সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:২৫ এএম
পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়িতে ফের নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রেক্ষাপটে যে মর্মস্পর্শী ঘটনা ঘটেছে আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। ২ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাগড়াছড়ি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক আবুল হাসনাত মুহাম্মদ সোহেল রানাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠায় ক্ষুব্ধ প্রতিপক্ষ এই নৃশংস ঘটনা ঘটায়। খাগড়াছড়িতে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং গোলাগুলির ঘটনার জেরে জেলা সদরে ১৪৪ ধারাও জারি করতে হয়। খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে শহরের বিভিন্ন স্থানে বাড়িঘর-দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চিত্র সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে এবং জননিরাপত্তা কতটা হুমকির মুখে রয়েছে, এও মূর্ত হয়ে উঠছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে খুনখাবারি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ঘটছে আইন হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা, যা স্পষ্টতই ‘মব কিলিং’ বলে আমরা মনে করি। দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথ বাহিনী অভিযান পরিচালনা করছে। এর মধ্যেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বিদ্যমান।
‘মব কিলিং’ গুরুতর
সামাজিক অপরাধ। এই অপরাধের বিস্তৃতি কীভাবে ঘটছে, এর মর্মস্পর্শী অনেক নজির ইতোমধ্যে
সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে একটি
মহল। গত ৫ আগস্ট সরকার পতন-পরবর্তী প্রায় দুই মাসের মধ্যে একইরকম ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে
অনেকেই। সংবাদমাধ্যমেই জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিরোধ, পূর্বশত্রুতা, সম্পত্তি-সংক্রান্ত
বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত রেষারেষির নৃশংস রূপ হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছে এসব ঘটনা। পাশাপাশি
সামাজিক ও ধর্মীয় কারণেও সৃষ্ট জনরোষের শিকার হয়েছেন অনেকেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনী এসব ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যা হিসেবেই দেখছে। আমরা মনে করি, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের
ক্ষেত্রে যখন ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়, তখন একশ্রেণির মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার
মতো অপরাধপ্রবণতায় তাড়িত হয়। এই প্রেক্ষাপটে আমরা স্মরণ করছি দক্ষিণ আফ্রিকার ধর্মযাজক
ও অধিকারকর্মী ডেসমন্ড টুটুকে। তিনি যথার্থই বলেছেন, ‘সকলের জন্য ন্যায়বিচার থাকলেই
প্রকৃত শান্তি অর্জিত হতে পারে।’
গত কয়েক দিন আগে
এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা বলেছি, যারা ‘মব কিলিং’-এর মতো নৃশংস ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদের
হয়তো দুরভিসন্ধি রয়েছে। আমরা এও বলেছিলাম, সৃষ্ট পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত
পুলিশসহ প্রতিটি বাহিনীকে এলাকাভিত্তিক অনুসন্ধান করে ভয়াবহ এই সামাজিক অপরাধে জড়িতদের
শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো কোনো
নৃশংস ঘটনায় কিংবা সমাজবিরোধী অপরাধে জড়িতদের আটক করা হলেও সার্বিক প্রেক্ষাপটে সমাজে
বিদ্যমান অস্থিতিশীলতা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অপপ্রবণতা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা
কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দৃশ্যমান নয়, এই অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে
আমরা স্পষ্টতই বলতে চাই, যেকোনো মূল্যে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং আইনের শাসন
ও ন্যায়বিচারের পথ সুগম করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সৃষ্ট
পরিস্থিতি স্বাধীন বাংলাদেশে একটি নতুন অধ্যায়, যে অধ্যায় অতীতের সব কদর্যতা মুছে নতুন
বাংলাদেশ গড়ার তাগিদ দিয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা দেখছি কোনো কোনো ক্ষেত্রে
সেই প্রত্যয়ে অনেকটা চিড় ধরেছে। এমনটি কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।
কারোরই নিজের
হাতে আইন তুলে নেওয়ার অবকাশ নেই, তা ভুলে গেলে চলবে না। আইন তার নিজস্ব গতিতে, নিজস্ব
পথে চলবেÑ এটাই স্বাভাবিক। কোনো সভ্য সমাজে ‘মব কিলিং’ কোনোভাবেই চলতে পারে না। এর
নেপথ্যে কাজ করে অবৈধ জনরায় কিংবা জনাদেশ, যা আইনের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ। আমরা জানি,
মানুষের প্রয়োজনে সমাজ গঠিত হয়েছিল এবং সমাজে মানুষের চাহিদা ও অধিকারের ব্যাপ্তি ঘটেছে
সেই নিরিখেই। আমরা আশা করব সমাজে স্থিতিশীলতা, অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকল্পে রাষ্ট্রের
সবগুলো কাঠামো যূথবদ্ধভাবে ভূমিকা নেবে। কোনোভাবেই মানুষের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য, নিরাপত্তা
খর্ব হতে পারে না। প্রত্যেকেরই আইনের আশ্রয় নেওয়ার অধিকার আছে এবং একজন অভিযুক্তকে
অপরাধী হিসেবে নির্ণয় করার এখতিয়ার একমাত্র আদালতের, তাও মনে রাখা বাঞ্ছনীয়।
‘মব কিলিং’ বর্তমানে
সংক্রামক রোগ রূপে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর প্রেক্ষাপট যাই হোক না কেন, তা কোনোভাবেই মেনে
নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। আমরা প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই, এই নৃশংসতার শেষ কোথায়? আমরা
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর দায়িত্বশীলদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, এ রকম সংবাদ
শুনে প্রতিবিধান নিশ্চিত করতে বিলম্বের কোনো অবকাশ নেই। যথাযথ আইনি প্রতিবিধান নিশ্চিত
করার পাশাপাশি এর বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ তৈরি করতে হবে। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, গুজব থেকে
সমাজে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ও মর্মস্পর্শী ঘটনা ঘটে গেছে। তাই গুজবের বিরুদ্ধেও সৃষ্টি
করতে হবে গণসচেতনতা। সরকারের প্রতি আমরা আহ্বান জানাই, জনগুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টির প্রতি
গভীর মনোযোগ দিন। এমন নৃশংসতায় দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিবিধান যত দৃশ্যমান হবে, স্বেচ্ছাচারী
কিংবা সমাজবিরোধীদের মনে ততোটাই ভীতির সঞ্চার হতে পারে। গত কয়েক দিন আগে ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের দুটি উচ্চ বিদ্যাপীঠেও ‘মব কিলিং’-এর মতো যে বর্বরতা পরিলক্ষিত
হয়েছে, এর সবই বিচারহীন বিচারের ভয়াবহতা বৈ কিছু নয়। ‘ন্যায়বিচার হলো একটি বিবেক। এটি
কারোও ব্যক্তিগত বিবেক নয়, বরং এটি মনুষ্যজাতির মানবতার বিবেক ও চৈতন্যবোধ’Ñ রুশ লেখক
আলেক্সজান্ডার সোলজেনিৎসর এই মন্তব্য আমাদের বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে প্রণিধানযোগ্য
বলে আমরা মনে করি।
দেশের পরিবর্তিত
প্রেক্ষাপটে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলোতে সংস্কারের দাবি উঠেছে। আমরাও মনে করি, যে পচন
সমাজ ও রাষ্ট্রের স্তরে স্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল এ থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সংস্কারের কোনো
বিকল্প নেই। সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত
করতে কোনো সময়ক্ষেপণ যেন না হয়। আমরা মনে করি, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল প্রতিটি মহলকেও
সমগুরুত্বে বিষয়টি আমলে রাখতে হবে।