আবদুল মুকতাদির মামুন
প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৪ ১৫:১৭ পিএম
‘আমি তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল, সব ভুলে যাই তাও ভুলি না বাংলা মায়ের কোল!’ আসলেই তিনি ভোলেননি বাংলা মাকে! জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মায়ের কোলে ফিরে আসার প্রবল আকুতি ছিল এই মহান পুরুষের অন্তরে। কিন্তু দেশভাগের ক্ষত আর শারীরিক অক্ষমতায় তার আর মায়ের কোলে ফেরা হয়নি! বলছি শচীন দেববর্মণের কথা, শচীনকর্তা এবং এস ডি বর্মণ নামে যিনি সমধিক পরিচিত। ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর পূর্ববঙ্গের ত্রিপুরার জেলা সদর কুমিল্লার বর্মণ হাউসে তার জন্ম। বাবা ছিলেন ত্রিপুরার রাজকুমার নবদ্বীপচন্দ্র বর্মণ এবং মা মণিপুরের রাজকুমারী শ্রীমতী নির্মলা দেবী। তারা ছিলেন ত্রিপুরার চন্দ্রবংশীয় মাণিক্য রাজ পরিবারের বংশধর। ত্রিপুরার মহারাজারা কুমিল্লায় তৈরি করেছিলেন টাউন হল (বর্তমান রাজা বীরচন্দ্র নগর মিলনায়তন), নাট্যশালা ও নানা সাংস্কৃতিক সংগঠন। ১৯১০-১৯২০ সালের মধ্যে কুমিল্লায় গড়ে উঠেছিল ঠাকুরপাড়ার সুরলোক, কান্দিরপারের সবুজসংঘ নাট্যদল, দ্য গ্রেট জার্নাল থিয়েটার পার্টি ও ইয়ংমেন্স ক্লাব।
বাবা নবদ্বীপচন্দ্র
ছিলেন সংগীতে পারদর্শী। বাবার কাছেই শচীন দেবের সংগীতে হাতেখড়ি। ওস্তাদ আফতাবউদ্দীন
খাঁ, ফৈয়াজ খাঁ ছিলেন তার সংগীত শিক্ষক। কুমিল্লার ধর্মসাগর আর তালপুকুর ছিল তার প্রিয়
জায়গা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওসব জায়গায় সময় কাটাতেন আর সুর ভাঁজতেন। শচীন দেবের বন্ধু ছিলেন
সুরসাগর হিমাংশু দত্ত, অজয় ভট্টাচার্য, ওস্তাদ খসরু মোহাম্মদ, সমরেন্দ্র পাল, মোহিনী
চৌধুরী, গায়নাচার্য সুরেন দাশ প্রমুখ। ১৯২০-১৯২১ সময়ে কবি নজরুল যখন কুমিল্লায় ছিলেন,
তখন রাজ পরিবারের সঙ্গে তার পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তারা একসঙ্গে গান করতেন।
১৯২৫ সালে শচীন দেব কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ ক্লাসে ভর্তি হন। এ সময় তিনি গুরু কৃষ্ণচন্দ্রের
কাছে সংগীতে আনুষ্ঠানিক দীক্ষা লাভ করেন। এরপর ভীষ্মদেব, বাদল খান, ওস্তাদ আলাউদ্দিন
খাঁর কাছ থেকেও তালিম নেন। বাংলায় তার অমর সৃষ্টিÑবাঁশি শুনে আর কাজ নাই, নিটোল পায়ে
রিনিক ঝিনিক, শোনো গো দখিন হাওয়া, মন দিল না, তুমি এসেছিলে পরশু কাল কেন আসোনি, তুমি
আর নেই সে তুমি, তুমি যে গিয়াছ বকুল বিছানো পথে, নিশিথে যাইও ফুলবনে, রঙিলা রঙিলা রে,
ওরে সুজন নাইয়া, তুমি নি আমার বন্ধু, বর্ণে ছন্দে গন্ধে গীতিতে, ঘাটে লাগাইয়া ডিঙ্গা,
তোরা কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া।
১৯৪৪ সালে শচীন
দেববর্মণ সংগীত নিয়ে ব্যাপক পরিসরে কাজ করার জন্য বোম্বেতে চলে যান। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৫
সাল পর্যন্ত তিনি ৯৭টি হিন্দি চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেন। এসব ছবির গান সেসময়
তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে!
প্রজন্মের পর
প্রজন্মের মুখে মুখে গুনগুন করে আর প্রাণে প্রাণে বাজে যেসব গানের সুর সেগুলো কি ভোলা
যায়? সাঁইয়া দিল মে আনারে, দুনিয়া কা মাজা লে লো, আজ কি রাত পিয়া, মেরা সুন্দর স্বপনা
বিত গায়া, তদবির সে বিগরি হুয়ি, তেরে ঘর কি সামনে, জানু জানু রে, রাত কি সামা ঝুমে
চন্দ্রমা, যায়ে তো যায়ে কাঁহা, ওয়াক্ত নে কিয়া কেয়া হাঁসি সিতম, হাম আপকে আঁখো মে,
জানে কিয়া তু নে কাঁহা, আজ সাজান মোহে আঙ্গ লাগা লো, বাচপান কি দিন ভি, নানহি কালি
সুনে চালি, দিল পুকারে আরে আরে, আজ ফির জি নে কি তামান্না হ্যায়, গাতা রাহে মেরা দিল,
মেরে সপনো কি রানী কাব আয়েগি তু, কোড়া কাগজা থা ইয়ে মান মেরা। শচীন দেব, কিশোর কুমার,
গীতা দত্ত, গুরু দত্ত এবং দেবানন্দ ছিলেন হরিহর আত্মা। অনেক কাজ তারা একসঙ্গে করেছিলেন।
১৯৭৫ সালর ৩১ অক্টোবর শচীন দেববর্মণ বোম্বেতে পরলোকগমন করেন। এ কীর্তমান মহাপুরুষকে
বাংলাদেশের মানুষ স্মরণে রাখবে চিরকাল।