অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার
প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৪ ১২:৫৩ পিএম
আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার, অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, ডিন, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ; যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং চেয়ারম্যান, বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বের সমসাময়িক অনেকগুলো পরিবেশগত সমস্যার মধ্যে ভয়াবহ একটি হচ্ছে প্লাস্টিক দূষণ। জার্মানির পরিসংখ্যান বিষয়ক অনলাইন প্ল্যাটফরম স্ট্যাটিস্টার তথ্যমতে, প্লাস্টিক উৎপাদন এই শতাব্দীর শুরুতে যা ছিল, তা থেকে দ্বিগুণ হয়ে ২০২১ সাল নাগাদ প্রায় ৪০০ মিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। প্লাস্টিক পণ্যের আয়ুষ্কাল গড়ে ১০ বছর হলেও উপাদান ও গঠনজনিত কারণে তা পুরোপুরি পচতে কখনও কখনও ৫০০ বছরও লাগতে পারে। জাতিসংঘের পরিবেশ প্রকল্প ইউনেপের তথ্যমতে, উৎপাদিত ও ব্যবহৃত প্লাস্টিকের মাত্র ২২ থেকে ৪৩ শতাংশ নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলা হয়। বাকি সব চলে যায় নদী-খাল, সমুদ্রসহ নানা খোলা জায়গায়। ডব্লিউডব্লিউআইয়ের তথ্যমতে, এক থেকে দুই কোটি টন প্লাস্টিকের শেষ গন্তব্য হচ্ছে সাগর। যার প্রভাবে বিভিন্ন দেশের সাগর ও মহাসাগর প্লাস্টিক দূষণে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে অনুপযুক্ত প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশ ছিল প্লাস্টিক দূষণে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। শুধু ঢাকাতেই প্রতি বছর মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার হয় ২২.২৫ কিলোগ্রাম। ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়, যা পুরো বাংলাদেশে উৎপন্ন বর্জ্যের ১০ শতাংশ। বাংলাদেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় কম হলেও ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। কারণ প্রথমত, বাংলাদেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তুলনামূলক নিম্নমানের। এখানে পচনশীল এবং অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করার সঠিক ব্যবস্থাপনা নেই। ফলে অপচনশীল প্লাস্টিক মাটিতেই থেকে যাচ্ছে বছরের পর বছর। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ নদীমাতৃক এবং নিম্ন প্রবাহের দেশ হওয়ায় উজানের পানির সঙ্গে প্রচুর প্লাস্টিক বর্জ্য বাংলাদেশের সমভূমির ওপর দিয়ে সাগরে গিয়ে পড়ছে। ফলে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার কম হলেও বিভিন্ন কারণে দূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। প্লাস্টিকের এসব ধ্বংসাবশেষের ফলে মৎস্য ও পর্যটন খাতে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী ক্ষতির মূল্য প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিকপণ্যের চেয়ে ইথাইলিনযুক্ত পলিথিন ব্যবহারের পরিমাণ এদেশে তুলনামূলক বেশি। ছোট থেকে বড় যেকোনো পণ্য প্যাকিংয়ে এখানে পলিথিনের ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশ পৃথিবীর প্রথম দেশ, যেখানে পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু ২০০২ সালে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বাস্তবে এটি কার্যকর হয়নি। আইনের দুর্বল প্রয়োগের কারণে এখানকার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ কোনো-না কোনোভাবে প্রতিদিন পলিথিন ও প্লাস্টিকসামগ্রী ব্যবহার করছে। ব্যবহৃত এসব পলিথিন ঠাঁই নিচ্ছে নর্দমা, খাল, নদী প্রভৃতি স্থানে। পলিথিনের অনিয়মিত ব্যবস্থাপনা ঢাকা শহরের ৮০ শতাংশ জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ।
মাটির অণুজীব ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য ডি-কম্পোজ করতে পারে না। তাই আবহাওয়ার প্রভাবে এ বর্জ্য দীর্ঘমেয়াদে ছোট্ট টুকরো হয়ে বাতাস বা পানিতে মিশতে থাকে। সাগর-নদীতে ফেলা প্লাস্টিক বর্জ্য ছোট্ট টুকরো হয়ে মাছের খাবারের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশের আশঙ্কা থাকে। জলজ প্রাণী এসব খাবার হজম করতে না পেরে মারাও যায় অনেক সময়। প্লাস্টিক দূষণের প্রভাবে উদ্ভিদ বা জলজ প্রাণীর পাশাপাশি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানুষেরও দেখা দিয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। মানবদেহে থাইরয়েডের হরমোনের অতিরিক্ত ক্ষরণ এবং বিশেষ করে ক্যানসার, চর্ম ও কিডনি রোগের মতো ভয়াবহ রোগ সৃষ্টির জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী এই প্লাস্টিক।
প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্বল্পমেয়াদি সমাধান
এই সমস্যার সমাধানে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। স্বল্পমেয়াদি সমাধানের মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিক নিষেধাজ্ঞার কঠোর বাস্তবায়ন, বর্জ্য পৃথকীকরণের ব্যবস্থা, প্লাস্টিক সংগ্রহ এবং বিনিময় প্রোগ্রাম, ক্ষুদ্র রিসাইক্লিং উদ্যোগকে সমর্থন, শিক্ষা ও জনসচেতনতা বাড়ানো। প্লাস্টিক ব্যাগসহ একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার কমানোর জন্য আইনের কড়া বাস্তবায়ন প্রয়োজন। সরকার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে বাজার এবং ব্যবসা পর্যবেক্ষণ করে যারা এই আইন লঙ্ঘন করেন, তাদের জরিমানা আরোপ করতে হবে। সরকার ও বেসরকারি খাত যৌথভাবে প্লাস্টিক সংগ্রহের জন্য প্রণোদনা প্রোগ্রাম চালু করতে পারে, যেখানে সাধারণ মানুষ প্লাস্টিক বর্জ্যের বিনিময়ে অর্থ বা অন্যান্য পুরস্কার পাবে। এর ফলে মানুষকে প্লাস্টিক বর্জ্য পরিষ্কারে উৎসাহিত করা যাবে এবং পুনর্ব্যবহারের জন্য বর্জ্য সংগ্রহ বাড়বে। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং অনানুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং খাত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই খাতের ব্যবসায়ীদের প্রযুক্তিগত সহায়তা, ভর্তুকি এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়িয়ে তাদের কার্যক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। এছাড়া স্বল্পমেয়াদে প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলার জন্য জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল, কলেজ এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে পরিবেশবান্ধব আচরণ প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া এবং স্থানীয় প্রচারাভিযানগুলোতে প্লাস্টিক দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব এবং পুনর্ব্যবহারের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ালে তা দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে।
প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যমেয়াদি সমাধান
মধ্যমেয়াদি সমাধানের মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদন প্রকল্প, উৎপাদক দায়িত্ব সম্প্রসারণ আইন এক্সপেনডেড প্রোডিউসার রেসপনসিবিলিটি (ইপিআর), প্লাস্টিকমুক্ত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং এবং ইকো-লেবেলিং। প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদন প্রকল্পে বিনিয়োগ করে প্লাস্টিক দূষণ এবং শক্তি সংকটের মোকাবিলা একসঙ্গে করা যেতে পারে। যেমন, পিরোলাইসিস প্রযুক্তির মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্যকে জ্বালানিতে রূপান্তর করা যায়। যা বর্জ্য কমানোর পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ করবে। ইপিআর আইনটি প্লাস্টিক পণ্যের উৎপাদকদের তাদের পণ্যের জীবনচক্রের শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব নিতে বাধ্য করে। এর ফলে উৎপাদকরা প্লাস্টিক ব্যবহারে সচেতন হবে এবং টেকসই প্যাকেজিং প্রচলন করবে। এটির সম্প্রসারণ মধ্যমেয়াদি সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা যেমন ইকোপার্ক, সমুদ্রসৈকত এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে ‘প্লাস্টিকমুক্ত অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করা যেতে পারে। এসব এলাকায় প্লাস্টিক ব্যবহার, বিক্রয় ও বিতরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। এটি শুধু ওই এলাকাগুলোর দূষণ কমাবে না, বরং দেশের অন্যান্য অংশের জন্যও দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে। সরকার, বেসরকারি খাত এবং এনজিওগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়িয়ে প্লাস্টিকদূষণ মোকাবিলা করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ কোম্পানিগুলো পৌরসভাগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব করে বর্জ্য সংগ্রহ উদ্যোগগুলোতে অর্থায়ন করতে পারে অথবা পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংয়ের গবেষণায় বিনিয়োগ করতে পারে। এছাড়া টেকসই ভোক্তাপ্রবণতাকে উৎসাহিত করতে সরকার পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং এবং লেবেলিং ব্যবস্থা প্রচলন করতে পারে। এই লেবেলগুলো পণ্যের পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা বা জৈবিকভাবে ক্ষয়যোগ্যতার নির্দেশ করবে, যা ভোক্তাদের সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।
প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের মধ্যে রয়েছে শূন্যবর্জ্য শহর এবং বৃত্তাকার অর্থনীতি, প্লাস্টিক বিকল্পের জন্য উদ্ভাবন, জাতীয় আমানত ফেরত ডিপোজিট রিটার্ন স্কিম (ডিআরএস), জাতীয় প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা কৌশল, প্লাস্টিকদূষণ নিয়ন্ত্রণকে জলবায়ু কর্মপরিকল্পনায় সংযোজন। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ হিসেবে ‘শূন্যবর্জ্য শহর’ গড়ে তোলা যেতে পারে। যেখানে সকল বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করা হবে, কম্পোস্ট করা হবে বা পুনরায় ব্যবহার করা হবে। শহরগুলোকে বৃত্তাকার অর্থনীতির নীতি অনুসরণ করতে হবে, যেখানে পণ্যগুলোকে দীর্ঘস্থায়ী করার ওপর জোর দেওয়া হবে এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হবে। প্লাস্টিকের বিকল্প উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। গবেষণার মাধ্যমে কম খরচে টেকসই উপাদান উদ্ভাবন করা হলে প্লাস্টিকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। একটি জাতীয় আমানত ফেরত ডিআরএস চালু করা যেতে পারে। যেখানে প্লাস্টিক বোতল এবং কন্টেইনার ফেরত দিলে অর্থ দেওয়া হবে। এটি প্লাস্টিকের প্যাকেজিং পুনর্ব্যবহারকে উৎসাহিত করবে এবং দূষণ কমাবে। প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশল তৈরি করা প্রয়োজন। এই কৌশলে প্লাস্টিক ব্যবহার হ্রাস, পুনর্ব্যবহার বাড়ানো এবং জৈবিক বিকল্প প্রচারের জন্য স্পষ্ট লক্ষ্য ও সময়সীমা থাকতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে প্লাস্টিকদূষণ নিয়ন্ত্রণকে বাংলাদেশে জলবায়ু কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। প্লাস্টিক উৎপাদন ও নিষ্পত্তিতে উল্লেখযোগ্য কার্বন নির্গমন ঘটে। জলবায়ুবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই নির্গমন কমানো সম্ভব।
প্লাস্টিকদূষণ বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুতর পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা। সমস্যাটি মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপও ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। তবে এই পদক্ষেপগুলোর সফল বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান গ্রহণের জন্য সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি ও সামাজিক দায়বোধ, বেসরকারি খাতের সহযোগিতা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো অপরিহার্য। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পুনর্ব্যবহার বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রতি ঝোঁক তৈরি করা গেলেই কেবল এ সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।