× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক

আনোয়ার ইব্রাহিমের ঝটিকা সফরের তাৎপর্য

ড. ফরিদুল আলম

প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৩৩ এএম

ড. ফরিদুল আলম

ড. ফরিদুল আলম

১১ বছর পর ঢাকায় এলেন মালয়েশিয়ার কোনো প্রধানমন্ত্রী। এর আগে ২০১৩ সালের নভেম্বরে ঢাকা এসেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক। এবার এলেন প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। দেশে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদেশি কোনো সরকারপ্রধানের এটাই প্রথম সফর। মূলত পাকিস্তানে তিন দিনের আনুষ্ঠানিক সফর শেষ করে দেশে ফেরার পথে কয়েক ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি করেন তিনি। সেটা অনেকটা তার দীর্ঘদিনের বন্ধু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে। সংক্ষিপ্ত সফর হলেও এটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যা ভবিষ্যতে দুই নেতার মধ্যে আরও সফর বিনিময়ের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করবে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক বিদ্যমান থাকলেও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে এক ধরনের অস্বস্তি চলছিল। সে দেশের অর্থনৈতিক খাতগুলোর জন্য যেমন অধিক পরিমাণে যোগ্য ও দক্ষ শ্রমিক প্রয়োজন, আমাদের কর্মসংস্থান এবং বেকার সমস্যা সমাধানে অধিক হারে সেখানে শ্রমিক প্রেরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টির মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য দুই দেশের কর্মকর্তারা কাজ করে এলেও এবারের দুই নেতার সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে বিষয়টির একটি আশু সুরাহার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে। এর বাইরে রাজনৈতিক গুরুত্ব তো রয়েছেই।

প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের এ সংক্ষিপ্ত সফরে সবচেয়ে বেশি আশার কথা উচ্চারিত হয়েছে মালয়েশিয়ায় আমাদের শ্রমবাজার নিয়ে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে তিনি টিকিট জটিলতার কারণে মালয়েশিয়ায় যেতে না পারা ১৮ হাজার শ্রমিককে প্রথম দফায় সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাংলাদেশিদের সুযোগসুবিধা এবং সহায়তা বৃদ্ধির বিষয়েও আশ্বাস প্রদান করেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, তার দেশের শ্রমবাজারে আরও শ্রমিকের প্রয়োজন, এ নিয়ে তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। বিশেষ করে অভিবাসন প্রক্রিয়া আরও সহজ করার বিষয়ে তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। সম্ভবত এ সহজ করা অর্থে তিনি মূলত যে বিষয়টি বোঝাতে চেয়েছেন তা হচ্ছেÑদুই দেশের রিক্রুটিং এজেন্সির দৌরাত্ম্য কমিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সে দেশে বিদেশি শ্রমিকদের এক খাতে নিয়োগের কথা বলে অন্য খাতে কাজ করানো, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ ইত্যাদি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন পর্যন্ত উদ্বেগ জানিয়েছে। অনেক শ্রমিক নির্ধারিত অর্থের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ খরচ করে মালয়েশিয়ায় গিয়ে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। এর বিরূপ প্রভাব হয়ে উঠেছে বহুমাত্রিক। বিষয়গুলো দুই দেশের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সবাই অবগত রয়েছেন।

আনোয়ার ইব্রাহিমের এ ঝটিকা সফরের গুরুত্ব বাংলাদেশের শ্রমবাজার ছাপিয়ে আরও বিস্তৃত সম্ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে আলোচনায় সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা সেন্টার, এআই ও নতুন টেকনোলজি নিয়ে সামনের দিনগুলোয় কাজ করতে দুই দেশ সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ইব্রাহিম নিজেই। প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক তিনি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান। প্রধানমন্ত্রী ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে মানবিক, রাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক দিক নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে তিনি সাংবাদিকদের অবহিত করেন। সেই সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি, ভিসা সহজীকরণ, কর্মসংস্থান তৈরি, রোহিঙ্গা সংকট এবং শিক্ষা নিয়ে দুই নেতার মধ্যে কথা হয়েছে বলা জানা গেছে। তিনি খুব গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন যে মালয়েশিয়ায় যেসব শ্রমিক কাজ করছেন তারা আধুনিক দাস নন। এর মধ্য দিয়ে তাদের প্রতি মানবিক আচরণের দিকটি তিনি তুলে ধরেন, যা মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য থেকেও তিনি স্পষ্ট করেছেন। সেই সঙ্গে অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক সেখানে অপরাধমূলক কর্মের কারণে আইনের মাধ্যমে সাজাপ্রাপ্ত, সে ক্ষেত্রে আমাদের দিক থেকে সে দেশের আইনের প্রতিও শ্রদ্ধার কথাটি উচ্চারিত হয়েছে।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ১৯৯২ সালে, আজ থেকে ৩২ বছর আগে। এর পর থেকে প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় শ্রমিক গেছে দেশটিতে। বর্তমানে শ্রমিকের সংখ্যার দিক দিয়ে মালয়েশিয়া আমাদের জন্য চতুর্থ বৃহত্তম শ্রমবাজার (সৌদি আরবে ৫৮ লাখ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৪ লাখ, ওমানে ১৯ লাখ), যেখানে কাজ করছেন ১৪ লাখের বেশি শ্রমিক। সংখ্যার বিবেচনায় এটি অনেক বেশি মনে হলেও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য সে রকম আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে না। কেবল এর চেয়ে ভালো বিকল্প না থাকার কারণে এ প্রবণতা বেশি। মালয়েশিয়া যেতে কর্মীপ্রতি সরকার ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে এজেন্সিগুলোর দৌরাত্ম্যে ৪ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে একেকজন কর্মীর। এর মূল কারণ ২০২২ সালে শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার পর মাত্র ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে অন্য এজেন্সিগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এ সংখ্যা আরও ৭৫টি বাড়ানো হলেও এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাবের কথা জানানো হয়েছিল দুই সরকারকেই। তার পরও দীর্ঘদিন বন্ধের পর গত বছর ৩ লাখ ৫১ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক সে দেশে যান।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অনেক দিনের। স্বাধীনতার পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু হয়। সে বিবেচনায় এ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বয়স বর্তমানে প্রায় ৫৩ বছর। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সে দেশে বাংলাদেশের জনশক্তি প্রেরণকে বড় করে দেখা হলেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের দিকটি অত্যন্ত ইতিবাচক। মালয়েশিয়া বর্তমানে বাংলাদেশে অষ্টম বৃহত্তম বিনিয়োগকারী দেশ। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে দেশটির বিনিয়োগের পরিমাণ ৮৩২.৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ৩০০-এর মতো মালয়েশিয়ান কোম্পানি বর্তমানে বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ নিয়ে কাজ করছে, যা আমাদের অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ইব্রাহিমের নতুন নতুন কিছু খাতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজের ঘোষণা ভবিষ্যতে এ দেশে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি করবে, সন্দেহ নেই।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বসবাসরত বিপুল সংখ্যার রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে মালয়েশিয়া সরকার বরাবরই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। আসিয়ান দেশগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে তারা সব সময়ই মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ দিয়ে এসেছে। তার এ সফরের পর দুই দেশের মধ্যে এ নিয়ে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার একটা পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আসিয়ান জোটে যুক্ত হতে চাইছে, মালয়েশিয়া এ জোটের প্রভাবশালী সদস্য। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিজেও সার্কসহ আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোয় বাংলাদেশের আরও সরব অংশগ্রহণ চাইছেন। অনেক সময় দুই দেশের সম্পর্কের বুনিয়াদ শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ করে। দুই নেতার মধ্যে ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের সম্পর্ক অনেক দিনের। বলা যায় অনেকটা সে কারণেই তিনি তার ব্যস্ত সময়ের ফাঁকে এবং দেশে ফেরার যাত্রাপথে পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাতে আগ্রহী হয়েছেন। এটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও মজবুত করার ক্ষেত্রে খুব ভালোভাবে কাজ করতে পারে। টিকিট জটিলতায় মালয়েশিয়ায় যেতে না পারা ১৮ হাজার শ্রমিককে যাওয়ার বিষয়ে তার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত এবং সেখানে বাংলাদেশিদের জন্য আরও উন্নত কর্মপরিবেশ সৃষ্টির বিষয়ে তার এ ঘোষণা তাই খুবই তাৎপর্যবহ। দুই পক্ষের মধ্যেই যেহেতু শ্রমশক্তির বিষয়টি নিয়ে গুরুত্ব দেখানো হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে শ্রমিক নিয়োগ, তাদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপত্তা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং অনিবন্ধিত খাতগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে এবং দুই দেশ ভবিষ্যতে এ নিয়ে আরও মনোযোগী হবে বলে প্রত্যাশা করা যায়।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যেহেতু দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক আরও উচ্চতর করার বিষয়ে তার সংকল্পের কথা জানিয়েছেন, সেহেতু মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীও এ ব্যাপারে সহমত প্রকাশ করেছেন; সেই সঙ্গে বাণিজ্যিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়টি সর্বাগ্রে বিবেচনায় রয়েছে। সেদিক দিয়ে আমাদের বর্তমান সম্পর্কের ধারাবাহিকতার আলোকে একে আরও কীভাবে ভালো করা যায় তা ভাবার অবকাশ রয়েছে। আনোয়ার ইব্রাহিমের এই ঝটিকা সফরের তাৎপর্য ব্যাপককার্থে অনেক। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশের আমদানির উৎস দেশ হিসেবে চীন এবং ভারতের পর মালয়েশিয়া তৃতীয় বৃহত্তম। এ ক্ষেত্রে আমদানি-রপ্তানিতে ভারসাম্য আনতে দুই দেশের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন আমাদের অর্থনৈতিক স্বার্থকে আরও বৃদ্ধি করবে। আমাদের রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলগুলোয় চীন, কোরিয়া ও ভারতের পাশাপশি আরও অধিক হারে মালয়েশিয়ান কোম্পানিকে আকৃষ্ট করার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের আসিয়ানে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে চলমান আলোচনার ধারাবাহিকতায় অন্ততপক্ষে ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে অন্তর্ভুক্তি আমাদের সে সম্ভাবনা আরও জোরদার করবে।

  • কূটনীতি-রাজনীতি বিশ্লেষক। অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা