সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:২২ এএম
ওপার বাংলার প্রখ্যাত নাট্যকার, কবি, সংগীতস্রষ্টা দ্বিজেন্দ্রলাল
রায়ের (ডি এল রায়) ‘কত কিছু খাই ভস্ম আর ছাই’Ñ এই গানের পঙ্ক্তির সঙ্গে আমাদের বিদ্যমান
বাস্তবতার অমিল খুঁজে পাওয়া ভার। নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা আমাদের জন্য কত বড় চ্যালেঞ্জ
এরই সাক্ষ্য মিলেছে ২৪ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ সহযোগী সংবাদমাধ্যমগুলোতে।
বলা হয়েছে, বাংলাদেশে উৎপাদিত শাকসবজি ও ফলমূলে অতিরিক্ত মাত্রায় ভারী ধাতু ও কীটনাশকের
উপস্থিতি পাওয়া গেছে। শাকসবজি কিংবা ফলে ফরমালিন মেশানোর অভিযোগ ইতঃপূর্বেও বহুবার
উঠেছে, কিন্তু এবার নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের গবেষণায় যে চিত্র উঠে এসেছে তা জনস্বাস্থ্যের
জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। গবেষণায় ৯ ধরনের শাকসবজিতে লেড, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়ামসহ বেশ
কয়েকটি ভারী ধাতুর উচ্চ উপস্থিতির সন্ধান পেয়ে গবেষকরা চরম উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন।
একই সঙ্গে ফলের ৩৯টি নমুনায় কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়, যা মোট নমুনার প্রায় ১৩
শতাংশ।
আমরা জানি, খাদ্যপণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে
ধাপে ভেজালে সয়লাব। এতদিন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যে জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ
উপাদান মেশানো হলেও এখন কৃষিজ পণ্যেও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক এবং ওষুধ ব্যবহারের কারণে
এগুলোও জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটা বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের গবেষণায়
তা-ই উঠে এসেছে। শাকসবজি এবং ফল মানবদেহের পুষ্টি বা বিভিন্ন মাত্রার ভিটামিন সরবরাহের
জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের গবেষণায় যা উঠে এসেছে তাতে
প্রতীয়মান হয়, সুস্থ মানবদেহের জন্য যেসব উপাদান জরুরি সেগুলোই এখন স্বাস্থ্যঝুঁকির
চরম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেনেশুনে জীবন নিয়ে এমন জুয়ার পরিণতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে,
এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণও নতুন করে নিষ্প্রয়োজন।
ভেজাল খাদ্যপণ্যের ঝুঁকিতে রয়েছে মানুষ। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যপণ্য গ্রহণের
ফলে মানুষের গড় অসুস্থতা ক্রমেই বাড়ছে। এর জন্য খাদ্যব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট
দায়িত্বশীল মহলগুলোর সমন্বয়হীনতাও কম দায়ী নয়। ইতঃপূর্বে বিভিন্ন মহল থেকে এই দৈন্য
ঘোচানোর তাগিদ দেওয়া হলেও বিষয়টি যে মোটেও আমলে নেওয়া হয়নি, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের
গবেষণার ফল এ সাক্ষ্যই বহন করে। সুস্থ-সবল জাতির জন্য স্বাস্থ্যসম্মত নিরাপদ খাদ্যের
বিকল্প নেইÑ এমন সব স্লোগান নিয়ে নিরাপদ খাদ্যপণ্য নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সামাজিক
আন্দোলনও কম হয়নি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, জনগুরুত্বপূর্ণ এত বড় বিষয়টি উপেক্ষা-অবহেলাতেই
হাবুডুবু খাচ্ছে। আমরা জানি না সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলো এর কী ব্যাখ্যা দেবে।
তবে খাদ্যপণ্য নিয়ে যে তুঘলকি কাণ্ড চলছে তাতে যে আমাদের সামনে আরও নানারকম বিপদ অপেক্ষা
করছে, এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
আমরা জানি, সুস্থভাবে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য নিরাপদ খাদ্যপণ্য
অপরিহার্য। কোনো কোনো খাদ্যপণ্যের উপাদান জনস্বাস্থ্যের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু
ইতোমধ্যে বহুবার তা প্রমাণিত হয়েছে, খাদ্যপণ্যের বদলে আমরা বিষ খাচ্ছি। আমরা দেখেছি,
ইতোমধ্যে ভেজাল খাদ্যপণ্যের বিরুদ্ধে সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলের তরফে অভিযান
কম পরিচালিত হয়নি বটে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা ভেজালের বৃত্তমুক্ত হতে পারছি না।
কীটনাশক কিংবা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এমন কিছু ব্যবহার না করেও কৃষিপণ্য উৎপাদনের
নানা জৈবিক প্রক্রিয়ার বিষয়টি আমাদের সমাজেই বিদ্যমান ছিল। সেটা খুব দূর অতীতের বিষয়
নয়। কিন্তু এখন অধিক মুনাফা, অধিক ফলন এবং পচনশীলতার হাত থেকে খাদ্যপণ্য রক্ষার জন্য
জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ যেসব উপাদান এগুলোতে ব্যবহার করা হয়, তাতে শুভবোধসম্পন্ন
ও সচেতন যেকোনো কারও উদ্বেগহীন থাকার কোনো উপায় নেই। সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা ও অসাধু
ব্যবসায়ী-উৎপাদকদের অপকর্ম থেকে নিবৃত্ত করার নানারকম চেষ্টা সত্ত্বেও নিরাপদ খাদ্যপণ্য
প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি। ইতঃপূর্বে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা লিখেছিলাম,
এই গুরুতর ব্যাধি টোটকা কোনো দাওয়াইয়ে সারবে না। এর জন্য কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
শাকসবজি এবং ফল উৎপাদন খাত বাড়ানোর লক্ষ্যে যে প্রক্রিয়া অনেকেই অবলম্বন
করছেন তা আত্মঘাতীর নামান্তর। কৃষিবিজ্ঞানীদের অভিমত, এসব ব্যবহার না করেও কৃষিপণ্য
লক্ষ্যমাত্রায় উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু আমরা দেখছি, বিপত্তিটা হচ্ছে অধিক উৎপাদন ও অতিরিক্ত
লাভের আশায়। কিছুসংখ্যক মানুষের লাভালাভের হিসাবের কারণে পুরো জনগোষ্ঠী পড়েছে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।
এমনটি চলতে পারে না। এর প্রতিবিধান নিশ্চিত করা জরুরি। নিরাপদ খাদ্যপণ্যের ব্যাপারে
কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। মানহীন, ভেজাল অর্থাৎ জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ যেকোনো
খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী, সরবরাহকারী, বিক্রেতা কিংবা আমদানিকারক সবাইকে আনতে হবে কঠোর
আইনের আওতায়। নিরাপদ খাদ্যপণ্য আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল প্রতিটি মহলকে
নিজ নিজ ক্ষেত্রে যথাযথ দায়িত্ব ও নিষ্ঠার পরিচয় দিতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টা-সচেতনতা
ও দায়িত্বশীলতার মধ্য দিয়ে নিরাপদ খাদ্যপণ্যের বলয় তৈরি করা দুরূহ কোনো বিষয় নয় বলেই
আমরা মনে করি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি জরুরি সচেতনতা ও শাণিত নীতি-নৈতিকতা।