× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ফিরে দেখা

বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল গণতান্ত্রিক অভিপ্রায়ে

মযহারুল ইসলাম বাবলা

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৪ ০৯:৫০ এএম

মযহারুল ইসলাম বাবলা

মযহারুল ইসলাম বাবলা

পাকিস্তানি শাসনামল প্রত্যক্ষ করেছিলাম বলেই আমাদের অনেকের মধ্যেই অবাঙালি বিদ্বেষ তৈরি হয়েছিল, অবাঙালিদের সীমাহীন দৌরাত্ম্যপনায়। পাকিস্তান রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল পূর্ববাংলা ও বাঙালি জাতির প্রতি চরমভাবে বিদ্বেষ এবং বৈষম্যপূর্ণ। পাকিস্তানিদের সঙ্গে দেশভাগে ভারত থেকে আসা অবাঙালি বিহারিরাও ভাষার নৈকট্যের কারণে পাকিস্তানি শাসকদের মিত্র বনে গিয়ে তারাও বাঙালিদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করতে শুরু করেছিল। পাকিস্তানি রাষ্ট্র বিহারিদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করত ভাষার ঐক্যে এবং বাঙালিদের প্রতি বিদ্বেষে। এটা ভাবা সঠিক নয় যে, পাকিস্তানিরা বিহারিদের জ্ঞাতি ভাই বা স্বজাতিরূপে বিবেচনা করত। বিহারিদের মোহাজের (শরণার্থী) হিসেবেই গণ্য করত। স্বাধীনতার পর আটকে পড়া বিহারিদের পাকিস্তানে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেও চুক্তি ও ওয়াদা ভঙ্গ করে বিহারিদের এদেশে ফেলে রেখে যায়। বিহারিদের আর পাকিস্তানে ফেরত নেয়নি।

বাঙালিদের চাপে রাখতেই পাকিস্তানি শাসনামলজুড়ে বিহারিদের কৌশলগত কারণেই প্রশ্রয় ও আসকারা দিত। এতে উৎফুল্ল বিহারিরা ক্রমেই বাঙালিদের ওপর ছড়ি ঘোরাতে তৎপর হয়ে উঠেছিল। নিজ ভূমিতে শরণার্থী বিহারিদের দাপটে বাঙালিরা ওদের সমীহ করে চলতে বাধ্য ছিল। কেননা রাষ্ট্র নির্বিচারে বিহারিদের পক্ষ নিয়ে বাঙালি ঠেঙাতে ছিল সিদ্ধহস্ত। পূর্ববাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ ছিল অবাঙালিদের করতলগত। বাঙালিদের একটি অংশ ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাদের পক্ষে অবাঙালিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পেরে ওঠা সম্ভব ছিল না। বাঙালিরা পুরোপুরি বুর্জোয়া হতে পারেনি অবাঙালি বুর্জোয়াদের একচ্ছত্র দাপটের কারণে। তাই তাদের পেটি-বুর্জোয়া হিসেবেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল।

পাকিস্তানি রাষ্ট্রাধীনে ২৩টি বছর সর্বক্ষেত্রে বাঙালি জাতির দুঃসহ বঞ্চনা-বৈষম্যের মধ্যেই কেটেছিল। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ নতুন মাত্রা পেয়েছিল। ওই পথেই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি রাষ্ট্র ভেঙে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও আমাদের মনোজগতে অবাঙালি বিদ্বেষ কমেনি। অবাঙালি বিদ্বেষ এখনও অনেক ক্ষেত্রেই সক্রিয় রয়েছে। এজন্য ওই ২৩ বছরের দুঃসহ স্মৃতিই প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বাংলাদেশে অবাঙালিদের কর্তৃত্ব-উপস্থিতি এখন টের পাওয়ার কোনোই অবকাশ নেই। জেনেভা ক্যাম্পে অনেক বিহারি রয়েছে। তবে বেশিরভাগই বাঙালি বৃত্তে মিশে গেছে। এ ছাড়া অনেকে স্বীয় অপকীর্তির কারণে স্বাধীনতার পরপরই ভারতে পালিয়ে গিয়েছিল। তাদের দু-চারজনের সঙ্গে কলকাতায় সাক্ষাৎও হয়েছিল। পাকিস্তান ভাঙার অভিযোগে আমাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে দ্বিধা করেনি। বাংলাদেশ এবং বাঙালি বিদ্বেষ এখনও তাদের মাঝে ক্রিয়াশীল দেখেছি।

কলকাতায় গেলে বিহারিদের অস্তিত্ব প্রবলভাবে টের পাই আমরা। বাংলাদেশিরা কলকাতার যে অঞ্চলে প্রধানত থাকেন, ওই অঞ্চলটি পুরোপুরি বিহারি মুসলিম অধ্যুষিত। কলকাতায় বিহারি মুসলমানরা বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করেন না। কলকাতার কলাবাগান, রাজাবাজার, পার্ক সার্কাস, খিদিরপুর, মেটিয়াবুরুজ, নিউমার্কেটের পূর্বদিকের অঞ্চলসমূহে, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট, ওলিউল্লাহ লেনের বিশাল অঞ্চলজুড়ে সংঘবদ্ধভাবেই শতসহস্র বিহারি পরিবার একত্রে পূর্ণ নিশ্চয়তায় বসবাস করে। এই মুসলিম বিহারিরা পরস্পরের সঙ্গে বচসা-বিবাদে নিত্য জড়ালেও তাদের মধ্যে নিরাপত্তাজনিত দৃঢ় ঐক্য লক্ষ করা যায়। ভিন্নভাষী ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে অবাঞ্ছিত ঘটনায় তারা মুহূর্তে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়। দাঙ্গা হানাহানিতে তাদের জুড়ি মেলা ভার। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ পালনের দিনই কলকাতায় হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটেছিল। ওই দাঙ্গায় হিন্দুদের পক্ষে শিখ ধর্মাবলম্বীরা এবং বিহারি মুসলমানরাই সর্বাধিক দাঙ্গায় অংশ নিয়েছিল। ওই দাঙ্গাই বাংলা ভাগকে অনিবার্য করে তুলেছিল।

বাঙালি হিন্দু-মুসলমানরা কিন্তু দাঙ্গার বিপরীতে পরস্পর পরস্পরকে রক্ষায় তৎপর ছিল। কলকাতার এক বিশিষ্টজন আমাকে বলেছিলেন, ‘বিহারি মাত্রই উগ্রবাদী। সেটা বিহারি হিন্দু হোক কিংবা মুসলমান, তারা অনিবার্যভাবেই দাঙ্গাকারী। নিষ্ঠুরতার চরম সীমায় যেতে সামান্য বিলম্ব করে না।’ কথাটির সত্যতা নানাভাবে আমরা পেয়েছি। একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারদের সহযোগী রূপে নিরপরাধ বাঙালি হত্যায় তাদের ভূমিকার কথা নিশ্চয় ভোলা যাবে না। কলকাতায় বাঙালি মুসলমানদের ভাষা ও সংস্কৃতির কারণে এরা তাদের মুসলমান রূপে পর্যন্ত জ্ঞান করে না, অথচ একই মসজিদে পরস্পর নামাজ আদায় করে। তাদের মধ্যে নেই ন্যূনতম নৈকট্য-সম্প্রীতিবোধ পর্যন্ত।

পশ্চিম বাংলার রাজধানী কলকাতায় বাঙালিরা প্রায় সংখ্যালঘু। পশ্চিম বাংলার অর্থনীতির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ মাড়োয়ারিদের হাতে। পাশাপাশি কলকাতায় মাড়োয়ারি, গুজরাটি, পাঞ্জাবি, পার্সি, বিহারিসহ বিভিন্ন জাতির মানুষে ঠাসা। বাংলা ভাষার স্থলে হিন্দি ভাষার ব্যাপক প্রচলন সেখানে দেখা যায়। সেন্ট্রাল কলকাতায় বাঙালিরা সংখ্যালঘু বিধায় বাঙালিদেরও হিন্দি ভাষায় কথা বলতে হয়। হিন্দি ভাষা ভারতের সরকারি ভাষা। প্রদেশের ভাষা বাংলা। তবে সরকারি দপ্তরে বাংলার প্রচলন নেই বললেই চলে। রাজ্য সরকারের দপ্তরগুলোতে বাংলা ভাষার চল কিছুটা থাকলেও কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন প্রতিষ্ঠানসমূহে হয় হিন্দি, নয় ইংরেজি; বাংলা ভাষার কোনো স্থান নেই। বাঙালিরা জীবিকার তাড়নায় এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য বাংলা ভাষা ত্যাগ করে হিন্দিমুখী হয়ে পড়েছেন।

পাকিস্তানি শাসনামলের জেরে অবাঙালিদের প্রতি আমাদের বিদ্বেষ তলিয়ে যায়নি। নিষ্ঠুর সেই অভিজ্ঞতাই আমাদের অমন জাতীয়তাবাদী বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে। কৈশোরে সমবয়সি বিহারিদের গালমন্দ শুনলেও ভয়ে কিছু বলতে পারতাম না। ওই ভয় কেটে গেলেও অবাঙালি বিদ্বেষ মনোজগতে স্থায়ী আসন নিয়ে আছে। অবাঙালি শাসনের বৃত্ত ভেঙে স্বাধীন দেশে স্বজাতির শাসনাধীনে আমরা কতটুকু নিরাপদে-শান্তিতে আছি? এই প্রশ্নটি সামনে এলে অবাঙালি আর বাঙালি শাসন-শোষণকে বিন্দুমাত্র পৃথক মনে হয় না। কবির ভাষায়, ‘বাহিরে কেবল কালো আর ধলো ভেতরে সবার সমান রাঙা।’ বাস্তবতা কিন্তু তাই। স্বজাতির শাসন-শোষণের কবলে পড়ে অধিক ত্যাগের স্বাধীনতা আমাদের স্বাধীন করেনি। দেয়নি মুক্তিও।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ক্রান্তিকালের অবসান হয়নি। বিগত দিনে আমাদের শাসকশ্রেণির চরম আধিপত্যে সামষ্টিক মানুষের ত্রাহি অবস্থা। অবাঙালি শাসকদের বিদায় করেও আমরা অতীতের শোষণ-বঞ্চনা থেকে পরিত্রাণ পেলাম না। একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সমাজ কায়েমের অভিপ্রায়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়, স্বাধীন দেশে অতীত আমলের ধারাবাহিকতায় আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটেছে। ২৩ বছরের পাকিস্তানি আমলের দ্বিগুণেরও অধিক সময়ের বাংলাদেশে আমাদের সব স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা অধরাই রয়ে গেল। এমনটি কাম্য ছিল না। এর দায় রাজনীতিকরা এড়াতে পারেন না। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, এমনটির কোনো অবকাশও ছিল না। শুধু রাজনৈতিক ব্যর্থতা এই পথে ঠেলে দিয়েছে। আমরা কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছতে চাই। এজন্য চাই সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কার।

  • নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা