পরিপ্রেক্ষিত
এহসান ফেরদৌস
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:১৮ এএম
সামাজিক অবক্ষয় বিভিন্নভাবে হয়ে থাকে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা
দেখতে পাবো, বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর নানা স্থানে মানবতাবোধ ও নৈতিকতার অভাবে সমাজ মারাত্মকভাবে
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ‘জোসেফ টেইনটার’ নামের এক নৃবিজ্ঞানী সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ হিসেবে
রাজনৈতিক কাঠামোর পতনকে দায়ী করেছেন। তবে সামাজিক অবক্ষয় শুধু দুর্বল রাজনৈতিক অবকাঠামো
দিয়ে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। এর আরও কিছু কারণ রয়েছে। এর পেছনে রয়েছে সম্পদের অসম বণ্টন,
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তুলনাপ্রবণতা, লক্ষহীন অভিবাসন ও অনিশ্চিত জীবনব্যবস্থার মতো কিছু
সূক্ষ্ম কারণ। উল্লিখিত প্রায় প্রতিটি কারণই আজ আমাদের সমাজে লক্ষ করা যায়।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বন্যাপীড়িত অঞ্চলগুলোর একটি। প্রতি বছরের
বন্যা আমাদের জানমালেরই ক্ষতি করছে না, সমাজব্যবস্থাকেও করছে ক্ষতিগ্রস্ত। প্রাকৃতিক
দুর্যোগগুলোর প্রভাব আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায়
২০২২ সালে আঘাত করেছিল বিধ্বংসী হ্যারিকেন। এর ঠিক পরের বছর একটি গবেষণা প্রকাশ করে
ওই এলাকার মানুষের মাঝে ‘প্যানিক অ্যাটাক’ বা ‘ভীতি উদ্ধেগ’ তুলনামূলকভাবে বেড়েছে।
মায়ো রিসার্চের গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে সৃষ্ট মানসিক চাপ কখনও
কখনও ১০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। আমরা হয়তো গবেষণায় এসব দেশের মতো খরচ করতে পারি
না। তাই বন্যা-পরবর্তী সময়ে আমাদের শিশুদের আর তরুণদের মানসিক পরিবর্তনের বিষয়টি আমাদের
নজর এড়িয়ে যায়। তবে এর ফলাফল আমরা হয়তো দিনে দিনে আমাদের সমাজে দেখতে পাচ্ছি।
অপরিপক্ব সমাজব্যবস্থায় আমরা আমাদের চিন্তা ও বাস্তবতার পার্থক্যকে
চিহ্নিত করতে পারি না। আবার অর্থনৈতিক পরাধীনতা আমাদের ইচ্ছাকে চরিতার্থ করতে দেয় না।
যার ফলে একটি চাপা ক্ষোভ আমরা অনেকেই বয়ে বেড়াই। দীর্ঘদিনের চাপা থাকা কষ্ট বা ক্ষোভ
আমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছে এক ধরনের মানসিক অস্থিরতা। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে ‘প্রিডেটরি
বিহেভিয়ার’ বা ‘শিকারি মনোভাব’ বলা হয়। ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে না পারায় আমরা সব
সময় অন্ধকারে থাকি, অন্যের জীবনকে মনে হয় সুন্দর আর নিজের জীবনকে অর্থহীন। এটি শুধু
আমাদের মাঝে তুলনামূলক মনোভাবই সৃষ্টি করছে না, বরং সামাজিক একতাবোধকে করছে দুর্বল
ও ভঙ্গুর।
আমাদের আলোচনার অধিকাংশ সমস্যাই শহরকেন্দ্রিক। ঢাকার মাত্রাতিরিক্ত
ও চলমান অভিবাসন, আপাতদৃষ্টিতে নিজেকে প্রমাণ করার অতিপ্রচেষ্টার সঙ্গে ঢাকার অভিবাসনের
সম্পর্ক বোঝাটা একটু কঠিন। তবে একটু লক্ষ করলেই দেখতে পাব যে, একটি বড় অদক্ষ জনগোষ্ঠী
যারা প্রতিনিয়ত কাজের খোঁজে বা নতুন জীবনের আশায় শহরে পাড়ি জমাচ্ছে, তারা বেশিরভাগই
লক্ষ্যচ্যুত অবস্থায় শহরে আসছেন। তারা কী করবে বা তাদের জীবন কোনদিকে যাচ্ছে, এটি তাদের
জন্য বোঝাটা বেশ কঠিন। তবে শুধু যে অদক্ষ জনগোষ্ঠী শহরে পাড়ি জমাচ্ছে, তা নয়। প্রচুর
পরিমাণে শিক্ষার্থী ঢাকায় পাড়ি জমাচ্ছেন উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে। ঢাকার বর্ধিত জনসংখ্যার
চাপ তাদের একটি সুস্থ সামাজিক পরিবেশ দিতে পারছে না, যার ফলে মানসিক স্বাস্থ্যের ক্রমাগত
অবনতি ঘটছে।
ক্রোধ আর প্রতিশোধপরায়ণ মন একটি সমাজের মানুষদের পশুত্বের দিকে নিয়ে যায়। এ ধরনের সমাজকে সামাজিক বিজ্ঞানের ভাষায় বিষাক্ত সমাজ (টক্সিক সোসাইটি) বলা হয়ে থাকে। একটি সমাজ যখন বিষাক্ত হয়ে উঠে, তখন নির্বিচারে হত্যা বাড়ে এবং এজন্য মানুষের মধ্যে অনুশোচনাবোধ কাজ করে না। এই ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তিই বর্তমান সমাজব্যবস্থার অধঃপতনকে নির্দেশ করে। সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমেই সম্ভব একটি দেশের উন্নয়ন। সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রয়োজন আলোচনায় উঠে আসা অধঃপতনের কারণগুলোর দিকে সতর্ক দৃষ্টি দেওয়া। বিষয়গুলোকে আমলে আনার মাধ্যমেই সম্ভব একটি বিষাক্ত সমাজ থেকে মুক্তি পাওয়া। এ ছাড়া স্বাধীনতা শব্দটি উপযুক্ত সম্মান হয়তো আমরা কোনোদিনই নিশ্চিত করতে পারব না।