× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রতিযোগিতা কমিশন ব্যর্থ কেন

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১২:১০ পিএম

প্রতিযোগিতা কমিশন ব্যর্থ কেন

ভারসাম্যহীন ও অস্থিতিশীল বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন প্রণয়ন করে এবং একজন চেয়ারম্যান ও চারজন সদস্যের সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে। এ আইনের ৮ ধারায় সুস্পষ্ট বলা হয়েছে-কমিশন একই সঙ্গে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের ক্ষমতা প্রয়োগ করার এখতিয়ার রাখে। কিন্তু সে ক্ষমতা কতখানি প্রয়োগ হচ্ছে এ প্রশ্নটি পুনর্বার সামনে এসেছে ২৭ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে। ‘কী করছে প্রতিযোগিতা কমিশন’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের গর্ভে যা উঠে এসেছে তাতে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয়, এটি সাইনবোর্ডসর্বস্ব একটি প্রতিষ্ঠান, যার বিধিবদ্ধ ক্ষমতা আছে বটে কিন্তু কার্যক্ষেত্রে কার্যকারিতা প্রায় নিষ্ফল বলা চলে। প্রশ্ন দাঁড়ায়-জবাবদিহি ছাড়াই বাজারে যেভাবে নিত্যপণ্যের দাম ক্রমাগত বেড়ে চলেছে এর নিয়ন্ত্রণে সাইনবোর্ডসর্বস্ব এ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বই বা কতটা। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ছয় বছরে প্রতিযোগিতা কমিশন ২০২টি মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি করেছে মাত্র ৫২টি এবং ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছে ১২ কোটি টাকা।

যখন এ আইন প্রণয়ন এবং প্রতিষ্ঠানটি গঠিত হয় তখন বলা হয়েছিল, দেশে প্রতিযোগিতা আইন বা কমিশন না থাকায় বিভিন্ন সময়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি কোনো হাতিয়ার নেই। এ প্রেক্ষাপটেই গঠিত হয়েছিল ‘বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন’, যে প্রতিষ্ঠানটির আধাবিচারিক ক্ষমতা রয়েছে। কমিশন কার্যকর করতে হলে মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা দরকার। দরকার দক্ষ জনবলও। দীর্ঘদিন ধরে টানা মূল্যস্ফীতির অভিঘাতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। নিম্ন আয়ের মানুষের অবস্থা আরও বেশি নাজুক। আমরা জানি, বাজার নিয়ন্ত্রণে এবং তদারকির দায়িত্বে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু কোনো কর্তৃপক্ষই বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি করে মুনাফা লোটার পথ বন্ধ করতে পারেনি। ভোক্তা অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে বাজারে অভিযান পরিচালনা করলেও তা যেন গুরুতর ব্যধিতে ‘টোটকা দাওয়াই’-এর মতো। কার্যত ভোক্তা অধিদপ্তর কিংবা প্রতিযোগিতা কমিশন কেউই তাদের এখতিয়ারবলে যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে না। একই সঙ্গে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের দায়িত্ব পালন করছে না।

বাজারে যখন অস্থিতিশীলতায় সাধারণ মানুষের অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি তখনও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমাগত ব্যর্থতার দায় নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই খুব স্বাভাবিক। আমরা দেখছি, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই হুটহাট করে বেড়ে যাচ্ছে নিত্যপণ্যের দাম এবং এর অসহনীয় ভার বইতে হচ্ছে ভোক্তাকে। আমরা জানি, প্রতিযোগিতা আইনের ১৫ ধারায় বলা আছে-‘কোনো ব্যক্তি কোনো পণ্য বা সেবার উৎপাদন, সরবরাহ, বিতরণ, গুদামজাতকরণ বা অধিগ্রহণসংক্রান্ত এমন কোনো চুক্তিতে বা ষড়যন্ত্রমূলক যোগসাজশে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আবদ্ধ হইতে পারিবে না, যাহা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে বা বিস্তারের কারণ ঘটায় কিংবা বাজারের মনোপলি অবস্থার সৃষ্টি করে।’ অথচ বর্তমান বাজারব্যবস্থায় মনোপলি ব্যবসা দৃশ্যমান সত্ত্বেও কমিশন কেন নীরব ভূমিকা পালন করছে, এ প্রশ্নও দাঁড়ায়। বাজার নিয়ন্ত্রণে তাদের কোনো ভূমিকাই চোখে পড়ছে না। আমরা মনে করি, দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে প্রায় সব ক্ষেত্রে যখন সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা হচ্ছে, তখন এর আওতায় বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনকেও আনা প্রয়োজন।

অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজির পরিপ্রেক্ষিতে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ইত্যাদির বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। প্রতিযোগিতা আইনে যদিও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট ধারা নেই, কিন্তু তা পর্যালোচনা করার ক্ষমতা প্রতিযোগিতা কমিশন রাখে। উপরন্তু আইনে প্রতিযোগিতা কমিশনকে অভ্যন্তরীণ আদেশ জারির ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। কোনো অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে এ কমিশনের অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ রাখার ক্ষমতা রয়েছে। এত কিছুর পরও এ কমিশন কেন কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারছে না তা খতিয়ে দেখে প্রতিবিধান নিশ্চিত করা জরুরি বলে আমরা মনে করি।

প্রতিযোগিতা কমিশন বা বাজার প্রতিযোগিতা কমিশন শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বের আরও ১৫০টি দেশে রয়েছে। এক জরিপে জানা গেছে, অস্ট্রেলিয়ায় এ কমিশন পুরোপুরি কাজ করতে পারার কারণে দেশের জিডিপিতে ২ থেকে ৩ শতাংশ ভূমিকা রাখছে। আমরা এও জানি, বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রক সংস্থা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাজার গবেষণা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। অথচ আমাদের প্রতিযোগিতা কমিশনের ভূমিকা অন্তঃসারশূন্য। আরও বিস্ময়কর, জাতীয় সমস্যার প্রেক্ষাপটে গঠিত কমিশনটির কার্যক্রম শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক। ঢাকার বাইরে এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালানোর মতো অফিস এবং জনবল নেই। গবেষণার গবেষক নেই প্রয়োজনের নিরিখে। আরও বিস্ময়কর, বাজার তদারকি এবং ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দৃশ্যমান কোনো আলোচনা-পর্যালোচনা কার্যক্রমও নেই প্রতিষ্ঠানটির।

আমরা মনে করি, যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এ প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল তা কেন কাজে আসেনি, এর উৎসে দৃষ্টি দেওয়া দরকার। প্রতিযোগিতা আইন যুগপোযোগী করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের পরিসর বাড়ানোও জরুরি। সাইনবোর্ডসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান দিয়ে জনস্বার্থের সুরক্ষা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বাজারের মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রটিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার জন্য নিঃসন্দেহে যথেষ্ট জনবলের পাশাপাশি আনুষঙ্গিক আরও অনেক কিছুর প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় সবকিছুর ঘাটতি রেখে জনস্বার্থ সুরক্ষার লক্ষ্যে শুধু একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান জিইয়ে রেখে লাভ কী, তা-ও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। আমরা মনে করি, বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল প্রতিটি কর্তৃপক্ষকে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে এবং প্রতিযোগিতা কমিশন এর বাইরে নয়। আমরা অতীতে দেখেছি, সমস্যা-সংকটের নিরিখে সমাধানের আয়োজন যতটা হয়, এর কার্যকারিতা কিয়দংশও দৃশ্যমান হয় না। এরই সুযোগ নিচ্ছে অসাধু মহল। আমাদের দেশে আইন আছে, কমিশন আছে, নানানরকম ব্যবস্থা আছে; তার পরও কাঙ্ক্ষিত প্রতিবিধান নিশ্চিত হয় না!

অভ্যন্তরীণ বাজার পরিস্থিতি কী কারণে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে, কীভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়ে ভোক্তার পকেট কেটে নিজের উদর পূর্তি করছেন তা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কোনো মহলেরই অজানা নয়। আমরা মনে করি, বিলম্বে হলেও প্রতিযোগিতা কমিশনকে সংস্কার করে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য দমনে প্রতিযোগিতা আইন ও কমিশনের সর্বব্যাপী কার্যক্রম দৃশ্যমান করতে পারলে বাজারে যেমন জবাবদিহি নিশ্চিত হবে, তেমন বন্ধ হবে অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা