× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আর্থিক খাত

অব্যবস্থাপনার উৎসে নজর দিতে হবে

ড. নীলাঞ্জন কুমার সাহা

প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:২৪ এএম

ড. নীলাঞ্জন কুমার সাহা

ড. নীলাঞ্জন কুমার সাহা

১১ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ব্যাংক খাত সংস্কারে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন বা ১৭৫ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দিচ্ছে। এর মধ্যে এডিবি তিন ধাপে ১৩০ কোটি আর বিশ্বব্যাংক দেবে ৪০ থেকে ৪৫ কোটি ডলার। প্রতিবেদনে এও বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র বলছে, বিশ্বব্যাংক থেকে ৪০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণের বিষয়ে আলোচনা শুরু হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে ৪৫ কোটি ডলার করা নিয়ে এখন আলোচনা চলছে। ব্যাংক খাত সংস্কারে এডিবি ১৩০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। এ ঋণ দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনর্মূলধন হিসেবে দেওয়া যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সরকার ব্যাংক খাত সংস্কারে কমিশন গঠনের পরিবর্তে দ্রুত তিনটি টাস্কফোর্স করার পরিকল্পনা করছে। কমিশন গঠনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। কিন্তু দ্রুত সংস্কার শুরু করার জন্য টাস্কফোর্সের মাধ্যমে কাজ শুরু করতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। টাস্কফোর্সগুলো যেন যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারে, সেজন্য দেশি-বিদেশি সর্বোচ্চ কারিগরি জ্ঞান ও সহায়তা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তবে শুধু ব্যাংকিং খাতের সংস্কার করে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। এ ক্ষেত্রে সামগ্রিক আর্থিক খাতের সংস্কার জরুরি। আধুনিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের পরিধি ও ব্যাপ্তি এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে যে এ খাতকে আলাদাভাবে দেখার কোনো অবকাশ নেই।

ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখন আমাদের অর্থনৈতিক খাতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ব্যাংকিং খাতে চরম অব্যবস্থাপনার দরুন আর্থিক খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এজন্যই এ খাতে বড় সংস্কারের দাবি উঠেছে। ভুলে গেলে চলবে না, দেশের আর্থিক খাতের অন্যান্য ক্ষেত্রেও অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা রয়েছে। তাই শুধু ব্যাংকিং খাতের সংস্কারই পর্যাপ্ত নয়। অনেকেই ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত পৃথকভাবে দেখার চেষ্টা করেন না। অনেকে মনে করেন দুটি খাত একই। আর্থিক খাত মূলত দেশের অর্থনীতি এবং অর্থব্যবস্থার একটি পরিপূর্ণ কার্যক্রম। আর্থিক খাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ আছে, যেগুলো দেশের অর্থনীতি ও মুদ্রাব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ব্যাংকিং খাত হচ্ছে দেশের সমগ্র আর্থিক খাতের একটি অংশ। ব্যাংকিং খাতের অব্যবস্থার কথা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হলেও বীমা খাত নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। দেশের ব্যবসাবাণিজ্য এবং সমাজের পদে পদে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বীমাসুবিধা এখনও জনপ্রিয় নয়। বীমার প্রিমিয়ামের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আছে নানা অভিযোগ। অনেক ক্ষেত্রে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও আছে।

আমরা দেখছি, আর্থিক খাতে সর্বাধিক অব্যবস্থাপনা রয়েছে পুঁজিবাজারে। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাংকিং খাতের চেয়ে পুঁজিবাজারে অব্যবস্থাপনা বেশি। পুঁজিবাজার, বিশেষ করে স্টক মার্কেটে অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক বিনিয়োগকারী তাদের পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। সুতরাং দেশের আর্থিক খাতের সর্বত্রই সমস্যা এবং অব্যবস্থা। এজন্যই সংস্কার করা প্রয়োজন সমগ্র আর্থিক খাত। আর্থিক খাতে সংস্কার না করে শুধু নির্দিষ্ট একটি খাতে সংস্কার করলে এই সংস্কার প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল আনবে নাদীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও টাস্কফোর্সের কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে বিরাজমান সমস্যার সন্তোষজনক সমাধান সম্ভব হবে না যদি আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনার দিকেও মনোযোগ না দেওয়া হয়। মানসম্পন্ন ব্যাংকিং নিশ্চিত করতে হলে আর্থিক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগে কিছু সাধারণ শর্তাবলি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি অন্যান্য সংশ্লিষ্ট খাতের আধুনিকায়ন করা না গেলে ব্যাংকিং খাতের একার পক্ষে সেসব শর্ত পরিপালন করা সম্ভব হবে না। তাই সংস্কার হলেও দেশের ব্যাংকিং খাতে দুর্বলতা থাকবে, যার মাধ্যমে এ খাতের অব্যবস্থাপনা জিইয়েই থাকবে।

দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা বা আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত ব্যবসাবাণিজ্য উৎসাহিত করতে হলে সে খাতে ব্যাংকিংসেবা, বিশেষ করে ঋণসুবিধা প্রদান সহজ এবং অবারিত করতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, এ খাতে ঋণ প্রদানে ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেশি এবং এখানে প্রদত্ত ঋণের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ খেলাপি হয়। ফলে এত বিশাল অঙ্কের খেলাপির ঝুঁকি নিয়ে কোনো ব্যাংক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় ঋণ প্রদানে আগ্রহী হবে না। মাত্রাতিরিক্ত ঋণ ঝুঁকি লাঘবের জন্য বিশেষ বীমাসুবিধার প্রচলন করা হলেও তা বাস্তবে সুফল এনে দেয়নি। তাই দেশের বীমা খাতের সংস্কার না করে শুধু ব্যাংকিং খাতের সংস্কার হলে মাঝারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দুর্দশা লাঘব হবে না। কারণ সদিচ্ছা থাকলেও ব্যাংক তাদের ঋণ দিতে পারবে না। এখন ব্যাংকিং কার্যক্রম শুধু গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহের দায়িত্বই পালন করে নাগ্রাহকের ব্যক্তিগত আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে। গ্রাহকের উপার্জন, সঞ্চয়, ঝুঁকিগ্রহণের সক্ষমতা এবং অবসরজীবন কেমন হবে প্রভৃতি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তার মাসিক খরচের পরিমাণ, সঞ্চয়ী হিসাবে জমা, স্থায়ী আমানতে জমা, পেনশন তহবিলে জমা, মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ এবং এমনকি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগের ব্যাপারে সুপরামর্শ দেওয়া হয় হয় আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায়দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের ব্যাংকে এ ব্যবস্থার প্রচলন এখনও সেভাবে শুরু হয়নি।

বর্তমান বিশ্বে ব্যাংকিং কার্যক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ব্যাংক আমানত সংগ্রহ করে ঋণ প্রদানের সুযোগ কমিয়ে এনেছে। ব্যাংক সব সময়ই আমানতকারীর অর্থ নিয়ে ব্যবসা করে সর্বোচ্চ মাত্রার ঝুঁকি নেয়কারণ ব্যাংক যে আমানত সংগ্রহ করে, তা গ্রাহকের চাহিবামাত্র দিতে বাধ্য থাকে। এমনকি স্থায়ী আমানতের অর্থও মেয়াদপূর্তির আগেই ব্যাংক প্রদান করতে বাধ্য হবে যদি গ্রাহক দাবি করে। পক্ষান্তরে ব্যাংক যে ঋণ প্রদান করে, সেই অর্থ মেয়াদপূর্তির আগে তো অনেক পরের কথা, মেয়াদপূর্তির পরও যে ফেরত আসবে সে নিশ্চয়তা নেই। ফলে ব্যাংক সব সময়ই তারল্য সংকটের ঝুঁকিতে থাকে। ব্যাংক স্বল্পমেয়াদি আমানত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিলে ব্যাংকের এ ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। তাই আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত সংগ্রহ করে ঋণ প্রদানের প্রবণতা অনেক কমে গেছে।

বিকল্প হিসেবে ঋণের মেয়াদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণদাতা ব্যাংক বন্ড ইস্যু করে বন্ড মার্কেট থেকে অর্থ উত্তোলন করে ঋণ দেয়। যাচাইবাছাই এবং বিচার-বিশ্লেষণ শেষে প্রস্তাবটি লাভজনক বিবেচিত হওয়ায় ব্যাংক ঋণ প্রদানে সম্মত হতে পারে। দেশে যদি কার্যকর বন্ড মার্কেট গড়ে তোলা না হয়, তাহলে ব্যাংক চাইলেও আধুনিক সেবা প্রদান করতে পারবে না। ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের মাধ্যমে দেশের ব্যাংকে এ ধরনের ঋণদান ব্যবস্থা প্রচলন করলেও তা কাজে আসবে না, যদি দেশের পুঁজিবাজারে সংস্কার করে কার্যকর বন্ড মার্কেট চালু করা না হয়। উল্টো ব্যাংকিং খাতের সংস্কার সত্ত্বেও ব্যাংকগুলো সেই আগের কায়দায় আমানতের টাকা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ হিসেবে বিতরণ করে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে। এ রকম অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে যেখানে বিচ্ছিন্নভাবে সংস্কার করে সে রকম কোনো লাভ হবে না, যদি সমগ্র আর্থিক খাতে সংস্কার করা না হয়।

দেশের ব্যাংক খাত সংস্কারের অগ্রভাগে থাকুক। ইতোমধ্যে এ কাজ অনেকটাই শুরু হয়েছে বটে, কিন্তু আর্থিক খাতের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় এত ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে যে এর উপশম এত সহজ নয়। তাই নজর দিতে হবে অনেক গভীরে। এখন ব্যাংকিং খাতকে আর স্বতন্ত্র এবং পৃথক করে দেখার সুযোগ নেই। বরং আধুনিক অর্থব্যবস্থায় ব্যাংক, মুদ্রাবাজার, পুঁজিবাজার এবং অন্যান্য খাত মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে এবং একটি আরেকটির সঙ্গে মিলিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। তবে শুধু সমগ্র আর্থিক খাতের সংস্কার প্রয়োজন, যেখানে দেশের ব্যাংকিং খাতও গুরুত্বসহকারে থাকবে।

  • অধ্যাপক, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা