পার্বত্য চট্টগ্রাম
মোহাম্মদ আলী শিকদার
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:২১ এএম
মোহাম্মদ আলী শিকদার
১৯ সেপ্টেম্বর
প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়, ১৯ সেপ্টেম্বর বিকালে খাগড়াছড়ির
দীঘিনালায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে হামলা ও অগ্নিকাণ্ডের
ঘটনা ঘটে। দীঘিনালা সরকারি ডিগ্রি কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে খাগড়াছড়ির
মামুন নামক এক ব্যক্তিকে হত্যার প্রতিবাদে ওই দিন বিকালে বিক্ষোভ মিছিল ও কলেজগেট এলাকায়
সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষ হওয়ার পর দুর্বৃত্তরা হামলা চালালে দুই পক্ষের মধ্যে
সংঘর্ষ শুরু হয়। এর পরপরই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। রাতের গোলাগুলি ও বিকালের সংঘর্ষের
ঘটনায় তিনজন নিহত হয়। ১৪৪ ধারা জারির পর পাহাড়ে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে অন্তর্বর্তী
সরকারের তরফে বলা হয়েছে, সৃষ্ট সমস্যা সমাধানের কাজ চলছে। ২১ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র
উপদেষ্টার নেতৃত্বে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি
পরিদর্শন করে। প্রতিনিধিদলে ছিলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা,
স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা এবং প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়নবিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার
বিশেষ সহকারী। তাদের সফরের দুই দিন পর যখন এ লেখা লিখছি তখনও পাহাড় শান্ত হয়নি। প্রতিদিনের
বাংলাদেশের ওই দিনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাহাড়ি জনপদে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
২০১৫ সালে পার্বত্য
চট্টগ্রামে সক্রিয় বিদেশি দাতা সংস্থা ইউএনডিপির কার্যক্রম মনিটরিং ও জবাবদিহির আওতায়
আনা, সিএইচটি কমিশনের নাম পরিবর্তন, বিদেশি অতিথি ও কূটনীতিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে
ভ্রমণ ও স্থানীয় পর্যায়ে বৈঠক নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশ ও আনসারে যোগ দেওয়া শান্তিবাহিনীর
সাবেক সদস্যদের তিন পার্বত্য জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলির মতো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ
ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও
ষড়যন্ত্র দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান জানা যায়। কিন্তু তারপরও পাহাড়ে সংকট কাটেনি। বিভিন্ন
সময় সংকট আরও বেড়েছে। পাহাড়ের সংকটকে শুধু পাহাড়ে অবস্থিত সংখ্যালঘু জাতিসত্তার সংকট
হিসেবে দেখলে হবে না, বরং পাহাড়ের বাসিন্দারা সেখানে ঐক্যবদ্ধ যেন হতে না পারে, সেটাই
যেন চায় অনেক পক্ষ।
ইতঃপূর্বে উত্থাপিত
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা জানি, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সীমান্ত দিয়ে মণিপুর
অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের অনেক সদস্য এদিকে চলে আসে। তারা অবশ্য এখানে সাময়িক
আশ্রয়ের জন্য আসে। এখানে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি করার উদ্দেশ্য তাদের থাকে না।
কিন্তু মিয়ানমার থেকে আরাকান আর্মি, কেএনএফের মতো সংগঠনের সদস্যরা এখানে এসে আশ্রয়
নিচ্ছে এমন অভিযোগও রয়েছে। এই স্তম্ভেই ইতঃপূর্বে লিখেছি, মিয়ানমার সরকারের গুপ্ত বাহিনীও
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বন্ধের জন্য এখানে গোয়েন্দা নিযুক্ত করে থাকতে পারে। এমনকি ধর্মীয়
উগ্রবাদী সংগঠন যারা এনজিওর নামে কর্মকাণ্ড চালায় তাদেরও হাত থাকতে পারে। পাহাড়কে ঘিরে
মিশনারিদের তৎপরতাও নতুন কিছু নয়। অর্থাৎ পাহাড়ে অস্থিতিশীলতার নেপথ্যে ওনেক কারণ রয়েছে
যেগুলোর সমাধান করার জন্য রাজনৈতিক ভাবনা জরুরি।
সব সশস্ত্র সন্ত্রাসীর
বড় আগ্রহ ও যোগাযোগের মৌলিক স্বার্থের জায়গা যেন হচ্ছে পাহাড়। তারা সবাই চোরাচালানের
মাধ্যমে অস্ত্র-গোলাবারুদ সংগ্রহ করে এবং সেগুলো নিজেদের মধ্যে সেখানে আদান-প্রদান
করে। এর ফলে বাংলাদেশের সমতল এলাকায় জঙ্গি আক্রমণের আশঙ্কা তো থেকেই যাচ্ছে, তার সঙ্গে
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে চাঁদাবাজিসহ প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় রক্তপাতের
ঘটনাও ঘটছে। এমনটি চললে স্থানীয়রা সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে জিম্মি হয়ে পড়বে। শান্তিচুক্তির
ফলে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ যেসব সুবিধা পাচ্ছে, সেগুলো আবার নিরাপত্তার ঝুঁকির মধ্যে
পড়বে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শুধু নয়, বাংলাদেশের জন্য এ সময় জননিরাপত্তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন
রয়েছে জনমনে ও সংবাদমাধ্যমে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের মধ্যে অবস্থিত কয়েক ডজন
রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জঙ্গি সংগঠনের সংযোগ ও সম্পর্কের
কারণে। আতঙ্ক বিরাজ করছে এমন অভিযোগও উঠে এসেছে। দেশে রোহিঙ্গা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন
বাদেও একাধিক বড় জঙ্গি সংগঠনের উপস্থিতি নিয়ে আমাদের আগেও নানা প্রশ্ন ছিল। এক্ষেত্রে
যুক্ত হয়েছে নতুন করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক এ ধরনের সংগঠন গড়ে ওঠার কারণ অনুসন্ধানের বিষয়টি।
দুর্গম পাহাড়ে
ব্যক্তিকেন্দ্রিক এই জঙ্গি সংগঠনগুলো হত্যা, অপহরণ, চোরাচালান, ধর্ষণের মতো অপরাধের
সঙ্গেই বেশি যুক্ত। আগেও প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এই লিখেছি, দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জঙ্গি
সংগঠনগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের সম্পৃক্ততা নেই। ব্যক্তিকেন্দ্রিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর
ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কিন্তু দেশে জঙ্গি সংগঠনগুলোর যে ধরন তা যদি আমরা বিশ্লেষণ
করি তাহলে দেখব, আমরা আস্তে আস্তে জটিল এক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে চলেছি। দেশে জঙ্গি
সংগঠনের তিন ধরনের ধারা দেখা যাবে : ব্যক্তিকেন্দ্রিক, রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিচালিত ও
দুর্গম পাহাড়ের জঙ্গি সংগঠন। মোটা দাগে আমরা এ তিন ধরনের জঙ্গি সংগঠনই বেশি দেখতে পাব।
ওরা পাহাড়ের আড়ালকেই ওদের জন্য নিরাপদ মনে করে এবং সেদিকে ধাবিত হয়।
সম্প্রতি পার্বত্য
চট্টগ্রামে অস্থিতিশীলতার পেছনে পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালি এবং পাহাড়ী সংখ্যালঘু জাতিসত্তার
মানুষদের প্রসঙ্গ টানতে হয়। আমরা দেখছি, বাঙালি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সংখ্যালঘু জাতিসত্তার
মানুষ একে অপরকে দোষারোপ করছে। অশান্ত পার্বত্য তিন জেলায় হত্যা, অগ্নিকাণ্ড, লুটপাট,
হামলা বন্ধ করে এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও
আমরা দেখছি, বিষয়টি নিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারিত হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই
পাহাড়কে স্বাধীন করার দাবিও উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু বিষয়টি সত্য নয় বলে মনে
করি। বিগত কয়েক দিনে পাহাড়ে যা ঘটেছে এ বিষয়ে সঠিক তথ্য বা এখনও কারা এ ঘটনার সঙ্গে
জড়িত তা জানা যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে
বিদ্বেষ ছড়ানো মোটেও ঠিক নয়। পাহাড়ের সমস্যা এবারই প্রথম দেখা গেলো এমনটি নয়। পাহাড়ে
রাজনৈতিক সংকট বহু আগে থেকেই বিদ্যমান। কিন্তু ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পাহাড়ের
মানুষেরাও নতুন কিছুর প্রত্যাশায় সরকারের কাছেই দাবি জানিয়েছে। সাম্প্রতিক নানা ঘটনায়
সেসব দাবি অনেকটা ধামাচাপা পড়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে অনেকেই স্বায়ত্তশাসন চেয়েছে।
আবার কেউ কেউ সেখানে সেনাশাসনের বদলে রাজনৈতিক শাসন দাবি করেছে। পাহাড়ের বাস্তবতা বিবেচনায়
স্বায়ত্তশাসন দেওয়া না গেলেও তাদের অধিকাংশ দাবি অযৌক্তিক নয়। এ বিষয়ে সরকারের উচিত
একটি আলাদা কমিশন করে বিদ্যমান সংকটের বিষয়টি বিবেচনা করা এবং যৌক্তিক সমাধানের পথ
খোঁজা।
আমরা দেখছি, পাহাড়ে
বিগত কয়েক দিনের অভিযানে অস্ত্রের ঝনঝনানি বেড়েছে। আমরা জানি, পাহাড়ের অনেক এলাকায়
দুর্গম অঞ্চল হওয়ায় সবখানে পুরোপুরি বিদ্যমান আইনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়নি।
এই নিয়ন্ত্রণহীন শূন্যস্থানে মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করে কিংবা নানাভাবে জিম্মি করে প্রচুর
চাঁদা আদায়ের সুযোগ এখন যেন আরও বেড়েছে। আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরি। একসময় দুর্গম
পাহাড়ে মিলিটারি ক্যাম্পগুলো সুবিন্যস্তভাবে স্থাপন করা হয়েছিল। শান্তিচুক্তির পর তা
প্রত্যাহার করা হয়। সামরিক নিরাপত্তা না থাকায় জঙ্গিবাদীরা আরও বেশি সুযোগ পাচ্ছে।
যেহেতু ব্যক্তিস্বার্থে চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে তাই একাধিক গোষ্ঠী গড়ে ওঠাটা
অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের খবরও আমরা প্রতিনিয়ত
সংবাদমাধ্যমে পাই। মনে রাখতে হবে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক এই জঙ্গি সংগঠনের সদস্যসংখ্যা খুব
বেশি নয়। কিন্তু তারা পার্বত্যজীবনে ভয়াবহ বিরূপ প্রভাব ফেলে। পাহাড়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক
জঙ্গি সংগঠনগুলোকে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বলা হলেও আদৌ বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা স্বাধীনতাবাদের
সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক আছে কি না আমার জানা নেই।
বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চালাতে হলে আন্তর্জাতিক সমর্থন থাকা জরুরি। আপাতত দেশের জঙ্গি সংগঠনগুলো বিচ্ছিন্নতাবাদী কোনো আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত আছে বলে মনে হচ্ছে না। নানা অভিযোগের ভিত্তিতে বলা যেতে পারে, তারা অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। ব্যক্তিকেন্দ্রিক জঙ্গি সংগঠন অতীতেও ছিল এবং এখনও আছে। একসময় তারা পাহাড়ে আশ্রয় নিত। কিন্তু দেশে বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় তারা দুর্গম পাহাড় ছেড়ে সমতলেও চলে আসার সুযোগ পাচ্ছে, এমন অভিযোগ রয়েছে। পাহাড়ের ছোট্ট সংগঠনের সঙ্গে অনেক সময় বড় জঙ্গি সংগঠনের ছোটখাটো স্বার্থ মিলে যায় বলে তারা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একে অন্যকে সহযোগিতা করতে পারে। অর্থাৎ একটি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। এই নেটওয়ার্কের একটি বড় অংশ অস্ত্র ও মাদক পাচারে যুক্ত থাকে। এ বিষয়ও আমাদের জন্য শঙ্কার। পাহাড়ের সংকট সমতলেও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। পাহাড়ের জনগণের কিছু সংকট রয়েছে যা সমাধানের জন্য রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ জরুরি। অন্যদিকে পাহাড়ে যারা নানা অপতৎপরতায় জড়িত তাদের দমনের জন্য সাঁড়াশি অভিযানের বিকল্প নেই। পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রতির বন্ধন আরও জরুরি। উভয় গোষ্ঠীর মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়তে হবে। পাহাড়ের সমস্যাগুলো নতুন নয়। কাজেই এর সমাধান করতে হবে সেই প্রেক্ষাপটগুলোর দিকে নজর রেখে।