ঐতিহ্য
আমিরুল আবেদিন
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৪ ০৯:৪৭ এএম
আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৪ ০৯:৫০ এএম
ব্রিটিশভারতের
কাশীধামে ভাই দুর্গা প্রসাদের মিষ্টির দোকানে কাজ করতেন মহাদেব পাঁড়ে। বড়ভাই মারা যাওয়ার
পর মহাদেব চলে আসেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেড্ডায় শিবরাম মোদকের মিষ্টির
দোকানে কাজ শুরু করেন। তার দোকানের রসদ বেশি ছিল না। মূলত তিনি দুই ধরনের মিষ্টি বানাতেন।
তার একটি এই ছানামুখী। ছানার তৈরি চারকোণা ক্ষুদ্রাকার এবং শক্ত, এর ওপর
জমাটবাঁধা চিনির প্রলেপ থাকে। মহাদেব নিজের অজান্তেই চমৎকার কিছু বানিয়ে ফেলেছিলেন।
১৮৩৭ থেকে ১৮৫৯ সালের কোনো একসময় তার ছানামুখী খেয়ে প্রশংসা করেছিলেন ভারতের বড় লার্ট লর্ড ক্যানিং এবং তার স্ত্রী লেডি
ক্যানিং। এভাবেই তার ছানামুখী স্থানীয়দের কাছে ‘লেডি
ক্যানি’ নামেও পরিচিত। সাধারণত ছানার ওপর চিনির সিরার প্রলেপ দিয়ে শুকিয়ে ছানামুখী
পরিবেশন করা হয়। জেলার
পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবে উল্লেখ আছে ছানামুখীর
নাম। সম্প্রতি
ছানামুখী পেয়েছে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি।
কোনো একটি দেশের নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মাটি, পানি, আবহাওয়ার
প্রেক্ষাপটে সেখানকার জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি যদি কোনো একটি পণ্য উৎপাদনে সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাহলে সেটিকে সেই দেশের জিআই পণ্য হিসেবে
স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কোনো পণ্য চেনার জন্য জিআই স্বীকৃতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছর
জামদানিকে কেন্দ্র করে জিআই পণ্যের গুরুত্ব আবার নতুন করে অনুধাবন করতে শুরু করি আমরা।
এবার নতুন করে ভৌগোলিক নির্দেশন পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মিষ্টি ছানামুখী।
উল্লেখ্য, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়া দেশের আর কোথাও ছানামুখী তৈরি হয় না। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই মিষ্টান্ন জিআই পণ্য
হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান পেটেন্ট, ডিজাইন
ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ডিপিডিটিতে ছানামুখী
ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) নম্বর ৪১।
৭ থেকে ৮ লিটার দুধের সঙ্গে এক কেজি চিনি দিয়ে তৈরি হয় এক কেজি ছানামুখী। ছানামুখী তৈরির কয়েকটি ধাপ রয়েছে। প্রথমে গাভির দুধ জ্বাল দিতে হবে। এরপর গরম দুধ ঠান্ডা করে ছানায় পরিণত করা হয়। অতিরিক্ত পানি ঝরে যাবে এমন একটি পরিচ্ছন্ন টুকরিতে ছানা রাখতে হবে। পরে ওই ছানা কাপড়ে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখতে হবে, যাতে সব পানি ঝরে যায়। এভাবে দীর্ঘক্ষণ ঝুলিয়ে রাখলে ছানা শক্ত হবে। শক্ত ছানা ছুরি দিয়ে ছোট ছোট টুকরায় কাটতে হবে। এরপর চুলায় একটি কড়াই বসিয়ে তাতে পানি, চিনি ও এলাচ দিয়ে ফুটিয়ে সিরা তৈরি করতে হয়। পরে ছানার টুকরাগুলো চিনির সিরায় ছেড়ে নাড়তে হয়। সবশেষে চিনির সিরা থেকে ছানার টুকরাগুলো তুলে একটি বড় পাত্রে রাখা হয়। ওই পাত্রকে খোলা জায়গা বা পাখার নিচে রেখে নেড়ে শুকানোর পরই প্রস্তুত হয়ে যায় ছানামুখী। ছানামুখী জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সরকারিভাবে ছানামুখীকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ব্র্যান্ডিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে। জেলার ব্র্যান্ডবুকেও মিষ্টিটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। স্থানীয় একটি খাবার আন্তর্জাতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে এবং মিষ্টি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হয়ে উঠবে, এমনটিই স্থানীয়দের ধারণা।