অশান্ত বিশ্ব
মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৪ ১৪:৩২ পিএম
বিশ্বনেতৃবৃন্দের মহামিলনমেলা জাতিসংঘের বার্ষিক সাধারণ সভা এমন সময় অনুষ্ঠিত হয়েছে যখন বিশ্ব টালমাটাল দ্বন্দ্ব-সংঘাতে। গোষ্ঠীগত সংঘাত, রাষ্ট্র-রাষ্ট্র সংঘাত শত শত মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। সুদান, মিয়ানমারে জাতিগত সংঘাত, ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি আগ্রাসন চলছেই। সময় সময় চিত্র পাল্টাচ্ছে। ইসরায়েলে ইরানের হামলার পর পাল্টা হামলার হুমকি দিয়েছে ইসরায়েল। গোটা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, হাইতি কিংবা আফগানিস্তানে মানবিক বিপর্যয়-বিশ্ববিবেক উৎকণ্ঠিত করে রেখেছে। বিশ্বনেতৃবৃন্দের কাছে প্রত্যাশা ছিল বিশ্বব্যাপী এ মানবিক সমস্যাগুলো সমাধান হবে আলোচনার ভিত্তিতে। বাস্তবতা হচ্ছে বিপরীত। যাদের কাছে মানুষ শান্তি আশা করে, সেই নেতাদের কারণেই আজ বিশ্বময় সংঘাত-যুদ্ধ এবং মানুষের প্রাণহানির মতো ঘটনাগুলো ঘটছে। তারা শুধু অস্ত্রবাণিজ্য চালানোর জন্য মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন। অথচ বিশ্বব্যাপী এ সংকট অলঙ্ঘনীয় নয়। এ সমস্যাগুলো নিরসন-অযোগ্য নয়। তারা উদ্যোগ গ্রহণ করলে মানুষের জীবনহানি বন্ধ হয়ে যেত।
ইসরায়েলিরা ফিলিস্তিনে আগ্রাসন চালিয়ে শত শত মানুষ হত্যা করছে। এর পেছনে পশ্চিমা দেশগুলোর অস্ত্র সরবরাহ দায়ী। অথচ সব নেতাই মানবাধিকারের কথা বলেন, গণহত্যার বিরুদ্ধে কথা বলেন। আবার গাজায় জনবসতি, হাসপাতাল এমনকি সাহায্য সংস্থাগুলোর দপ্তরেও নির্বিচার ইসরায়েলি আক্রমণ চলছে। তাদের আগ্রাসন নীতির সম্প্রসারণের কারণে লেবাননেও মানুষ মারা যাচ্ছে। অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলো লোকদেখানো অস্ত্র সরবরাহে নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করে মাঝেমধ্যে। যেমন যুক্তরাজ্য কিছুদিন আগে ইসরায়েলে কিছু অস্ত্র সরবরাহে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তাদের মতো কানাডাও কিছু অস্ত্র বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এসবই সামান্য পদক্ষেপ মাত্র। কারণ এর বাইরে প্রচুর অস্ত্র তাদের মাধ্যমেই ইসরায়েলের হাতে যাচ্ছে। ইসরায়েল-ইরান সংকট নতুন করে ভিন্নমাত্রা সৃষ্টি করেছে।
সুদানে লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত জীবনযাপন করছে। সেখানে জাতিগত সংঘাত দুর্বিষহ অবস্থায়। জাতিগত সংঘাতে পড়ে দেশটিতে দুর্ভিক্ষ চলছে অনেক আগে থেকে। তাদের সংঘাতগুলো এতই মানবতাবিরোধী যে, সেখানে ত্রাণ বিতরণ করতে গেলেও বিবদমান গ্রুপগুলোর বাধার মুখে পড়তে হয়। আপাতদৃষ্টে যে-কেউ মনে করতে পারেন, এখানে দুই জেনারেলের দ্বন্দ্বে এ অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। অথচ এর পেছনেও কাজ করছে বাইরের শক্তির অস্ত্র বিক্রি। অস্ত্র বিক্রেতারা এ দুই গ্রুপের সংঘাত টিকিয়ে রেখেছে নিজেদের স্বার্থে। এখানে চীন, রাশিয়া, ইরান, সার্বিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো নিয়মিত অস্ত্র সরবরাহ করে চলেছে। সেখানে অস্ত্র সরবরাহে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকার পরও অস্ত্র বিক্রেতা দেশগুলো সামান্যই তোয়াক্কা করছে। যদিও নিষেধাজ্ঞা অমান্যের উদাহরণ আছে তার পরও মন্দের ভালো হিসেবে মিয়ানমার, সুদান ও ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহে নিষেধাজ্ঞা জরুরি হয়ে পড়েছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার বিভীষিকার পাশাপাশি, আফগানিস্তানে নারী নির্যাতন চলছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চলছে, হাইতিতে গণহত্যা বন্ধে বিশ্ববিবেক কখন জাগ্রত হবে, এমন প্রশ্ন আসতেই পারে। বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বসহ ভাবতে হবে। মধ্য আফ্রিকায় যেভাবে বেসামরিক নাগরিক সুরক্ষায় বিশ্বনেতৃবৃন্দ ভূমিকা পালন করেছেন, সেভাবে বেসামরিক নাগরিক সুরক্ষা কমিশন গঠন করে বিবদমান দেশগুলোয় মানবিক বিপর্যয় রোধ করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। এসব আপাতদৃষ্টে কঠিন মনে হলেও চাইলে অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উচিত সিরিয়া ও মিয়ানমারে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু করা। এমন হলে ভবিষ্যতে জবাবদিহি তৈরি হবে। এর মাধ্যমে হয়তো দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ বেরিয়েও আসতে পারে। যদিও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ক্ষমতাধর স্থায়ী কমিটির সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভেটো দেওয়ার ক্ষমতাও প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসকে আরও উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে বিশ্বে চলমান অশান্তি দূর করার জন্য। দক্ষিণ আফ্রিকা ইসরায়েলি মানবতাবিরোধী কর্মের বিরুদ্ধে আদালতে তিনটি মামলা দায়ের করেছিল। কিন্তু অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। মিয়ানমারে গণহত্যা এবং রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত নিপীড়ন বন্ধে গাম্বিয়া যে মামলা দায়ের করেছে তা-ও কার্যকর হয়নি। এদিকে মিয়ানমারের এ জাতিগত সংঘাতের কারণে বাংলাদেশকে খেসারত দিতে হচ্ছে। প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয়ের সুযোগ পেয়েছে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিতে চাপ দিলেও তারা মিয়ানমারে গণহত্যা এবং জাতিগত সংঘাত নিরসনে ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি। এখানে লক্ষ করার মতো বিষয় হচ্ছে, আফ্রিকার ছোট একটি দেশ গাম্বিয়া মিয়ানমারের গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে কিন্তু বৃহৎ শক্তিগুলো এ নিয়ে মাথা ঘামানোর কথাও ভাবছে বলে মনে হয় না। তারা আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সহযোগিতার কথা বলে, কিন্তু তারা যাতে তাদের নিজ দেশে দ্রুত ফিরে যেতে পারে তেমন উদ্যোগে তাদের উৎসাহী মনে হয় না।
জাতিসংঘের এ বছরের অধিবেশনের থিম ছিল, ‘কাউকে পিছিয়ে না রাখি : শান্তি, টেকসই উন্নয়ন এবং মানব মর্যাদার জন্য একসঙ্গে কাজ করা’। বিশ্বনেতৃবৃন্দ এ থিমকে ভিত্তি করে তাদের বক্তব্য দিয়েছেন। যদি প্রশ্ন করা হয়, তাদের বক্তব্য এবং তাদের আচরণে কি মিল আছে? জবাবটা নেতিবাচকই হবে। এভাবে প্রতি বছরই বিশ্বনেতারা জাতিসংঘে মিলিত হয়ে থাকেন এবং সুন্দর সুন্দর কথা বলেন। আর তাদের ঠিক পেছনেই থাকে মানুষের জীবন হারানোর ভয়াল চিত্র। বিশ্বকে শান্তিময় করতে হলে প্রাণঘাতী অস্ত্র বাণিজ্যচিন্তা বাদ দিতে হবে। মানবিক হওয়াটা খুবই জরুরি। আর এ ক্ষেত্রে বৃহৎ শক্তিগুলো যতদিন কথা ও কাজে এক না হবে ততদিন বিশ্ব অশান্তিপূর্ণই থেকে যাবে। শুধু তাই নয়, মানব মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নও থেকে যাবে কথার কথা। বাণিজ্য হোক সবার কিন্তু এ বাণিজ্য মানুষ হত্যার যেন না হয়। যে থিম নিয়ে বিশ্ব সংস্থাটির অর্থাৎ জাতিসংঘের এ বছরের সাধারণ সভা হয়েছে, প্রকৃতই যেন তা বাস্তবায়ন হয়, শান্তিপ্রিয় বিশ্ববাসীর এটাই প্রত্যাশা।