রাষ্ট্রব্যবস্থা
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৪:০৪ পিএম
দেশে এখন বিরাষ্ট্রীয়করণের প্লাবন চলবে। কলকারখানা, ব্যাংক, টেলিগ্রাফ, ডাক বিভাগ, শিক্ষা, চিকিৎসা, রেলওয়ে- সবকিছুই ব্যক্তিমালিকানায় চলে যাবে বলেই ধারণা করা যাচ্ছে। সিভিল সোসাইটির এতে সন্তুষ্ট হওয়ার কথা, কেননা এসবই হচ্ছে উদারনীতির অগ্রযাত্রার শুভ লক্ষণ। তা বটে; উদারনীতি ব্যক্তিমালিকানা পছন্দ করে বৈকি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতে সাধারণ মানুষের কোন উপকারটা হবে শুনি? ব্যক্তিমালিকানার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মালিকানার মূল পার্থক্যটা তো ওইখানে যে, প্রথমটি বিশ্বাস করে মুনাফার, আর দ্বিতীয়টির ঘোষিত উদ্দেশ্য হলো উন্নয়ন, যদিও সে উন্নয়ন ধনীদের কাছেই চলে যায়। প্রাইভেটাইজেশন চলবে মুনাফার জন্য, মুনাফা মানে একদিকে মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে শুভঙ্করের ফাঁকি। দুদিক দিয়েই মালিকের লাভ, জনগণের সর্বনাশ। সেটাই ঘটছে এবং আরও ঘটবে।
উদারনীতির ট্র্যাজেডিটা এইখানে যে, উদারনীতিকরা মনে করে আপস ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটে তা ঠিক উল্টো। তাদের কাজের ফলে রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক চরিত্রটা আরও শক্তিশালী হয়। উদারনীতিকরা জনরোষকে প্রকাশের জন্য পথ করে দিচ্ছে ভেবে সন্তুষ্ট থাকে, কিন্তু তাতে জনতার যে কোনো উপকার হয় না, উপকার হয় রাষ্ট্রের শাসকদেরইÑ সেই সত্যটাকে তারা বিবেচনার মধ্যেই আনে না। আনার কথাও নয়। তারা হয়তো জানে না যে তারা রাষ্ট্রেরই মিত্র, জনগণের নয়। তাই যাকে ট্র্যাজেডি বলছি সেটাকে তারা মোটেই ট্র্যাজেডি মনে করে না, কেননা তারা তো তাদের মিত্রের পক্ষ হয়েই কাজ করছে। গণতন্ত্র উদারনৈতিক হলেও হতে পারে, কিন্তু উদারনীতির সমর্থকরা গণতন্ত্রের পক্ষে কাজ করেন না, তারা যেটাকে সহ্য ও সাহায্য করেন সেটা হলো রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা।
সিভিল সোসাইটি সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের কথা বলে। রাষ্ট্রও কিন্তু তাদেরকেই চায়। রাষ্ট্রের কামনাটা হলো এই রকমের : যারা নির্বাচিত হয়ে আসবেন তারা রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী ব্যবস্থাপনার প্রতি সৎ থাকুক, যোগ্যতার সঙ্গে রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক চরিত্রটাকে অক্ষুণ্ন রাখার ব্যাপারে কাজ করে যাক। সিভিল সোসাইটি প্রদত্ত সততা ও দক্ষতার প্রকাশ্য সংজ্ঞা ও রাষ্ট্র প্রদত্ত অপ্রকাশ্য সংজ্ঞার ভেতর পার্থক্য অবশ্যই রয়েছে; কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে সৎ (অর্থাৎ দুর্নীতিপরায়ণ নয়) এবং যোগ্য (অর্থাৎ সুশিক্ষিত, কর্মকুশল ইত্যাদি) মানুষ যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছাকাছি যায় তখন তারা যদি ব্যক্তিগত সততা রক্ষা করতে চায় তাহলে হয় বিপদে পড়বে নয়তো অযোগ্য বলে চিহ্নিত হবে। তাই দেখা যায়, ক্ষমতা পেলে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিরা তাদের ‘চরিত্র’ হারান এবং আর পাঁচজনে যা করেন তাই করতে থাকেন। বরঞ্চ বেশি মাত্রাতেই করেন এবং রাষ্ট্রীয় মানদণ্ডে বিশেষ রকমের যোগ্য বিবেচিত হওয়ার দরুন শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি করতে থাকেন। উন্নতির পথ যে রাষ্ট্রীয় অগণতান্ত্রিকতার সঙ্গে সহযোগিতার দ্বারা প্রশস্ত হয় তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ওই পথে এগিয়ে আসার জন্য তারা অন্যদের নীরবে আহ্বান জানাতে থাকেন।
ব্যাপারটা আমলাতন্ত্রের ক্ষেত্রেই অধিক পরিমাণে ঘটে। রাষ্ট্র চায় সমাজের চৌকস যেসব ছেলেমেয়ে তারা সরকারি চাকরিতে আসুক, আমলা হোক, আমলা হয়ে ‘সততা’ ও ‘যোগ্যতার’ সঙ্গে রাষ্ট্রের সেবা করতে থাকুক। আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা দেখিয়ে রাষ্ট্র ওদের নিজের বলয়ের ভেতর টেনে নেয়। তাতে দুদিক থেকে মুনাফা পাওয়া যায়। এক. দক্ষ সেবক পাওয়া যায়। দুই. বিক্ষোভের সম্ভাবনা হ্রাস পায়। শিক্ষিত বেকারদের বিক্ষোভ সর্বদাই বিপজ্জনক, আর সেই বিক্ষুব্ধরা যদি চটপটে, বুদ্ধিমান ও মেধাবী হন তাহলে বিপদ আরও বাড়ে। তাই দেখা যায়, ছাত্রজীবনে যে তরুণ বামপন্থি অর্থাৎ রাষ্ট্রবিরোধী ছিল, চাকরি পেয়ে সে-ব্যক্তিই রাষ্ট্রের ঘোরতর অনুরাগী হয়ে পড়েছে।
প্রশ্ন থাকে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র আসবে কি? এই প্রশ্নের জবাব শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে এদেশের সত্যিকারের অর্থে একটি সামাজিক বিপ্লব হবে কি হবে না তার মীমাংসার ওপর। নির্বাচন হবে কি কিংবা কবে হবে? এই প্রশ্নটি কখনও কখনও সামনে চলে আসে। নির্বাচন হলেও সেটি কোন ধরনের হবে তা নিয়েও সংগত কারণেই সংশয় দেখা দিয়েছে। ধরে নিলাম নির্বাচন অগ্রহণযোগ্য হবে না। কিন্তু তার দ্বারা কি নিশ্চিত হওয়া যাবে যে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে? মোটেই না। কেননা নির্বাচন আর যাই করুক রাষ্ট্রের চরিত্রে কোনো মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে না। নির্বাচনের দায়িত্বই হচ্ছে রাষ্ট্রের ‘চরিত্র’ রক্ষা করা।
রাষ্ট্রীয় চরিত্রে পরিবর্তন আনতে হলে যা দরকার হবে সেটি হলো একটি যথার্থ সামাজিক বিপ্লব, যেটি শত শত পরিবর্তন ও নানাবিধ বিপ্লব সত্ত্বেও এদেশে এখনও ঘটেনি। আমরা একটি পুরোনো সমাজব্যবস্থায় বসবাস করছি, যেটি শ্রেণিবিভক্ত এবং শোষণভিত্তিক। রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে সমাজের ওপর ভর করেই। সমাজে বিত্তবানদের শাসন ও শোষণ সুপ্রতিষ্ঠিত, রাষ্ট্র সেই ব্যাপারটাকেই রক্ষা করে চলেছে। সমাজ যদি না বদলায় তাহলে রাষ্ট্র বদলাবে না; সেটাই কারণ যেজন্য রাষ্ট্র ভেঙেছে ঠিকই, ব্রিটিশের বড় রাষ্ট্র ভেঙে পাকিস্তানের ছোট রাষ্ট্র এবং তার পরে বাংলাদেশের জন্য আরও ছোট একটি রাষ্ট্র আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি, কিন্তু দেশে গণতন্ত্র আসেনি। রাষ্ট্র আগের মতোই স্বৈরতান্ত্রিক রয়ে গেছে। বারংবার ক্ষমতার হাত বদলেও গণতন্ত্র আসেনি। আসবে বলে মনে করার কারণও নেই।
নতুন রাষ্ট্রের ভিত্তিভূমিতে থাকার কথা ছিল ধর্মনিরপেক্ষতার পরিষ্কার অঙ্গীকার। সংবিধানে সেটা রাখাও হয়েছিল। এখন নেই। নেই তো বটেই, বরঞ্চ ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করার নীতিতে বিশ্বাসীদের রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার পর্যন্ত হওয়ার তালে আছে। এটা সম্ভব হলো কি করে? সম্ভব হলো এই জন্য যে, সমাজ থেকে ধর্মীয় রাজনীতির লালনভূমিকে উৎপাটিত করা সম্ভব হয়নি। ধর্মব্যবসায়ীরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত, তারা লোকের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগায় এবং দেশের শাসকশ্রেণির সঙ্গে অনায়াসে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়। ধর্মকে ব্যবহার না করলে ভোট পাওয়া যাবে না এই আশঙ্কা থেকে বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোও ধর্মের কথা বলে। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো বিদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে টাকাপয়সা পায়। পুঁজিবাদী বিশ্বও এদের সমর্থন করে, সমাজতন্ত্রকে এরা পয়লা নম্বরের দুশমন বলে মনে করে। তাই দেখি রাষ্ট্রীয় এবং ব্যক্তিগত উভয় উদ্যোগেই মাদ্রাসা শিক্ষা, প্রবলভাবে বিকশিত হয়েছে এবং হচ্ছে। উদ্যোগটা রাষ্ট্র নেয় এই বিবেচনায় যে, এই শিক্ষা আর যাই তৈরি করুক গণতন্ত্রকামী মানুষ সৃষ্টি করবে না; আর ব্যক্তিগত আগ্রহের ভেতর থেকে ইহকালে সুনাম এবং পরকালে পুণ্য অর্জনের লোভ। ইসলামি শরীয়া অনুগামী ব্যাংক প্রথাও মৌলবাদের বিকাশকে সাহায্য করছে; সুদের হারাম খেতে হচ্ছে না অথচ সুদ ঠিকই হাতে এসে যাচ্ছে।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে তাই সামাজিক বিপ্লব সম্ভব করে তোলার দায়িত্বটাই কাঁধে তুলে নিতে হবে। কাজটি অবশ্যই সহজ নয়, কিন্তু এটি না করে উপায় নেই। এ কাজ তারাই করবেন, যারা প্রকৃত গণতন্ত্রে যথার্থ বিশ্বাসী। পরিবর্তনটা, বলাই বাহুল্য, নির্বাচনের পথে ঘটবে না। তবে নির্বাচন এই পরিবর্তনে সাহায্য করতে পারে। পথটা হচ্ছে আন্দোলনের। আর সেই আন্দোলনকে হতে হবে সর্বাত্মক; একাধারে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক। আন্দোলনের তৎপরতা প্রকাশ্যে ও সংগঠিত আকারে থাকবে, রইবে এমনকি ব্যক্তিগত পর্যায়েও। যে যেখানে আছেন সেখানেই কাজটা করতে পারবেন, অন্যদেরকে সচেতন করে এবং সংগঠিত হয়ে। অগণতান্ত্রিকতার দৌরাত্ম্য চলেছে, কিন্তু তাই বলে গণতন্ত্রের পথের মানুষরাও যে সংখ্যায় নগণ্য তা নয়, তারাই বরঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু তারা অসচেতন এবং পরস্পরবিচ্ছিন্ন। মূল লড়াইটা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে।
গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সমাজ-পরিবর্তনের আন্দোলনের ভবিষ্যতের ওপরই। ওই আন্দোলন যতটা এগোবে আমরা ততটাই গণতন্ত্রের অভিমুখে এগোতে পারব। না-পারলে হতাশ হব। অতীতে যেমন হয়েছে ভবিষতেও ফল তেমনই হবে , যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। রাষ্ট্রে জনগণের মালিকানা নিশ্চিত হতে হবে। গণতন্ত্রের মাঠ যে রাজনীতির মধ্য দিয়ে উর্বর হবে সেই রাজনীতির অনুশীলন হতে হবে নির্মোহভাবে। রাষ্ট্রের চরিত্রে পরিবর্তন আনতে হবে এবং কাজটা সহজ নয় তাও মনে রাখতে হবে। এজন্য চাই দৃঢ় প্রত্যয়, নির্মোহ অঙ্গীকার। শুধু কথা বলে দায় শেষ করলে চলবে না।