× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সংস্কার-সংলাপ

জনকল্যাণের রাজনীতি নিশ্চিত করতে হবে

ড. মো. শামসুল আলম

প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৩১ এএম

ড. মো. শামসুল আলম

ড. মো. শামসুল আলম

৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির আদেশে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত ছয় কমিশনের পাঁচটির পূর্ণাঙ্গ গ্যাজেট প্রকাশিত হয়েছে। এখন শুধু সংবিধান সংস্কার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ গ্যাজেট প্রকাশের অপেক্ষা। ৬ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত ছয় কমিশনের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ওইদিন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, গণতন্ত্র মঞ্চ, বাম গণতান্ত্রিক জোট, হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং এবি (আমার বাংলাদেশ) পার্টি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা করে। মূলত এই সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারের বিষয়ে তাদের কোনো প্রস্তাবনার বদলে অন্তর্বর্তী সরকারের ভাবনা সম্পর্কে শোনার বিষয়েই বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে গণতন্ত্র মঞ্চ সংলাপে দেশের পরিস্থিতি ও করণীয় নিয়ে বক্তব্য দিয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি। বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনের রোডম্যাপ চেয়েছে। আমরা দেখছি, পূর্ণাঙ্গ গ্যাজেট দেওয়া পাঁচটি কমিশন যথাক্রমে : নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন ও জনপ্রশাসন।

ইতোমধ্যে কমিশনগুলো কার্যক্রম শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট সব মতামত বিবেচনা করে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে কমিশনগুলো হস্তান্তর করবে। কমিশনের কার্যালয় সরকারের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। কমিশনের প্রধান ও সদস্যরা সরকারের মাধ্যমে নির্ধারিত সরকারি পদমর্যাদা, বেতন-সম্মানী ও সুযোগ-সুবিধা পাবেন। তবে শর্ত রয়েছে কমিশন প্রধান বা কোনো সদস্য অবৈতনিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে চাইলে বা সুযোগ-সুবিধা নিতে না চাইলে, তা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অনুমোদন করতে পারবেন। প্রজাতন্ত্রের সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও সংস্থা কমিশনের চাহিদানুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সরবরাহসহ সব ধরনের সহযোগিতা করবে। কমিশন প্রয়োজনে উপযুক্ত ব্যক্তিকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। আইন, বিচার এবং সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ এ কমিশনকে সাচিবিক সহায়তা দেবে।

আমরা জানি দেশের নানা অসংগতি, সংকট, বৈষম্য ও ঘাটতির বিষয় নিয়ে জনমনে অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। এই প্রেক্ষাপটে ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে সামনে রেখেই ছয়টি কমিশন গঠন করা হয়েছে। আমরা যদি রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলি, তাহলে যেসব আইনের ফাঁকফোকর গলে সরকার জনগণকে শাসন, শোষণ ও নির্যাতন করে; সেগুলো আগে বদলাতে হবে। এর জন্য প্রথমে সংবিধান অদল-বদল জরুরি। যদিও অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আগের সংবিধান বাতিল করে দেওয়ার কথা বলা হলেও এবার সংবিধান পুনমার্জনের কথা বলা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে এখনও সম্ভবত একটি গঠনমূলক অবস্থানে আসা যায়নি বিধায় পূর্ণাঙ্গ গ্যাজেট প্রকাশিত হয়নি। বাকি যে পাঁচটি কমিশন গঠন হয়েছে এই কমিশনগুলো যদি কোনো নীতি বাস্তবায়ন করার রুটম্যাপ তৈরি করে তাহলে তা দেশের জন্য ইতিবাচক হবে। কিন্তু এই পাঁচটি কমিশনের কার্যক্রমের সুফল তখনই সম্ভব হবে যখন রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ সম্ভব হবে।

যখনই সংস্কারের প্রসঙ্গ আসে তখন সঙ্গত কারণেই রাজনৈতিক দলের সংস্কার প্রসঙ্গে আলোচনা সামনে আসে। রাষ্ট্রের সংস্কার তখনই সফল হয় যখন জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। প্রাচীন গ্রিসের এথেন্সে নাগরিকরা যূথবদ্ধভাবে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ ও আইন প্রতিপালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল। গ্রিক ঐতিহাসিক থুসিডাইডসের বর্ণনায় গ্রিসের এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি চমৎকার বিবরণ আমরা পাই। মূলত প্রাচীন গ্রিকদের কাছে স্বাধীনতা মানে ছিল আইনের প্রতি শ্রদ্ধা। অর্থাৎ ব্যক্তির নিজস্ব স্বাধীনতার পাশাপাশি নগর রাষ্ট্রের স্বকীয়তা বজায় রাখার প্রতিও তাদের বাড়তি মনোযোগ ছিল। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রে জনসংখ্যার পরিসর এবং প্রশাসনিক কাঠামোগত রূপ বিবেচনা করলে জনগণকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সবখানে অংশগ্রহণ করাতে পারি না। এজন্যই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মানবিক কাঠামো রাজনৈতিক দল।

রাজনৈতিক দল মূলত নির্দিষ্ট মতাদর্শের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। যারা রাষ্ট্রকাঠামো নিয়ে ভাবেন তারা এই মতাদর্শের ধারক। রাজনৈতিক দলের কাজ জনসংযোগ করা এবং তাদের মতাদর্শের সমর্থকদের সংগঠিত করা। আরও বড় কথা জনকল্যাণ নিশ্চিত করা। মানুষ সামাজিক জীব এবং সংগতই সংঘবদ্ধ থাকতে চায়। আবার আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো অনুসারে, রাজনৈতিক দলের মতাদর্শকেই জনগণ প্রাধান্য দেয়। প্রাচীন গ্রিসে যেমন প্রতিনিধি হিসেবে মানুষ ছিল, আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো ও সরকারব্যবস্থা মতাদর্শ ও পদের নিরিখে বিবেচ্য হয়। তাই আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা জটিল। কারণ প্রতিষ্ঠান, মতাদর্শ এবং মানবিক সংযোগের সম্মিলনেই আধুনিক রাষ্ট্র। আর আধুনিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ রাজনৈতিক দল যারা প্রকৃত অর্থে জনগণের মতের স্বাধীনতা স্থাপন করতে পারে। এই স্বাধীনতা বলতে মূলত গ্রিক ধারণাটিকেই অবলম্বন করতে হয়। অর্থাৎ স্বাধীনতার মাধ্যমে রাষ্ট্রে সুশাসন ও আইনের প্রতিপালন নিশ্চিত করা।

সুশাসন ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের ভূমিকার গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা দেখছি রাজনৈতিক দলের প্রভাবে জনপ্রশাসন, জননিরাপত্তা প্রশাসন (পুলিশ), বিচার বিভাগ কীভাবে পরিবর্তিত হয় তা আমাদের বিগত দুই দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতির নিরিখেই তুলে ধরা যেতে পারে। প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব ও বিবেচনা থাকার ফলে ইতোমধ্যে মাথাভারী প্রশাসন একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলীয় স্বার্থে যখন জননিরাপত্তা প্রশাসনকে ব্যবহার করা হলো, তখন নাগরিক মনে এই প্রশাসনের ওপর আস্থা হ্রাস পেয়েছে। বিশেষত পতিত সরকারের সময় পুলিশ প্রশাসনে নিয়োগ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার ইত্যাদি প্রসঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ প্রশাসনে সংস্কারের দাবি উঠেছে। বিশেষত দেশে জননিরাপত্তা এখনও ভারসাম্যহীন থাকায় বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেই চলেছে। এমন সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে সক্রিয় হয়ে জনকল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত হতে হবে। আমরা দেখেছি, শিক্ষার্থীরা তাদের প্রচেষ্টায় দীর্ঘদিন সড়ক নিয়ন্ত্রণ করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও জনকল্যাণমূলক বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে হবে। মাঠপর্যায়ে বাজারের পরিস্থিতি, প্রশাসনিক অনিয়মের চিত্র ইত্যাদি বিষয়গুলো যখন তারা পর্যবেক্ষণ করবে তখন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্যও তারা নানা ধরনের প্রস্তাবনা উপস্থাপন করতে পারবে। এই সুযোগ তো থাকবেই। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এখনও এসব বিষয় সেভাবে অনুধাবন করতে পারেনি—এ অভিযোগ অমূলক নয়।

জুলাই-আগস্টে পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলো নতুন করে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। এজন্য নানা সভা-সমাবেশ ও প্রচারণা চলছে। কিন্তু বাস্তবিকভাবে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি কি নিশ্চিত হয়েছে? অন্তত মোটাদাগে তা এখনও হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার মতাদর্শিক পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু বিভাজন যখন একে অপরকে দোষারোপের মধ্যেই থাকে, তখন গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা যায় না। এজন্যই দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে কাজ করতে হবে। বিশেষত একটি গণঅভ্যুত্থানের পর এই অভ্যুত্থানের সামাজিক পর্যালোচনা, প্রজন্মের রাজনৈতিক ভাবনা অনুধাবন, দেশকে পুনর্গঠনের ইশতেহার ইত্যাদি পর্যায়ক্রমে রাজনৈতিক দলগুলোকে উপস্থাপন করতে হবে। যখন তা সম্ভব হবে, তখন জনমনে রাজনীতির প্রতি আস্থা ফিরে আসবে।

ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা দেখছি, রাজনৈতিক পরিবেশ ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোও অনেকটা জবুথবু অবস্থায় রয়েছে। অথচ তাদের সুযোগ রয়েছে সংস্কারে মতামত দেওয়ার, সুপারিশ করার। এ কাজটি তখনই সম্ভব হবে, যখন রাজনৈতিক দল জনসংযোগ বাড়াবে, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে মূল্যায়ন করবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে তার জরিপ প্রকাশ করবে। মানুষের প্রত্যাশার যাচাই-বাছাই করে একটি সুষ্ঠু প্রতিফলন নীতি বা সুপারিশ আকারে উপস্থাপন করার মাধ্যমেও রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহার প্রস্তুত করতে পারে। সবার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমে জনকল্যাণের বিষয়গুলো সামনে রাখতে হবে। তাদের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। জবাবদিহি ছাড়া কল্যাণকর কিছু নিশ্চিত করা কঠিন। তাছাড়া স্বচ্ছ রাজনীতির প্রয়োজনেও রাজনীতিকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

কার্যত রাজনৈতিক দলগুলোর এখন পুনর্গঠিত হওয়ার সময়। এই সময়কে কাজে লাগাতে পারলে সংস্কারের লক্ষ্যে গড়ে তোলা ছয়টি কমিশনও কার্যকর ফল পাবে। এখনও আমরা নির্বাচনের সুষ্ঠু রোডম্যাপ দেখতে পাচ্ছি না। নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সময় পুরোনো রাজনৈতিক ভাবনা অনুসরণ করলে মূলত পুরোনো কাঠামোতেই আমরা আটকে থাকব। পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলেরই সুযোগ রয়েছে সংস্কারের কাজ ত্বরান্বিত করার। সেজন্য কী কৌশল দলগুলো অবলম্বন করে তা নির্ধারিত হবে জনগণের সঙ্গে তারা কতটা সংযুক্ত হতে পারছে এবং এর নিরিখে কীভাবে জনআস্থার প্রতিফলন ঘটাবে প্রচার কিংবা মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে এর পরিপ্রেক্ষিতে। 

  • অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ , জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা