লেফটেন্যান্ট তানজিম হত্যা
এলিনা খান
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৩:৩২ পিএম
আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৩:৪৮ পিএম
২৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়ায় একটি বাড়িতে ডাকাতির খবর পেয়ে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালাতে গেলে সশস্ত্র ডাকাতদল ও সন্ত্রাসীদের গুলি-ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে খুন হন সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জন। একজন মায়ের আকুতি হিসেবেই সেনাপ্রধানের কাছে আমার এ খোলা চিঠি।
মাননীয় সেনাপ্রধান, দেশের প্রয়োজনে এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপনারা সদাতৎপর। দেশের
অভ্যন্তরে নানা অভিযানে আপনারা অংশ নেন। বিশেষত পার্বত্যাঞ্চলে দুষ্কৃতকারীদের অপতৎপরতা
বন্ধের জন্য আপনারা বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করেন। দুর্গম অঞ্চলে যখন আপনারা কোনো অভিযানে
সেনাসদস্যদের পাঠান তখন তাদের সব ধরনের প্রস্তুতি ও রসদ দিয়েই পাঠান। যেকোনো অভিযানের
আগে সিনিয়র প্রধান সদস্যদের একটি ব্রিফিং দেন। এ আলোচনা-পর্যালোচনার ভিত্তিতেই মূলত
তারা অভিযানে যান এবং সুষ্ঠুভাবে অভিযান পরিচালনা করেন।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা দেশ তো বটেই, আন্তর্জাতিক পরিসরেও বিভিন্ন সময়ে অবদান
রেখেছেন এবং তাদের কার্যক্রমের জন্য ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছেন। বিশেষত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানেও
সেনাবাহিনী বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। সেনাবাহিনীর সহায়তা ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা দেশের ইতিহাসে
অম্লান হয়ে থাকবে। সেনাবাহিনীর সময়োপযোগী ভূমিকার কারণে বিপুল রক্তপাত এড়ানো সম্ভব
হয়েছে এবং বর্তমানে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রেও সেনাসদস্যদের ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়
ভূমিকা রয়েছে। যখন সেনাবাহিনীর সদস্যরা কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদী
সংগঠনের সঙ্গে লড়াই করেন তখন নানা ধরনের অঘটন সন্ত্রাসী বা বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ঘটাতে
পারে। কোনো সময় গুলিবিনিময়ে কেউ আহত এমনকি নিহতও হতে পারেন। যখন কোনো অভিযানে এমন ঝুঁকি
থাকে এবং এমন পরিস্থিতিতে আমাদের কিছু বলার থাকে না। কিন্তু যখন কোনো তরুণ সেনাসদস্য
কিছু গাফিলতির কারণে মৃত্যুবরণ করেন তখন নানা প্রশ্ন দেখা দেয়।
সমাজমাধ্যমসহ একাধিক স্থান থেকে বলা হচ্ছে, কক্সবাজারে যৌথ অভিযানের সময় সেনাবাহিনীর
কাছে পর্যাপ্ত গুলি-বারুদ ছিল না। সেনাবাহিনীর একটি ব্যাটালিয়ন যখন অভিযানে যায় তখন
স্বাভাবিকভাবেই সেনাসদস্যদের সঙ্গে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ থাকে। যেকোনো জরুরি মুহূর্তে
তাদের তা ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। সেনাবাহিনীকে অস্ত্র কিংবা রসদ ব্যবহারের প্রশিক্ষণ
দেওয়া হয় এবং যেকোনো অভিযানে এ রসদ তাদের সরবরাহ করা হয়। কিন্তু একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র
বলছেন, কক্সবাজারের অভিযানে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়নি।
সংবাদমাধ্যমের বরাতেও জানা গেছে, নিহত সেনা কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে অল্প কিছু গুলি নিয়ে
গিয়েছিলেন।
যতটুকু জানি, ডাকাতের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সময় বাড়িটির চারপাশ সেনাবাহিনী
ঘেরাও করে। যখন কোনো ঘটনাস্থল ঘেরাও করা হয় তখন উপস্থিত কমান্ডিং অফিসারও প্রস্তুত
থাকবেন। যদি সঠিকভাবে ঘেরাও করা হয়ে থাকে তাহলে ডাকাত সদস্যরা পালিয়ে গেল কীভাবে, সঙ্গত
কারণে এ প্রশ্নও দাঁড়ায়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, ডাকাতরা নির্জনকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে
যায়। পরে তাদের কক্সবাজারের বিভিন্ন জায়গা থেকে আটক করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছেÑযদি বাড়িটি
ঘেরাওই করা হয়ে থাকে, তাহলে ডাকাতরা কীভাবে পালিয়ে গেল? নানা মাধ্যম থেকে জানা যায়,
ঘটনাস্থলে কোনো গুলিবিনিময় হয়নি। অন্য কোনো সেনাসদস্য আহতও হননি। শুধু একজন সেনা কর্মকর্তা
নিহত হয়েছেন। একজন মা হিসেবে সেনাপ্রধানের কাছে আমার প্রশ্নÑএমনটি কীভাবে ঘটল?
কারও সামান্য গাফিলতির কারণে কি একটি তাজা প্রাণ ক্ষয়ে গেল? একজন মায়ের বুক খালি
হয়ে গেল? সন্তানকে ঘিরে মায়ের গর্ব থাকবেই, কিন্তু যে অপূর্ণতা সন্তান হারানো মায়ের
বুকজুড়ে, তা তো আমরা কোনো দিন পূরণ করতে পারব না। শুধু একজন মা নন, দেশও তার একজন বীর
সেনাসদস্যকে হারিয়েছে। আপনাদেরই প্রশিক্ষণ, কঠোর পর্যবেক্ষণের অধীনে কঠোর অধ্যবসায়ে
নির্জন নিজেকে এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। তার বিকশিত হওয়ার আরও সুযোগ ছিল এবং দেশকেও অনেক
কিছু দেওয়ার ছিল। এ তরুণকে কেন প্রাণ বিসর্জন দিতে হলো? কার বা কাদের গাফিলতি ছিল?
সংবাদমাধ্যমেই আমরা জেনেছি, যৌথ বাহিনী ঘটনাস্থলে অস্ত্র উদ্ধারের জন্য যাচ্ছিল। অর্থাৎ
পর্যাপ্ত লোকবল এবং রসদ সঙ্গে নিয়েই তারা অভিযানে গিয়েছিল। এ ধরনের অভিযানে প্রস্তুতিহীনভাবে
তো কেউ যেতে পারে না। তাদের সঙ্গে পর্যাপ্ত অস্ত্র থাকবে না, এমনটি বিশ্বাসযোগ্য নয়।
আমরা জানি, ওই অভিযানে যিনি কমান্ডিং অফিসার (সিও) ছিলেন তিনি সাবেক ডিবিপ্রধান
হারুনের নিকটাত্মীয়। নিকটাত্মীয় হলেই দোষী হবেন, সেটা সব সময় ঠিক নয়। কিন্তু ঘটনা যদি
মারাত্মক হয় এবং তার সঙ্গে সেই আত্মীয়ের জড়িত থাকার বিষয়ে সন্দেহ উপস্থিত হয়, তাহলে
প্রশ্ন এড়ানোর সুযোগ থাকে না। এ ক্ষেত্রে সিও হিসেবে তাকেও জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি
মনে করি। জানতে হবে, কমান্ডিং অফিসার হিসেবে তিনি কীভাবে অভিযান সাজিয়েছিলেন এবং কীভাবে
দায়িত্ব বণ্টন করেছিলেন। এ ছাড়া জিওসিরও ভূমিকা রয়েছে এখানে। আগেই বলেছি এবং যতদূর
জানি, ক্যান্টনমেন্ট থেকে সেনারা বের হওয়ার সময় অভিযান সম্পর্কে তাদের ব্রিফ করা হয়।
তিনি তাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্রিফ দিয়েছেন কি না তা-ও খতিয়ে দেখতে হবে। অর্থাৎ ওই অভিযানের
নেতৃত্ব এবং দায়িত্ব বণ্টন থেকে শুরু করে অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে যারা ছিলেন তাদের
জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
নিহত লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জনকে আমরা রাষ্ট্রীয়
মর্যাদায় সমাহিত করেছি। মৃত্যু তাকে কেড়ে নিয়েছে এবং তার পরিবারের শোক হারিয়ে যায়নি।
সেনাবাহিনী এ মর্মান্তিক মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কী হারিয়েছে তার মূল্যায়ন আমরা সাধারণরা
করতে পারি না। তবে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের মনে হয়েছে, রাষ্ট্র একজন মেধাবী,
সম্ভাবনাময় ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সেনা কর্মকর্তা হারিয়েছে। ঘটনাটি আমাদের জন্য একটি
সতর্কবার্তা। ভবিষ্যতের স্বার্থে এ ঘটনা বিশ্লেষণ করা দরকার। ভবিষ্যতে যেন কোনো অভিযানেই
এমন ঘটনা না ঘটে এর স্বার্থে এমনটি জরুরি।
আমরা জুলাই-আগস্টে অগণিত শিশু, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষকে মরতে দেখেছি। অগণিত বলতে হয় এ অর্থে, হিসাবটি
যখন ৭০০-৮০০ হয় এবং আহত ২৫ হাজারের সমান তখন এমন ঘটনাকে গণহত্যা বলা যেতে পারে। একটি
পরিবারের একজন সদস্যের মৃত্যুর ফলে পরিবারের সদস্যদের স্বপ্নেরও মৃত্যু ঘটেÑএ কথাও
আমাদের মনে রাখতে হবে। আন্দোলনের বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। যখন সুপ্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী
কোনো অভিযানে যায় তখন সদস্যদের প্রস্তুত করে পাঠানোই উচিত। সেনাপ্রধানের কাছে আমার
প্রশ্নÑ কেন তা করা হলো না? নির্জন যখন একাই ডাকাতদলের পেছনে ছুটে গিয়েছিলেন তখন অন্য
সদস্যরা কেন তার সঙ্গে যুক্ত হননি?
দেশের নাগরিক এবং একজন মা হিসেবে আপনাদের কাছে জবাবদিহি পাওয়ার অধিকার আমাদের রয়েছে।
আমরা জানতে চাই, কেন তাকে সম্পূর্ণ অরক্ষিতভাবে অভিযানে পাঠানো হলো? অরক্ষিতই বলতে
হবে, কারণ সেখানে অল্প কজন সেনাসদস্য গিয়েছিলেন এবং তাদের সঙ্গে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ
ছিল না। এ বক্তব্য কিন্তু সব সেনাসদস্যের প্রতি নয়, বরং যারা অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন
তাদের জবাবদিহির অপেক্ষায় থাকবেন অনেকে। তাদের প্রতি অনেকের যে ক্ষোভ কিংবা উষ্মা জন্ম
নিয়েছে তা-ও সহজে দূর হওয়ার নয়। তাই আপনারা ভাবুন এবং সদুত্তর দিন। এটিই প্রত্যাশা।
মনে রাখতে হবে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন মূলত নানা ক্ষোভে বিস্ফোরিত হয়েছে। এর পরিণতি কেমন হয়েছে তা সবার জানা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ইতিবাচক ভূমিকার জন্য সেনাবাহিনী বারবার প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু আমরা প্রত্যাশা করি, সবখানেই স্বচ্ছতা-জবাবদিহি থাকা জরুরি। মাননীয় সেনাপ্রধান এ অনভিপ্রেত ঘটনার সুষ্ঠু জবাবদিহি নিশ্চিত করবেন এবং ভবিষ্যতে এমন অনভিপ্রেত ঘটনা এড়াতে ভূমিকা রাখবেনÑ এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা।
আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী