সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৩:৩৫ পিএম
গত সরকারের শাসনামলেই জ্বালানি খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির নানা খবর বারবার
সংবাদমাধ্যম তো বটেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আলোচনার বিষয় ছিল। তারপরও যার বা যাদের
বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছিল, সেসবের কোনো প্রতিকার হয়নি। বরং অভিযুক্তরাই নানাভাবে
ফুলেফেঁপে উঠেছেন। তাদের সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে। যে সম্পদের বড় অংশই পাচার হয়ে গেছে
বিদেশে। গত সরকারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রচারণা ছিল উন্নয়ন। উন্নয়নের ছোঁয়া যে দেশের
আনাচেকানাচে লাগেনিÑ তা অবশ্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু উন্নয়নের যে চিত্র প্রকাশ
হয়েছে, তাতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে, অপ্রয়োজনীয় ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন;
যা প্রকৃতার্থে দেশের উপকারের চেয়ে অপচয়ের পাল্লাই অনেকাংশে ভারী করেছে। অপচয়ের বড়
একটি ক্ষেত্র ছিল আমাদের জ্বালানি খাত। এ খাতের উন্নয়নে গত সরকারের শাসনামলে নেওয়া
হয়েছিল অসংখ্য মেগা প্রকল্প। আমরা জানি, উন্নয়নের প্রধান শর্ত জ্বালানি। এ খাতকে সমৃদ্ধ
এবং পরিপূর্ণ না করে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। যেকোনো উৎপাদনশীলতার জন্যই প্রয়োজন জ্বালানি।
জ্বালানি উৎপাদন ও উন্নয়নের প্রধান চালিকা শক্তি। জ্বালানির জোগান
ব্যয়বহুল তো বটেই, তা অনেক বেশি সময়সাপেক্ষও। তাই দেশের জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে গত সরকারের
আমলে নেওয়া হয়েছিল কুইক রেন্টাল পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ। সে উদ্যোগ আমাদের
অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে, কী পরিমান ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা
আগাম সতর্ক করেছেন। সংবাদমাধ্যমেও সেসব নিয়ে প্রতিবেদন এসেছে। প্রবাদ রয়েছে, চোরে না
শোনে ধর্মের কাহিনী। সেই প্রাচীন প্রবাদের মতো বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অগ্রাহ্য করেই গত
দেড় দশকে একের পর এক কুইক রেন্টালের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে; যা পরবর্তীকালে আমাদের কাঁধে
সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো চেপে বসে। অর্থনীতিকে ক্রমশ ফাঁকা করে অবদান রাখে বাজারে মূল্যস্ফীতি
বাড়াতেও। সেই অনিয়মেরই উদ্বেগজনক একটি চিত্র উঠে এসেছে ২৯ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর
প্রতিবেদনে। ‘বিলাসী প্রকল্পে বিপন্ন জ্বালানি খাত’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়,
শুধু বাণিজ্যিক গ্যাসের জন্যই নয়, গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামেও গচ্চা দেওয়া
হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বিগত সরকার খুলনায় গ্যাসনির্ভর তিনটি বিদ্যুৎ উৎপাদন
কেন্দ্রের পেছনে গচ্চা দেয় ৮ হাজার কোটিরও বেশি টাকা। অথচ এই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে
গ্যাসের সরবরাহই নিশ্চিত করা হয়নি, ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোও দেখেনি উৎপাদনের
মুখ।
প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের
অর্থায়নে নির্মিত এই তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের জোগান নিশ্চিত না করে গ্যাস দেওয়া
হয় তালিকায় নাম না-থাকা অন্য চারটি বেসরকারি কেন্দ্রকে। ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে ১০০০
মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার এই তিন সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র। যদিও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নির্মাণের
আগে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে শতভাগ গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তাপ্রাপ্তি ও একনেক থেকে প্রকল্পের
ডিপিপি অনুমোদন দেওয়া হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতেই এডিবি ঋণচুক্তি সই করেছিল।
শুধু বিদ্যুৎ খাতই নয়, একইভাবে অপচয় করা হয়েছে গ্যাস খাতেও। অপ্রয়োজনীয়
গ্যাস সরবরাহ লাইন স্থাপন করা হয়েছে। যার মাধ্যমে ক্ষতি হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা।
প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকেই জানা যায়, ১৯৯৩ সালের ৪ ডিসেম্বর জিটিসিএল যখন কোম্পানি হিসেবে
নিবন্ধনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে, তখন তাদের সঞ্চালন লাইন ছিল ৫৪৪ কিলোমিটার। অথচ
২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে জিটিসিএল-এর সঞ্চালন লাইন দাঁড়ায় ২ হাজার ১৬৭ কিলোমিটারে। গ্যাসের
উৎপাদন বা সরবরাহ না বাড়লেও এই সঞ্চালন লাইন বাড়ানোর পুরো ব্যয় করা হয় শুধু আওয়ামী
লীগ সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য।
দেশে জ্বালানি চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। উন্নয়ন ও উৎপাদনের চাকা সচল
রাখতে জ্বালানি খাতের নজর দেওয়ার বিকল্প নেই। আমরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে দুর্নীতিমুক্ত
দেখতে চাই। আমাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে জ্বালানি খাত যেন কোনোভাবেই হোঁচট
না খায় অন্তর্বর্তী সরকারকে সেদিকে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি সরকারকে দ্রুত উদ্যোগী হতে
হবে অপ্রয়োজনীয় এবং সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো কাঁধে চেপে বসা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো
কাঁধ থেকে নামাতে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের বিকল্প নেই, সেই চাহিদা পূরণের সরকারকে নির্ধারিত
লক্ষ্য স্থির করেই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে এবং বিকল্প ব্যবস্থাও রাখতে হবে।
পাশাপাশি নিতে হবে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে সুচিন্তিত পরিকল্পনাÑযা
প্রকৃতপক্ষেই বাস্তবসম্মত ও সময়োচিত। উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ ব্যবস্থার সব প্রক্রিয়া
করতে হবে প্রশ্নমুক্ত। জ্বালানি খাতের অনিয়মের উৎস সন্ধানের সঙ্গে সঙ্গে অপচয়ও বন্ধ
করতে হবে।