টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট
ইকরামউজ্জমান
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:২২ এএম
ইকরামউজ্জমান
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার
পর ক্রীড়াঙ্গনে আমরা যে পর্যায়ে ছিলাম তখন বাঙালি নারী
ক্রিকেটাররা বিশ্বকাপে খেলবেন এটি কখনও কল্পনাও করতে পারিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ায় নারীরা
পুরুষের পাশাপাশি তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পেয়েছেন। এশিয়া কাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশ
নারী ক্রিকেট দল ভারত, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কার মতো শক্তিশালী দলকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন
হয়েছে। এ দেশগুলোতে নারীরা অনেক আগে থেকেই ক্রিকেট খেলছেন। বাংলাদেশ নারী দল এশিয়ান
গেমসের ক্রিকেটে রৌপ্যপদক জিতেছে। জিতেছে সাউথ এশিয়ান গেমসের ক্রিকেটে স্বর্ণপদকও।
২০১৪ সাল থেকে বিশ্বকাপ টি-টোয়েন্টিতে খেলছে বাংলাদেশ নারী দল। এখন পর্যন্ত টি-টোয়েন্টি
বিশ্বকাপে জিতেছে দুটি খেলায়। আর এ জয় ঘরের মাটিতে (২০১৪) অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে।
জয় দুটি ছিল গ্রুপ পর্বে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এবং আরেকটি নবম ও দশ স্থান নির্ধারণী খেলায়
আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে। এরপর গত চারটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের একটিতেও বাংলাদেশ জয়ের
মুখ দেখেনি।
ক্রিকেট এখন বাংলাদেশের
অহংকার। ইতিবাচক শক্তি ক্রীড়াঙ্গনে। ক্রিকেট বাঙালির জীবনে নতুন গতি সঞ্চার করেছে।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে দলীয় খেলার মাধ্যমে বাংলাদেশকে তুলে ধরার প্রধান ভরসা এখন
ক্রিকেট। কিন্তু দেশে আমরা ক্রিকেট নিয়ে নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্যের কথা শুনছি সম্মানী
বা বেতন ভাতা বিষয়ে। ক্রিকেট যেখানে আমাদের জাতীয় পরিচয়কে বিশ্ব দরবারে অন্য উচ্চতায়
নিয়ে যাচ্ছে সেখানে এ ধরনের অভিযোগ কোনোভাবেই কাম্য নয়। শুধু ক্রীড়াঙ্গণের ক্ষেত্রেই
নয়, বাংলাদেশে লিঙ্গ বৈষম্য নিরসনের দাবি নুতন নয় এবং এই প্রেক্ষাপটে সরকারের প্রচেষ্টার
কথাও আমরা জানি।
নারী দল ২০১১
সালের ১৪ নভেম্বর পেয়েছে ওয়ানডে স্ট্যাটাস।১০ দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি নারী
বিশ্বকাপের খেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশে। কিন্তু ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট
সরকারের পতন এবং পরবর্তীতে দেশের বিরাজমান সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে
আইসিসি টুর্নামেন্টের ভেন্যু শিফট্ করে নিয়ে গেছে মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাতে।
৩ থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত টুর্নামেন্টে ১০ দল দুই গ্রুপে ভাগ হয়ে অংশ নেবে। বি গ্রুপে
বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচ খেলবে ৩ অক্টোবর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে শারজাহয়। এরপর বাংলাদেশ
যথাক্রমে খেলবে ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৫, ১০, ১২ অক্টোবর।
বাংলাদেশ থেকে নারী বিশ্বকাপের ভেন্যু শিফট্ করা হলেও স্বাগতিক দেশ হিসেবে কিন্তু
বাংলাদেশই থাকছে।
নিশ্চয় ভালো খবর
যে, আইসিসি নারী-পুরুষ বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এখন থেকে সমমানের টুর্নামেন্টে
সমান প্রাইজমানি দেওয়া হবে নারী ও পুরুষ ক্রিকেটে। এতে আসন্ন নারী টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে
চ্যাম্পিয়ন দল পাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৮ কোটি টাকা। আর রানার্সআপ দল পাবে ১৪ কোটি
টাকা। গ্রুপ পর্বে প্রতিটি জয়ের জন্য দল দলগুলো পাবে ৩১ হাজার ১৫৪ মার্কিন ডলার। নির্বাচকরা
নিগার সুলতানার নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের স্কোয়াড ঘোষণা করেছেন এবং কাকে কেন অন্তর্ভুক্ত
করা হয়েছে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। নারী ক্রিকেটে দুর্বলতা হলো সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে আবদ্ধ
আর তাই সঙ্গতভাবেই দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার মতো খেলোয়াড়ের অভাব। এ বিষয়টি কাটিয়ে ওঠার
উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি। বাংলাদেশ দল নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং স্বপ্ন নিয়ে গেছে সংযুক্ত
আরব আমিরাতে। প্রথম খেলায় জয় দিয়ে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে শুরু করতে চায়। নিগার সুলতানা
বলেছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সব সময় চ্যালেঞ্জে ভরপুর। প্রথম খেলায় ৩ অক্টোবর স্কটল্যান্ডের
বিপক্ষে জয় দিয়ে শুরু করাই দলের প্রধান লক্ষ্য। লক্ষ্য অর্জনের জন্য দলের সবাইকে নিজস্ব
অবস্থানে অবদান রাখতে হবে।
ক্রিকেট হলো পুরোপুরি
একটি টিমওয়ার্ক অর্থাৎ দলবদ্ধ কার্যক্রম। এখানে সবাইকে সমগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে
হবে। হয়তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজনের চেয়ে অন্যজনের দক্ষতা কিছুটা কম হতে পারে কিন্তু
আকাশ-পাতাল ফারাক হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। কাজেই টিমের প্রত্যেক সদস্যকে নিজের সবটুকু
উজাড় করে দেওয়ার অঙ্গীকার-প্রত্যয় থাকতে হবে। সামর্থ্য ও ইচ্ছাশক্তি এ দুটি মিলে তৈরি
হয় কর্মদক্ষতা। ক্রিকেটে টিমওয়ার্ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাটিংয়ে দুর্বলতা তখনই পূর্ণ
করা সম্ভব হবে যখন সবাই মিলে মনঃসংযোগের সঙ্গে দায়িত্বশীল ক্রিকেট খেলতে সক্ষম হবেন।
বাংলাদেশ নারী দলের স্পিন এবং পেস আক্রমণ দারুণ রোমাঞ্চকর না হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা
করার জন্য কার্যকর। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশ কখনও হারেনি। দক্ষিণ আফ্রিকাকে
তাদের কন্ডিশনে পরাজয় করারও নজির আছে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে পরিকল্পনামাফিক দিনের
খেলা। আরব আমিরাতে খেলতে যাওয়ার আগে শ্রীলঙ্কায় নারী দলের প্রস্তুতি ভালো হয়েছে।
প্রস্তুতি জীবনের
যেকোনো ক্ষেত্রে সাফল্য লাভের পথে অনেকটাই এগিয়ে দেয়। নিজেদের সামর্থ্য আর সহজাত প্রতিভার
ওপর বিশ্বাস রাখা জরুরি। প্রতিটি খেলায় নামা হয় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ভয় না পাওয়ার মন্ত্র
নিয়ে। নারী ক্রিকেট কার্যক্রমের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হাবিবুল বাশার সুমন।
বাংলাদেশ জাতীয় দলের এই প্রাক্তন অধিনায়ক এবং একসময়ে পুরুষ জাতীয় দল নির্বাচনের নির্বাচক
বলেছেন, নারী দলের লক্ষ্য সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছানো। বিষয়টি কঠিন, এর পরও ইতিবাচক
মানসিকতা নিয়ে লড়াই করাটা অনেক বড় বিষয়। বাংলাদেশ নারী দল তো ইতোমধ্যে পাঁচটি বিশ্বকাপ
খেলে ফেলেছে।
স্বপ্ন অবশ্যই দেখতে হবে। কথায় আছে, মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়। শুধু স্বপ্নই নয়, আত্মবিশ্বাসও প্রয়োজন। আত্মবিশ্বাস যে কোনো ক্ষেত্রে অন্যতম শক্তি যোগায়। আত্মবিশ্বাসের পথ ধরেই দলবদ্ধভাবে প্রচেষ্টা চালালে সুফল না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। পাশাপাশি অভিজ্ঞতাও বড় একটি বিষয়। অভিজ্ঞতার প্রতিফলন নিশ্চয়ই সুফল বয়ে আনে। টি-টোয়েন্টি হলো ঠিক সময়ে ঠিক কাজটি করা। আর এর জন্যই সঠিক খেলোয়াড় বেছে নিয়ে কাজে লাগানো হয়। সঠিক মানসিকতা আর চাপের মধ্যে পারফর্ম করতে পারাটা জরুরি। টি-টোয়েন্টি এমন ক্রিকেটÑযে কোনো দিন যে কোনো কিছু হতে পারে। শুভকামনা বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের জন্য।