পর্যবেক্ষণ
এম হুমায়ূন কবির
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৬:১৬ পিএম
২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে (ইউএনজিএ) ৭৯তম অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি তার ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও এর মাধ্যমে বাংলাদেশের যুগান্তকারী পরিবর্তনের কথা তুলে ধরেছেন। ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে ‘নতুনভাবে’ সম্পৃক্ত হতে তিনি বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি পরিষ্কারভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরতে গিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথাই বলেছেন। কিন্তু এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের মৌলিক অধিকার সমুন্নত ও সুরক্ষিত রাখতে দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। নতুন সরকার যা যা করছে তা-ও তিনি তুলে ধরেছেন। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অবদান রাখার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেছেন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। বহুমুখী সংকটে জর্জরিত বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ এবং সংঘাতের ফলে ব্যাপক ভিত্তিতে মানুষের অধিকার খর্ব হচ্ছে বলে উল্লেখ করে তিনি যুদ্ধের অবসান ঘটানোর আহ্বানও জানিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবর্তন নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পর্যাপ্ত সহায়তার আহ্বান জানান। পাচার হওয়া সম্পদ ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও তিনি কামনা করেছেন। বৈশ্বিক ব্যবসা ও জ্ঞানের অধিকারী-গোষ্ঠী মানুষের চাহিদাগুলোকে যথাযথভাবে অনুধাবন করে নতুন ধরনের সহযোগিতা কাঠামো দরকার বলেও ড. মুহাম্মদ ইউনূস উল্লেখ করেছেন। কথা বলেছেন জনস্বাস্থ্যে ব্যাপক বিনিয়োগের গুরুত্ব এবং জাতিসংঘের সঙ্গে আমাদের ৫০ বছরের পথচলা নিয়েও।
৭৯তম অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ। দুটি দিক থেকে এ অধিবেশনটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত. ড. মুহাম্মদ ইউনূস বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। মাত্র চার দিনের এ সফরে সেখানে তার কর্মচঞ্চল উপস্থিতি দেখা গেছে। বাংলাদেশকে সব দিক থেকেই তিনি নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। এভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অনেকাংশে উজ্জ্বল হয়েছে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। বিশেষত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে তার বৈঠকটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিশ্ববরেণ্য একজন্য ব্যক্তি হওয়ার বদৌলতে আমাদের পক্ষে এমন একটি কূটনৈতিক অর্জন সম্ভব হয়েছে। ইউনূস-বাইডেন বৈঠক অনেকটাই অনিশ্চিত ছিল। কারণ সাধারণত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট আসেন স্বল্পসময়ের জন্য। এ সময় তার সঙ্গে যেকোনো দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা খুব থাকে কম। কিন্তু এবারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বৈঠক হয়েছে; যা আমাদের জন্য বড় একটি সম্মান বলেই মনে করি।
জো বাইডেন প্রধান উপদেষ্টাকে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারমূলক কার্যক্রমের তিনি প্রশংসা করেছেন ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে জো বাইডেন দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি ভবিষ্যতে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করার বিষয়টিতে জোর দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। এ মুহূর্তে দুই দেশের সম্পর্ক শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বলেও জো বাইডেন দ্বিপক্ষীয় এ সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ একদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে তাদের প্রত্যাশার বিষয়েও ইঙ্গিত দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের তরফে এ সমর্থন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি বড় প্রাপ্তি।
ড. ইউনূস জাতিসংঘে আরও অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও সাক্ষাৎ করেছেন। তার সঙ্গে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা, মরিশাসের প্রেসিডেন্ট পৃথ্বীরাজ সিংহ রূপণ, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলিসহ বেশ কয়েকজন সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানের সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও সাক্ষাৎ হয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশের রূপরেখার একটি বিবরণ সম্ভবত তিনি এ সফরে দিতে সক্ষম হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তাদের তরফেও সহযোগিতার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে বলে ধারণা করা যেতে পারে। তা ছাড়া জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস অ্যাসোসিয়েশনের প্রধানের সঙ্গে তিনি বৈঠক করেছেন। দেশে মানবাধিকার সংরক্ষণ এবং অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এমনটি ব্যাপক কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলেই বিশ্বাস করি। তিনি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রধানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি আইএমএফের ম্যানেজিং ডিরেক্টরের সঙ্গেও তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। সেখানে তিনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের ব্যাপারে বিশদ আলোচনা করেন এবং আইএমএফ থেকে ঋণ প্রাপ্তির বিষয়টি ত্বরান্বিত করার বিষয়ে কাজ করেছেন। অর্থাৎ আইএমএফের কারিগরি সহায়তা পাওয়ার একটি সুযোগ আমরা ঠিকই পাচ্ছি।
এবার আসা যাক সংস্কারের আলোচনায়। ইউএনডিপি বাংলাদেশের কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ভূমিকা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সংস্কারের জন্য বড় সহযোগিতা হিসেবে আসবে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এ ছাড়া জাতিসংঘে রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটি আলোচনা সভা হয়েছে। সেখানে ড. ইউনূস উপস্থিত ছিলেন এবং এ সমস্যা সমাধানে তিনি একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে বিষয়টি যে গুরুত্ব পাবে তা অনেকটাই নিশ্চিত। এ সমস্যা বাদেও যে পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এ সরকার ক্ষমতায় এসেছে তা যদি বিবেচনা করা হয় তাহলে দেখা যায়, নানাবিধ সংস্কারের মাধ্যমে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দিকে আমরা এগিয়ে যেতে পারব। আমরা যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দিকে এগোতে চাই সে বিষয়টিই তিনি সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরছেন। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যে সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছে তা-ও তিনি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন। তা ছাড়া জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশের অবদানের বিষয়টিও ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তার বক্তব্যটি এ ক্ষেত্রে আমাদের সার্বিক অবস্থার একটি পরিপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে করি।
ড. ইউনূস বরাবরই নতুন বাংলাদেশের কথা বলছেন। এ নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা ও স্বপ্ন কেমন তা এখন উপস্থাপনের সময়। এ রূপরেখার সঠিক চেহারা কী হতে পারে এ বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। জুলাই-আগস্টে দেশের তরুণরা স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা নির্মূলে বড় অবদান রেখেছে। আর তাদের এ অবদানের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে উপলব্ধি করতে হবে। ড. ইউনূস নিজেও এ বিষয়ে বরাবরই স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন এবং আশা করা যায় সামনেও এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাবেন। এ তরুণ প্রজন্ম নিয়ে আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় অন্তর্বর্তী সরকার দেখিয়েছে তার একটি রূপরেখা তিনি সহযোগী রাষ্ট্রগুলোকে হয়তো বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন। সব মিলিয়ে এবারের জাতিসংঘ অবিবেশন আমাদের ইতিহাসে একটি অভিনব ঘটনা অবশ্যই।
জাতিসংঘ অধিবেশনে ড. ইউনূস তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির ব্যবহার করে আলোচনা চালিয়েছেন। এর ইতিবাচক প্রভাব অবশ্যই আমাদের ওপর পড়বে। শুধু তাই নয়, এর মাধ্যমে আমরা অনেক রাষ্ট্রের সঙ্গেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারব। জাতিসংঘে ড. ইউনূসের বক্তৃতাদানের বিষয়টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। এ দিনটিতেই ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছিলেন। এদিনই বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদের স্বীকৃতি গ্রহণ করেছে। চুয়াত্তর সালের ওই দিনটি বিশ্বসম্প্রদায়ের সম্মানিত সদস্য হিসেবে আমাদের প্রতিষ্ঠিত করে। ওই প্রজন্মের মানুষ হিসেবে এ ঘটনা এখনও আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল। জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রাপ্তির সংবাদে তখন মনে হয়েছিল, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘের একটি সম্মানিত সদস্য হিসেবে অবশেষে আমাদের অন্তর্ভুক্তি হলো। এমন ঘটনা ছিল আমাদের জন্য ‘হায়েস্ট পয়েন্ট অব ডিপ্লোম্যাসি’। তার ঠিক ৫০ বছর পরই আমরা আবার বিশ্বদরবারে একই রকম ‘হায়েস্ট পয়েন্ট অব ডিপ্লোম্যাসি’ পরিচালনা করলাম। ইতিহাসের এ দুটি ঘটনাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের দুটি অসাধারণ ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্মানজনক অবস্থানে রাখার জন্য এ দুজন মানুষ যে অবদান রাখলেন তা বাংলাদেশের ইতিহাসে লেখা থাকবে। আমি মনে করি, তারা দুজন ব্যক্তি হিসেবে আমাদের জন্য যে পথ দেখিয়েছেন, তার পাশাপাশি যা আমাদের জন্য প্রয়োজনÑবর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পেশাগত দক্ষতার মাধ্যমে এবং জাতিগতভাবে অভ্যন্তরীণ সংহতি তৈরি করে বাংলাদেশকে আমরা সেই সম্মানজনক অবস্থানে ধরে রাখতে পারলে তবেই আমরা এ দুজন সম্মানিত মানুষের যে অবদান এবং তারা আমাদের জন্য যে পথ দেখিয়েছেন সে পথে আমরা সার্থকভাবে হাঁটতে পারব।
১৯৭৪ সালে গর্বের সঙ্গে বলতে পেরেছিলাম, আমি বিশ্বসম্প্রদায়ের একজন গর্বিত সদস্য। ৫০ বছর পর ২০২৪-এর সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে ড. ইউনূসের ভাষণের মধ্য দিয়ে আবার বলার সুযোগ পেয়েছি, বিশ্বসম্প্রদায়ের একজন গর্বিত সদস্য আমরা। গত কয়েক দিনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে আমরা জাতিসংঘে যে কর্মচাঞ্চল্য দেখতে পেয়েছি তা একদম নতুনভাবে বাংলাদেশকে বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে আবার পরিচিত করে তুলতে সহযোগিতা করেছে। তাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে যা হয়েছে তাতে বাংলাদেশ নিয়ে একটি ইতিবাচক বার্তাও পেয়েছে বিশ্ব। এখন বাংলাদেশ যে প্রক্রিয়ায় এগোতে চাইছে তা নিয়ে বিশ্ব বুঝতে চেষ্টা করবে। আবার বাংলাদেশও এটি জেনেছে যে, সংস্কার কার্যক্রমের সঙ্গে রয়েছে বৈশ্বিক সমর্থন। আমাদের জন্য বার্তাটি পরিষ্কার যে, নতুন প্রেক্ষাপটে বিশ্বসম্প্রদায় বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। এখন তারা যাতে সহযোগিতা করতে পারে সেই ক্ষেত্রটি আমাদের প্রস্তুত করতে হবে।