× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শিক্ষাব্যবস্থা

আমূল সংস্কারের বিকল্প নেই

ড. মাহরুফ চৌধুরী

প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:২৪ এএম

আমূল সংস্কারের বিকল্প নেই

রাষ্ট্রব্যবস্থা ও তার কাঠামো সংস্কারের জন্য পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি যে বিষয়টি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বাগ্রে ভাবার কথা তা হলো শিক্ষা। মৌলিক মানবিক চাহিদাগুলোর সারিতে চতুর্থ অবস্থানে থাকলেও রাষ্ট্রব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে শিক্ষার প্রাধান্য অনস্বীকার্য। বলা হয়, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। তাই শিক্ষাকে শক্ত ভিতের ওপর গড়ে তোলা না গেলে একটি রাষ্ট্রের নাগরিকরা বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয় না। অন্যদিকে, সুদীর্ঘ স্বৈরশাসন ও ধারাবাহিক সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে গভীর ক্ষতের নানা উপসর্গ। সেসব আমাদের অনেকেরই অজানা নয়। তাই বলতেই হয়, ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা?’ দীর্ঘদিন ধরে আমরা সেসব ক্ষত বয়ে চলেছি নানা কায়দায় ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছায়। প্রকৃতপক্ষে একদিকে শাসকের স্বেচ্ছাচারিতার সুবিধাবাদ, অন্যদিকে শোষিতের ঐক্যের অভাব ও সংঘবদ্ধভাবে প্রতিরোধের অক্ষমতা এসব অনাচারের জন্য দায়ী। সাম্প্রতিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খোলস থেকে সেসব ক্ষত বেরিয়ে পড়েছে নানাভাবে ব্যাপক মাত্রায়।

স্বৈরশাসনের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে স্বৈরাচারের দোসর ও শিক্ষা ক্ষেত্রে নানা বৈষম্যের রূপকার অনেক রথী-মহারথী আত্মগোপন করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো একটি দুটি নয়, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ শিক্ষা প্রশাসনের বেশকিছু ঊর্ধ্বতন পদাধিকারী পদত্যাগ করেছেন। কারণ একদিকে স্বৈরাচারী শাসনযন্ত্রের হাতে বিশেষ আনুকূল্যে তাদের নিয়োগ এবং অন্যদিকে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অনিয়ম আর অনাচার তাদের নৈতিক অধিকারহীন করেছে বলে সেসব পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন কিংবা ভয়ে ছেড়ে দিয়েছেন। এমনকি সেসব অপকর্মের কুশীলবদের অনেকেই আবার আত্মরক্ষার জন্য অপমান অপদস্থ হওয়া কিংবা জেলহাজতে যাওয়া থেকে আত্মগোপন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত অনেকেই পদত্যাগ করেছেন, আবার অনেকে হয়েছেন নিরুদ্দেশ। শিক্ষা প্রশাসনে দেখা দিয়েছে শূন্যতা। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুততার সঙ্গে শূন্যপদগুলো পূরণের চেষ্টা করে যাচ্ছে, তবু বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারেনি। এ অবস্থায় দেশের প্রয়োজনে এখন সর্বস্তরের সাধারণ শিক্ষাসেবকদেরই এগিয়ে আসতে হবে আর নানা পন্থায় ব্যথা উপশম করে শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষতগুলো সারিয়ে তুলতে হবে।

৩ সেপ্টেম্বর শিক্ষাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীসহ শিক্ষা নিয়ে কাজ করা পেশাজীবীদের নিয়ে ‘শিক্ষা সংস্কার ভাবনা : কেমন শিক্ষাব্যবস্থা চাই’ শিরোনামে এক মুক্ত আলোচনার আয়োজন করে বাংলাদেশ এডুকেশন ফোরাম। আমন্ত্রিত আলোচকদের একজন হিসেবে তাতে অংশ নিয়েছিলাম। এরই প্রেক্ষাপটে আজকের এ লেখার অবতারণা। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শত সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতার মাঝেও আমরা খুবই আশাবাদী যে, অনেক প্রাণের আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমাদের দ্বারপ্রান্তে এমন একটা সুযোগ এসেছে আলোর পথে ভালোর দিকে যাওয়ার এবং এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। শিক্ষা সংস্কারের জন্য যদি আমরা এখনই সবাই মিলে যার যার জায়গা থেকে কাজ না করি, কিংবা কাজ করতে একত্র হতে চেষ্টা না করি, তবে তার জন্য নতুন প্রজন্মের নতুন শিশুর কাছে সুকান্ত ভট্টাচার্যের যে অঙ্গীকার ছিল, তা পূর্ণ করা হবে না। তিনি ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, চলে যাবÑতবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে/প্রাণ প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,/এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য/ক’রে যাব আমিÑনবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।

আমরা যারা ভালোবেসে শিক্ষা নিয়ে কাজ করছি, তাদের অনেকেই নিজেদের পরিচয় দিয়ে থাকি শিক্ষাসেবক হিসেবে। বর্তমানে আমরা যারা বিভিন্ন জায়গায় কাজ করছি, আগামী প্রজন্মের কাছে আমাদেরও সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই একই অঙ্গীকার। তাই আমাদের উচিত সর্বাত্মক শক্তি নিয়োগ করে স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশে অব্যাহতভাবে শিক্ষার বিনির্মাণের মাধ্যমে টেকসই রাষ্ট্র সংস্কারের এ অনন্য সুযোগের সদ্ব্যবহার করা। আর নানা অবক্ষয়ের পথ ধরে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে যেসব জঞ্জাল জন্মেছে সেগুলো একে একে পরিষ্কার করে আমরা আমাদের প্রাথমিক নৈতিক দায়টুকু অন্তত শেষ করি। সে ক্ষেত্রে জীবনমুখী যুগোপযোগী শিক্ষাই হোক আমাদের প্রেরণা আর দিকনির্দেশনার উৎস। তবেই না অনেক প্রাণ আর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ মুক্তি অর্থবহ হয়ে উঠবে।

সাদামাটা একটি প্রশ্ন : কেমন শিক্ষাব্যবস্থা চাই? এ প্রশ্নের কোনো সহজসরল জবাব না থাকলেও আমাদের এ বিশেষ পরিস্থিতিতে বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থার বিনির্মাণের জন্য কোনো না কোনো জায়গা থেকে আলোচনাটা শুরু করতে হবে। আমরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা চাই যে শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের জন্য এমন শিক্ষার সুযোগ এনে দেবে যে শিক্ষা আমাদের শানিত ও প্রাণিত করবে জাতি গঠনের মূলমন্ত্র ‘বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য’ অনুশীলন করতে। একই সঙ্গে সেই শিক্ষা হবে ‘বৈষম্যহীন’ ও ‘স্বৈরাচারমুক্ত’ রাষ্ট্র বিনির্মাণে একটি ভেদাভেদহীন সমাজকাঠামো তৈরির মূল চালিকাশক্তি। তেমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা চাই যেখানে শিক্ষার বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীর প্রয়োজন ও আগ্রহকে লালন করবে এবং সঙ্গে সঙ্গে সে অনুযায়ী ‘শিক্ষার ডালি’ সাজাবে। যেখানে শিক্ষক হবেন শিক্ষার্থীর শিক্ষালাভের অনুপ্রেরণা আর শিক্ষার্থীর কল্যাণই হবে শিক্ষকের ধ্যানজ্ঞান, চিন্তাভাবনা ও কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। আর তেমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা বিনির্মাণে এ মুহূর্তে যা যা সংস্কার করা দরকার, তার সব কটাই করা এখন সময়ের দাবি। কিন্তু সবকিছু তো আর রাতারাতি করা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনের অগ্রাধিকার ও আয়োজনের সীমাবদ্ধতা বিচার করেই আমাদের এগোতে হবে। আর বিদ্যমান জঞ্জালগুলো সরিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতা উতরিয়ে আমাদের আস্তে আস্তে প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে অগ্রসর হতে হবে আর অব্যাহত রাখতে হবে বিনির্মাণের সুযোগ ও চেষ্টা-প্রচেষ্টা।

কথায় বলে, ‘নানা মুনির নানা মত’। বাংলাদেশ এডুকেশন ফোরামের উপরোক্ত মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণের সুবাদে নানা জনের নানা পরিপ্রেক্ষিত সম্পর্কে জানা ও বোঝার সুযোগ হলো। তার জন্য আয়োজকদের সাধুবাদ জানাই। বহুধাবিভক্ত সমাজে যুক্তির চেয়ে আবেগ বেশি কাজ করে। যৌথ কাজ করার সমস্যাটা সেখানে প্রকট। আমাদের মনে রাখতে হবে, যে অসহিষ্ণুতা স্বৈরাচারের বৈশিষ্ট্য সেটা যেন আমাদের আচার-আচরণে প্রতিফলিত না হয়। আমাদের মাঝে মতদ্বৈধতা বা মতবিরোধ থাকতেই পারে। আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরিতে বদ্ধপরিকর। আমরা চাইলে খুব সহজেই মুক্ত আলোচনায় মুক্তমনের পরিচয় দিয়ে মুক্তবুদ্ধির চর্চায় একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করত পারি। রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির জন্য প্রথমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। শিক্ষা ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করা গেলে কেবল তখনই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। আশা করি সমাজের সব শ্রেণি, বর্ণ, গোত্র, দল বা মতের মানুষকে সম্মান দিয়েই গণতন্ত্রের প্রধান যে ভিত্তি ‘পরমতসহিষ্ণুতা’, সেটা আমাদের কথাবার্তা ও আচরণে প্রতিফলিত করেই পারস্পরিক বোঝাপড়ায় চিন্তাভাবনার দূরত্ব কিংবা দৈন্য কমিয়ে আনার সদিচ্ছাকে অঙ্গীকার করেই শিক্ষা সংস্কার বা শিক্ষাব্যবস্থার বিনির্মাণের এ আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

আমি মনে করি, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রথম ও প্রধান ব্যর্থতা হলো মানুষকে মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধা ও সম্মান করতে শেখাতে না পারা। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রধান নিয়ামক হলো তার রাষ্ট্রীয় দর্শনের মূলমন্ত্র ‘মানবতাবোধ’। আর যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা তার নাগরিকদের মাঝে সে বোধ জন্মাতে ব্যর্থ সে রাষ্ট্র কখনই কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে না, কিংবা রাষ্ট্রের মানবতাবাদী চরিত্র বেশি সময় ধরে রাখতে পারে না। তাই আমাদের রাষ্ট্রীয় দর্শনে মানবতাবোধ ধারণ করে শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনচর্যায় প্রতিফলিত করে সেটাকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পুনরায় বলতে চাই যে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও কাঠামো সংস্কার টেকসই করতে শিক্ষাব্যবস্থার অব্যাহত বিনির্মাণ জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকারের সে বিষয়টা মাথায় রেখে দ্রুত একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা উচিত যাতে প্রতিফলিত হবে গণঅভ্যুত্থান-উত্তর ছাত্র-জনতার আশা-আকাঙ্ক্ষার। দীর্ঘদিনের অন্যায়-অত্যাচার আর বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার অনবরত সংগ্রামের সংস্কৃতি বজায় রাখার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধকারী শিক্ষাই আমরা চাই। জাতির নতুন প্রজন্মের জন্য তেমন শিক্ষা ব্যবস্থার পথ সুগম করার জন্য দার্শনিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বিনির্মাণের সব আয়োজন হওয়া উচিত। আমরা আশা করব, অন্তর্বর্তী সরকার তেমন একটা শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের জন্য বিনির্মাণ করবে যেটা হবে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জাতীয় ঐক্য, সংহতি ও সমৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি।

  • ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা