্টা যে বাস্তব সত্য, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। একইভাবে অস্বীকার করা যাবে না শান্তিচুক্তির আগে শান্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণসহ সব কার্যকলাপ ভারত থেকে পরিচালিত হয়েছিল। তাই আজও যখন পাহাড়ে উত্তেজনা ছড়ায়, তখন মনের অজান্তেই তার নেপথ্যে কোনো বৈদেশিক শক্তির ইন্ধন আছে কি না, এমন প্রশ্ন সামনে চলে আসে

মনে রাখতে হবে, সাইকেল বা মোটরসাইকেল চুরির বহু ঘটনা এ পাহাড়ি এলাকায় অতীতে ঘটেছে। পাহাড়ি নারীর ওপর বাঙালি পুরুষের পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা এবারই প্রথম ঘটেনি। কিন্তু এ নিয়ে এভাবে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা, দুই পক্ষের বাড়িঘর ও দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ সর্বোপরি দাঙ্গা দমনে প্রশাসনের ১৪৪ ধারা জারির নজির খুব একটা দেখা যায়নি। একসময় সেনাবাহিনীর ভয়ে সাধারণ মানুষ তটস্থ থাকতশান্তিচুক্তির পর পর্যায়ক্রমে শতাধিক ক্যাম্প ছেড়ে সেনাসদস্যরা সেনানিবাসের সুনির্দিষ্ট ব্যারাকে ফিরে আসেন আজ নারী ও শিশুদের ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর গাড়ির কনভার্ট থামিয়ে দেওয়া, গাড়ির চাকার সামনে শুয়ে থাকা কিংবা লাঠিসোঁটা হাতে পাহাড়ি নারী সদস্যদের দিয়ে সেনাসদস্যদের উত্ত্যক্ত করার দৃশ্যধারণ ও তা নেটজগতে সরাসরি ছড়িয়ে দেওয়া কোনো বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বিশেষত জুলাই বিপ্লবের পর নতুন সরকারের সামনে নানা পেশাজীবীর দাবি আদায়ের আন্দোলন, ধর্মীয় কোন্দল ও পাহাড়ের উত্তেজনা কোনো গোপন সুতায় বাঁধা কি না, তা নিয়ে উচ্চমহলে গোয়েন্দা বিশ্লেষণ হওয়া জরুরি।

সার্বিক বিচারে বলা যায়, পাহাড়ে আজ যে সমস্যা মহিরুহ হয়ে সামনে এসেছে, তার বীজ বপিত হয়েছিল বহু বছর আগে। সে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুগে যুগে যুক্ত হয়েছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বৈষম্যের বাস্তবতা। আগুনে ঘি ঢেলেছে পাহাড়ে সমতলের মানুষের জোরপূর্বক স্থায়ী বসবাস এবং পাহাড়িদের সরলতা পুঁজি করে নানাবিধ প্রতারণা। সাম্প্রতিককালে এসব সমস্যা উস্কে দিয়েছে পাহাড়ি প্রশাসনে নানাভাবে সরকারি হস্তক্ষেপ, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির জটিল সমীকরণ প্রভৃতি। এসব কিছু আমলে নিয়ে সর্বোচ্চ মহলের সরাসরি তত্ত্বাবধানে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সর্বদলীয় নীতিনির্ধারণী ফোরাম গঠন এবং সব অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি বাস্তব পদক্ষেপই পাহাড়ের শত বছরের কান্না থামাতে পারে। কোনো কান্না নয়, আমাদের প্রত্যাশা আগামীতে সব জাতিসত্তার পাহাড়িরা শিল্পী নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর মতো এক সুরে গেয়ে উঠুকÑ‘রাঙামাটির রঙে চোখ জুড়াল, সাম্পান মাঝির গানে মন ভরালো, রূপের মধু সুরের জাদু কোন সে দেশে, মায়াবতী মধুমতী বাংলাদেশে।’

  • নিরাপত্তা-বিশ্লেষক, গবেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা