ছাত্ররাজনীতি
ডা. মুশতাক আহমেদ
প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২৪ ১২:৫৫ পিএম
বিগত তিন দশক থেকে ছাত্ররাজনীতির নামে অপরাজনীতির চর্চা করা হচ্ছে—এই অভিযোগ অমূলক নয়। ছাত্র সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে ছাত্রদের অধিকার নিয়ে কথা না বলে দলীয় লেজুড়বৃত্তির চর্চা করছে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় ছিল তার ছাত্র সংগঠগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকত ক্যাম্পাস। থাকত না কোনো রাজনৈতিক সহাবস্থান। ক্ষমতাসীন দলগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে ক্যাম্পাসে রাজনীতি করার কোনো সুযোগ দিত না। এখন ওই অবস্থার পরিবর্তনের সুযোগ এসেছে আমাদের সামনে। ২৩ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদন অনুসারে ঢাকা, বরিশাল, জগন্নাথ, কুমিল্লা, বেগম রোকেয়া, বাংলাদেশ কৃষি, শেরেবাংলা ও সিলেট কৃষি, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহ, স্যার সলিমুল্লাহ, শহীদ জিয়াউর রহমান, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ; ইডেন, রাজশাহী, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া ও বগুড়ার সান্তাহার সরকারি কলেজসহ দেশের ১৮টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ১০টি সরকারি কলেজ ও ১০টি সরকারি মেডিকেল কলেজসহ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে দেশের অন্তত শতাধিক উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিষিদ্ধ করা হয়েছে ছাত্ররাজনীতি। পাশাপাশি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক রাজনীতিও নিষিদ্ধ হয়েছে। তবে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ নিয়ে দেখা দিয়েছে মতপার্থক্য। অনেকের মতে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করলে ইতিবাচক কোনো ফল আসবে না। অধিকাংশের মতে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হলে উল্টো নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা সংস্কৃতিবিমুখ হয়ে উঠবে। তাই ছাত্ররাজনীতি বন্ধ না করে এর সংস্কার এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্র সংসদ কার্যকর করা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডগুলো বাড়ানো উচিত। আবার অন্য একটি অংশ মনে করছে, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ না করলে পুরোনো পেশিভিত্তিক ছাত্রসাংগঠনিক কাঠামোই মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। এ রকম নানা বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি যখন ক্রমাগত জটিলতার দিকে যাচ্ছে তখন বাড়তি কিছু উপসর্গ যুক্ত হচ্ছে।
১৯ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নবনিযুক্ত উপাচার্যের সঙ্গে ১০টি ছাত্র সংগঠনের নেতারা বৈঠক করেন এবং তারা ছাত্ররাজনীতির সংস্কার বিষয়ে তাদের মতামত উপস্থাপন করেন। আমার বক্তব্য, ছাত্ররাজনীতি নয় বরং লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার বিষয়ে অধিকতর জোর দিতে হবে। আমরা জানি, জুলাই আন্দোলনের একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি নিষিদ্ধসহ নয় দফা দাবি তোলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। সরকার পতনের পরপরই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া বিতর্কিত শিক্ষকদের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পদত্যাগ করেন বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি, রেজিস্ট্রারসহ পদধারীরা। অনেক ক্যাম্পাসে আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
আমরা দেখছি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির যে স্বরূপ শিক্ষাঙ্গনে মূর্ত হয়ে উঠেছে তা মূলত নানাভাবে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, পেশিশক্তির প্রয়োগ, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি, ভিন্নমত দমন, দখল-পীড়নের চিত্র। ছাত্ররাজনীতির এ দানবীয় চেহারাকে অনেকেই ছাত্ররাজনীতির প্রধান অংশ বিবেচনা করে আসছেন। আমরা দেখে এসেছি, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনই বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাঙ্গনে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে। অন্য অনেক সংগঠন তাদের কাজ চালিয়ে যেতে চাইলেও অধিকারের কথা বলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব গ্রহণ করার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষা অর্জন করার পথ অনেকাংশেই রুদ্ধ ছিল। অথচ ছাত্ররাজনীতি মূলত রাজনীতি শেখার একটি মঞ্চ। কিন্তু এক্ষেত্রেও ক্ষমতার জোরে বৈষম্যের ছায়া ছড়িয়েছে এবং এর ফলে বল প্রয়োগের বহুমাত্রিক কদর্যতাও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। দেশ ও দশের স্বার্থে চিন্তা ও কাজ করার মাধ্যমে রাজনীতি পরিচালিত হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, দীর্ঘদিন এসব কর্মকাণ্ড নির্ভয়ে স্বাধীনভাবে করার কোনো পরিবেশ ছিল না। এ পরিবেশ যদি নিশ্চিত হয় তাহলে শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে সর্বত্র ন্যায়ের শক্তি বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু ছাত্ররাজনীতি সার্বিকভাবে নিষিদ্ধ হলে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া মসৃণ করার পথটিও বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে জাতি আবার নেতৃত্বশূন্য হওয়ার শঙ্কায় থাকতে পারে।
লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত। বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ চরম অত্যাচার করে শিক্ষার্থীদের ভীতসন্ত্রস্ত করেছে। ভীতসন্ত্রস্ত ছাত্র সংগঠনগুলো ছাত্রদের সংগঠিত করে ঊনসত্তরের মতো এবার একটি বিপ্লব সংঘটিত করেছে। বর্তমানে প্রচলিত ধারায় রাজনৈতিক সংগঠনগুলো তাদের ছাত্র সংগঠনকে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করবে এমনটি মেনে নেওয়া যায় না। কাজেই আলোচনার ভিত্তিতে ছাত্রদের অবশ্যই অধিকার রাখতে হবে সংগঠিত হয়ে প্রতিবাদ করার। যখনই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করবে তখন তাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দমন করার সুযোগ তৈরি হবে, যদি সার্বিকভাবে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা হয়। ভোটাধিকার প্রয়োগ করে সাংবিধানিকভাবেই শিক্ষার্থীরাও নাগরিক হিসেবে নির্বাচিত করার এবং নির্বাচিত হওয়ার অধিকার রাখে।
সুতরাং রাজনীতির খোলনলচে না পাল্টিয়ে দেশের তরুণ সমাজের বিশাল অংশকে এর বাইরে রাখা ভবিষ্যতের জন্য বড়ই বিপজ্জনক হবে। ছাত্ররাজনীতির নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পথ রুদ্ধ করতে হবে। সিটবাণিজ্য বন্ধের জন্য প্রশাসনিক উদ্যোগ নিতে হবে। কারা কিভাবে ছাত্ররাজনীতির পথ কণ্টকাকীর্ণ করেছে তা তো অজানা নয়। শিক্ষার পরিবেশ করতে হবে গণতান্ত্রিক। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন মতপথের ছাত্রছাত্রী আসবে। কিন্তু তারা যদি লেজুড়বৃত্তিক রাজনৈতিক ধারার অনুসারী হয়ে আসে তাহলে নতুন মতামতের জায়গা তৈরি হয় না। রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনা হবে। এ আলোচনার মাধ্যমেই মূলত গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিকশিত হবে। এমন ছাত্র রাজনীতির পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যেখানে ছাত্ররাই নির্ধারণ করবে তারা কোন মতাদর্শ গ্রহণ করবে। পাশাপাশি ছাত্র সংসদ নির্বাচন ও মুক্তজ্ঞান চর্চার জায়গা তৈরি করতে হবে। সব মত ও চিন্তার যৌক্তিক প্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলেই তা সম্ভব হবে।
বিগত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ নানা ধরনের অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই প্রেক্ষাপট ও কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি উঠেছে কোনো কোনো মহল থেকে। বিলম্ব না করে শিক্ষাঙ্গনে সংস্কার অনেক জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতিকেও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ জরুরি। যেন তারা স্বেচ্ছাচারিতা চালাতে না পারে সেজন্যই এ প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। গণতান্ত্রিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিনির্মাণ ও সবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। ছাত্র সংগঠনের নিয়মিত নির্বাচন ও ছাত্র সংগঠনগুলোর একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ নীতিমালা বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন এবং শিক্ষার্থীর মতামতের ভিত্তিতেই করতে হবে। এজন্য একাধিক সেমিনার ও আলোচনার আয়োজন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মনে ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে যে ভীতি রয়েছে তা দূর করার চেষ্টা করতে হবে। নীতিমালায় উল্লেখ থাকবে, ছাত্র সংগঠনগুলো কী কী কাজ করবে এবং তাদের সঙ্গে কোনো লেজুড়বৃত্তিক কার্যক্রমের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয় কী কী ব্যবস্থা নিতে পারে তা-ও উল্লেখ করতে হবে। শুধু তাই নয়, যেসব শিক্ষার্থী দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন তারা যদি কখনও ছাত্র সংগঠনের কোনো অনিয়ম বা ভুল চিহ্নিত করেন তাহলে তারাও যেন প্রশাসনকে নির্ভয়ে অবহিত করতে পারেন এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ছাত্র সংগঠন যেকোনো দাবির পক্ষে কাজ করবে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দাবি আদায়ে চাপ প্রয়োগ করবে।
অনৈতিক, অসুস্থ কোনো পরিবেশ যেন কোনো ছাত্র সংগঠন ছাত্ররাজনীতি করতে না হয় তা-ও নীতিমালায় থাকবে। আবার সাধারণ শিক্ষার্থীদের সচেতন করা, নানা বিষয়ে সহযোগিতা করার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী স্থানে জনসংযোগের মতো কাজও তারা করবে। প্রতিটি ছাত্র সংগঠন নিজে একটি সংস্থার মতো আত্মপ্রকাশ করতে পারে। কোনো দলের অঙ্গসংগঠন নয় বরং নিজেদের তাজা আদর্শের ভিত্তিতে তারা রাজনৈতিক সংস্থা গড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করবে। এভাবেই আমাদের ছাত্ররাজনীতির সংস্কার করতে হবে। বিগত বছরগুলোয় আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড যে ছাত্ররাজনীতি নয়, তা সাধারণ শিক্ষার্থী ও সচেতনদের বুঝতে হবে। ক্যাম্পাসে ভয়মুক্ত ও শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে আরও সেমিনার আয়োজন করতে হবে। জ্ঞানের বিকাশের পাশাপাশি সুস্থ ধারার ছাত্ররাজনীতির পথে প্রতিবন্ধক হয়ে আছে এমন সবকিছুই নির্মূল করতে হবে। রাজনীতিতে সৃজনশীলতার অভাবই মূলত নানা সংকট সৃষ্টি করে। কিন্তু দেশের সচেতন মহলের চাওয়া, রাজনীতি পরিচালিত হবে মেধা ও শিক্ষার্থীদের চাওয়ার ভিত্তিতে।