রাষ্ট্রব্যবস্থা
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৪ ০৯:৫৪ এএম
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
আমরা নিশ্চয়ই
আমাদের অবস্থার উন্নতি চাই। এই উন্নতির লক্ষ্যটি হচ্ছে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি। কিন্তু
যে পথে রাষ্ট্র ও সরকার অগ্রসর হচ্ছে, সে পথে দারিদ্র্য কমবে না, কেবল বাড়বে। এমনটিই
আমরা অহরহ দেখতে পাচ্ছি। ভুক্তভোগী হচ্ছি। দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য বেসরকারি সংস্থা
(এনজিও) এখন খুব তৎপর রয়েছে। এটা বেসরকারি বটে, কিন্তু সরকারের যা আদর্শ, এদেরও সেটাই
আদর্শ। এরাও পুঁজিবাদের অগ্রসরমাণতা চায়। এরাও সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকাকে আড়াল করে রাখে।
এনজিওরা আগের দিনের মিশনারিদের মতো। মিশনারিরা প্রচার করত খ্রিস্টান ধর্ম, এরা প্রচার
করে পুঁজিবাদের ধর্ম। কিন্তু এতে জনসাধারণের কোনো উন্নতি নেই। অরাজকতা লুণ্ঠনকারী পুঁজিবাদের
নিজেদের ভেতরকার দ্বন্দ্বের প্রতিফলনÑ এ আমরা দেখেছি। যে সরকার নিজেই পুঁজিবাদী সে
সরকার কেমন করে ওই অরাজকতা রোধ করবে? পাকিস্তানি শাসকরা যে চলে গেছে, সেটা এমনি এমনি
ঘটেনি। বাঙালিরা তাদের তাড়িয়ে দিয়েছে। বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ ছিল। কিন্তু বাঙালি পুঁজিবাদকে
আজ কে তাড়ায়? আর যে-ই তাড়াক সরকার নিশ্চয়ই তাড়াবে না। সরকার তো ওই পথেরই পথিক। যে শাসনের
অভিজ্ঞতা ও আশঙ্কা খুবই বাস্তবিক তারা এলে তো আরও কড়া পাহারা বসাবে, পুঁজিবাদ যাতে
আরও দ্রুত ও নির্মমভাবে অগ্রসর হতে পারে তার জন্য। তা ছাড়া হবে প্রকৃত অর্থেই তৃতীয়
একটি শক্তিকে; তৃতীয় নয়, আসলে যা দ্বিতীয় বড় দুই রাজনৈতিক দলের বিকল্প, সামরিক শাসনের
বিকল্প তো অবশ্যই।

বাংলাদেশ যখন
স্বাধীন হয়, তখন এ আশা বড়ই উজ্জ্বল ছিল যে, ভাষার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হওয়া যাবে। কিন্তু
উজ্জ্বল আশাটির বাস্তবিক ভিতটা ছিল দুর্বল। কেননা ঐক্যের যে মূল শত্রু, অর্থনৈতিক বৈষম্য,
তা পাকিস্তান আমলে যেমন ছিল এখনও তেমনি রয়ে গেছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার কোনো বাস্তবিক
প্রচেষ্টা আজ পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়নি। ফলে ঐক্য এলো না। বাংলা শুধু নামেই রাষ্ট্রীয়
ভাষা হলো, জীবনের সর্বস্তরে তার প্রয়োগ পর্যন্ত সম্ভব হলো না। প্রথম সত্য হলো, শতকরা
৭৮ জন মানুষ অক্ষরই চেনে না। দ্বিতীয় সত্য, শুদ্ধ বাংলা বললে কৃত্রিম শোনায়, ইংরেজি
বললে বীরের সম্মান পাওয়া যায়। এও মূল অর্থনৈতিক কাঠামোতে বৈষম্য বৃদ্ধির লক্ষণ বটে।
আমরা গণতন্ত্র
চাই। গণতন্ত্র বলতে শুধু নির্বাচিত সরকার বোঝায় না। রাষ্ট্রও বোঝায়, সমাজও দরকার হয়।
আর সেই রাষ্ট্র ও সমাজের মূল বৈশিষ্ট্য হবে মানুষে মানুষে সাম্য। অধিকারের সাম্য, সুযোগের
সাম্য। কথাটা এই নয় যে, সব মানুষ ওজনে, মেধায়, দৈর্ঘ্যে, প্রস্থে কিংবা যোগ্যতায় সমান
মাপের হয়ে যাবে। না, তা হবে না। হাতের পাঁচটা আঙুল অসমানই থাকবে, তাদের কেটে সমান করতে
গেলে হাতটাই নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা। হ্যাঁ, আঙুল ছোট-বড় হবে, কিন্তু কোনো আঙুল ফুলে কলাগাছ,
আর কোনোটা শুকিয়ে আমলকীÑ এমন ঘটবে না; সব আঙুলই আঙুল থাকবে, হাত যাতে সুস্থ ও সৃজনশীল
থাকে। বলাই বাহুল্য, এই সাম্য ভোটের নয়, আসলে মানবিক মর্যাদার। এ কথা আড়াই হাজার বছরেরও
আগের পেরিক্লিস থেকে আধুনিক যুগের লেনিন পর্যন্ত সকল প্রকৃত গণতন্ত্রীই বলে গেছেন,
এক বাক্যে।
এ ধরনের ব্যবস্থার
জন্য রাষ্ট্র ও সমাজ থাকা যথেষ্ট নয়, আরও কিছু চাই। আর তা হলো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি।
সংস্কৃতি রাষ্ট্র ও সমাজের চেয়ে বড়। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান; সমাজ আত্মরক্ষামূলক
ব্যবস্থা; সংস্কৃতি সতত প্রবহমান ধারা, যেন নদী। সে যদি এগোয় তবেই সুস্থ থাকে, নইলে
চড়া কিংবা জলায় পরিণত হয়। সংস্কৃতি হচ্ছে সভ্যতার সেই অংশ, যা মানুষের স্বভাবের অন্তর্গত
হয়ে যায়। রবিনসন ক্রুশো একটানা ২৮ বছর সভ্যতার বাইরে ছিল, কিন্তু সংস্কৃতির বাইরে ছিল
না, সংস্কৃতি ছিল তার সঙ্গেই। সেই সংস্কৃতিই তাকে রক্ষা করেছে, নইলে নিশ্চিহ্ন হয়ে
যেত প্রথম ধাক্কাতেই। গণতন্ত্রের জন্য গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাটা অত্যাবশ্যকীয়।
কেবল গড়ে তোলার ব্যাপার নয়, রক্ষা করাও যথেষ্ট নয়, তাকে নিরন্তর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া চাই।
সোভিয়েত ইউনিয়নে যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল তার মূল চরিত্রটি হচ্ছে সাংস্কৃতিক। সমাজতান্ত্রিক
সংস্কৃতি ভেঙে পড়েছে পুঁজিবাদী অন্তর্ঘাতে। সোভিয়েত ইউনিয়নে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র
গড়ে উঠেছিল, সমাজও ছিল সমাজতান্ত্রিক, কিন্তু সেই সমাজে পুঁজিবাদী সংস্কৃতির অবশেষের
এবং পাশ্চাত্য পুঁজিবাদী সাংস্কৃতিক আক্রমণের বিরুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক অর্থাৎ সর্বজনীন
একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলার কাজকে যেহেতু এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়নি, তাই একসময় বিপর্যয়টি
ঘটে গেছে। ভেঙে পড়েছে। আমরা যে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চাইছি, তার বৈশিষ্ট্যগুলো কী হবে
দেখা যাক।
এই সংস্কৃতিতে
প্রথমে যা প্রয়োজন হবে, তা হচ্ছে নিরাপত্তার বোধ, আজ যা বাংলাদেশে নেই। নিরাপত্তাবোধ
কিছুতেই আসবে না রাষ্ট্র ও সমাজে বৈষম্য থাকলে। পারস্পরিক সহনশীলতাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে
এবং দারিদ্র্য কিছুতেই ঘুচবে না যদি না বৈষম্য কমিয়ে আনা যায়। বৈষম্য কমছে না, ক্রমাগত
বাড়ছে। এই বৈষম্যই অরাজকতার, দারিদ্র্যের ও দুর্যোগের মুখে আমাদের আশ্রয়হীনতার কারণ।
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার কাজটি মোটেই সহজ নয়। কেননা মানুষে মানুষে বৈষম্য ও
বিচ্ছিন্নতাই স্বাভাবিক। সাম্য ও মৈত্রী কৃত্রিম, যেমন সভ্যতা কৃত্রিম। তবু সভ্যতাই
কাম্য, বর্বরতা নয়। আর আমাদের সংস্কৃতিতে যেমন আধিপত্য রয়েছে পুঁজিবাদের তেমনি
পিছুটান রয়েছে সামন্তবাদের। উভয়েই সাম্যবিরোধী, উভয়েই বৈষম্যের পৃষ্ঠপোষক। সাংস্কৃতিক
ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা হচ্ছে আধিপত্য। পুঁজিবাদী সংস্কৃতিতে মঙ্গলজনক কিছু নেই তা
তো নয়। আছে। কিন্তু যখন সে অবদান না রেখে আধিপত্য বিস্তার করে ঘটনা তখন অকল্যাণকর হয়ে
দাঁড়ায়। এই আধিপত্য বিস্তার নানাভাবে ঘটছে।
জাতীয় সংগীত আমার
সোনার বাংলা থাকবে, থাকতে হবে। রবীন্দ্রসংগীত থাকবে। তাকে ব্যান্ড সংগীতে রূপান্তরিত
করার কথা কেউ বলবে না। কিন্তু ওই যে বিপুলসংখ্যক অন্যদিকে চলেছে তাদের ফেরানোর পথ কী?
পথ হচ্ছে গণসংগীত। ব্যান্ড মিউজিকও একধরনের গণসংগীত বটে; আমাদের অতীত আন্দোলনে এবং
স্বাধীনতাযুদ্ধে ছাত্র ও যুবকদের মুখে এসব সংগীত চালু ছিল; কিন্তু এখন থেমে গেছে। তার
শূন্যস্থানে চলছে নানাবিধ তৎপরতা। বৈষম্যহীন ব্যবস্থায় মানুষ সুযোগ পাবে তার মনুষ্যত্বকে
বিকশিত করতে এবং পরস্পরের মধ্যে সম্পর্কটা হবে মিত্রের, শত্রুর নয়। তার জন্য প্রথম
ও প্রধান যে কাজ, তা হলো বৈষম্য কমানো। মুক্তিযুদ্ধ এই লক্ষ্যেই শুরু হয়েছিল। সেই যুদ্ধ
এখনও চলছে, আনুষ্ঠানিকভাবে নয়, কোনো একটি ক্ষেত্রে নয়; রাষ্ট্র, সমাজ ও সাংস্কৃতিক
সর্বাঞ্চলে ব্যাপ্ত হয়ে। বন্দুকের নয়, আদর্শের। দেশে তো বটেই, বিদেশেও। একাত্তরে বিদেশেও
মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। প্রবাসী বাঙালিরা সবাই লড়েছেন। বর্তমান যুদ্ধেও তারা থাকবেন। ভিন্নভাবে।
কিন্তু পরিপূর্ণভাবে, নিঃসন্দেহে। এখন মনে হয়, বাঙালি প্রত্যেকে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে,
প্রত্যেকে সকলের বিরুদ্ধে এবং সকলে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে। আমরা বিভেদের অবসান চাই। ঐক্য
চাই। স্থায়ী ও গভীর। এ ঐক্য বৈষম্য বৃদ্ধি অব্যাহত রেখে আমরা গড়ে তুলতে পারব না। কিছুতেই
না। উল্টো যাত্রা চলছে, যাত্রাকে সোজা করা চাই এবং নিশ্চয় তা-ই সর্বাগ্রে।
মূল কথাটা হলো
জাতীয় দুর্দশা থেকে মুক্তির জন্য বিদ্যমান ধারার বিকল্প ধারা চাই। বাঙালি সংস্কৃতির
মুক্তি চাই। যার জন্য বাঙালির সঙ্গে বাঙালির বৈষম্য দূর করার সংকল্পবদ্ধ গণতান্ত্রিক
এবং চূড়ান্ত লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলা আবশ্যক। সমাজতন্ত্র এখন বিপন্ন।
কিন্তু বাংলাদেশের জন্য সমাজতন্ত্র ছাড়া পথ কী আমার জানা নেই। পুঁজিবাদের বিকল্প পুঁজিবাদ
নয়; হতে পারে না; আর পুঁজিবাদের পথে বাংলাদেশ যত এগোবে ততই সে যে পিছোবে তার প্রমাণ
প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে আমরা টের পাচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্রের আশা সারা পৃথিবীকে পদানত
করার সুযোগ, বাংলাদেশকেও পদানত করবে। তার লক্ষণ কি আমরা দেখছি না!
পুঁজিবাদ বাংলাদেশের জন্য অন্য কিছু বয়ে আনবে না, সর্বনাশ ছাড়া। পুঁজিবাদের বিকল্প কী? সমাজতন্ত্র ছাড়া? আবারও বলি, মুক্তিযুদ্ধ চলছে। একাত্তরের চেয়ে অনেক বড় এলাকাজুড়ে। তবে ভিন্নভাবে। এই যুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় বলে কিছু নেই, একে ক্রমাগত অগ্রসর করে নিয়ে যেতে হবে, নব নব বিজয়ে পথে। এ যুদ্ধ অনানুষ্ঠানিক এবং সার্বক্ষণিক। এতে পরাজয় মানে মৃত্যু।