সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার
ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:১০ এএম
ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ
বিশ্বের যেকোনো দেশের সেনাবাহিনীকে মেধা-মনন ও প্রশিক্ষণগত
দিক থেকে মূলত যুদ্ধপরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য গড়ে তোলা হয়। এর বাইরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ,
বড় কোনো দুর্ঘটনা কিংবা দেশের কোনো অস্থির পরিস্থিতিতে যখন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনীর নিয়মিত সদস্যদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন দ্রুত পরিস্থিতি সামাল
দিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জানমাল রক্ষায় তলব করা হয় সেনাবাহিনী। আবার সাধারণ নির্বাচনসহ
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজেও মাঠে থাকে সেনাবাহিনী। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন চালু
হওয়ার পর দেশের বাইরে নির্বাচন পরিচালনা ও শান্তি ফেরাতেও সেনাবাহিনীর ডাক পড়ে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর
ব্যারাক ছেড়ে বাইরে থাকা ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে বিশেষ ভূমিকা রাখার ইতিহাস বেশ পুরোনো।
বলা যায় দেশের ইতিহাস ও ঐতিহাসিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ
সেনাবাহিনীর নাম । মহান মুক্তিযুদ্ধে সেনাবাহিনীর বীরত্বগাথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা। স্বাধীনতার
পর অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চোরাচালান ও সন্ত্রাস দমনের জন্য সেনানিবাস ছেড়ে বাইরে আসতে
হয় সেনা সদস্যদের। পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের সঙ্গে একদিকে যেমন কিছু সেনা সদস্যের
নাম যুক্ত, তেমন জড়িয়ে আছে বিশাল সেনাবাহিনীর বাকি অংশের নিষ্ক্রিয়তার প্রসঙ্গ।
সেনানিবাস থেকেই দেশ পরিচালনা পর্ব শুরু করেন প্রেসিডেন্ট জিয়া ও তার দল বিএনপি। আবার
একইভাবে প্রেসিডেন্ট জিয়ার হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী পরিবর্তনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে
আছে এ সেনাবাহিনীর নাম। সেনাবাহিনীর বৃহদাংশের সমর্থন পাননি বলেই জেনারেল মঞ্জুরকে
প্রাণ দিতে হয় এবং জিয়ার ক্ষমতা চলে যায় প্রেসিডেন্ট সাত্তারের হাতে। আবার সেনা
সমর্থন পাননি বলেই ব্যর্থ হন প্রেসিডেন্ট সাত্তার। সেনা সমর্থনেই এরশাদের উত্থান ও
জেনারেল নূরুদ্দীনের নেতৃত্বে সমর্থন না পাওয়ায় নব্বইয়ের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে
এরশাদের পতন ঘটে।
বৃহত্তর সেনাবাহিনীর
সমর্থন না পেয়ে ব্যর্থ হন জেনারেল নাসিম। ১/১১-এ সেনা সমর্থন নিয়ে চলতে হয় তিন উদ্দিন
তথা ইয়াজউদ্দিন, ফখরুদ্দীন ও মইন উদ্দিনকে। তবে তাদের শাসন দীর্ঘ হতে দেয়নি সেনাবাহিনীর
আরেকটি অংশ। এমন ইতিহাস একটি কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় বাংলাদেশের সেনাবাহিনী সমর্থন
দিলে ইতিহাস একরকম হয়, আবার সমর্থন প্রত্যাহার করে নিলে হয় অন্যরকম। ২০০৭ থেকে ২০২৪Ñএই
কয়েক বছরের ইতিহাস লিখতে গেলে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে অনেক কিছুই লিখতে হবে। বিশেষত
তথাকথিত সংসদীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনীর বিতর্কিত দায়িত্ব পালন এবং গোয়েন্দা সংস্থায়
দায়িত্ব পালনরত কতিপয় সেনা সদস্যের স্পর্শকাতর ভূমিকা দেশের রাজনীতি এক সংকটময় পরিস্থিতিতে
ফেলেছিল। সর্বশেষ ৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর বন্দুকের গুলি জনতার দিকে বর্ষণ না করার একটি
সিদ্ধান্তই পাল্টে দেয় সবকিছু। ৫ আগস্ট থেকে মাঠে আছে সেনাবাহিনী। সেই থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর
পর্যন্ত সেনাবাহিনীর হাতে কোনো ‘ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার’ বা সোজা বাংলায় কার্যনির্বাহী
ক্ষমতা ছিল না। এই ৪৩ দিন সেনাবাহিনী মূলত বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য মাঠে ছিল
এবং বেসামরিক প্রশাসনের অনুরোধেই কেবল কার্যকর ভূমিকা পালনের কথা ছিল সেনা সদস্যদের।
ফলে সেনাবাহিনী সরাসরি বা স্বপ্রণোদিত হয়ে অনেক কিছুই করেছে, যা রাষ্ট্রের সম্পদ ও
নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
নিঃসন্দেহে এ কারণে সেনাবাহিনী দেশবিদেশে প্রশংসিত
হয়েছে। তবে ভুলে গেলে চলবে না যে, আইন চলে চোখ বন্ধ করে। তাই আইনের দৃষ্টিতে অনেক
কিছুই ক্ষমতার অপব্যবহাররূপে চিহ্নিত করার সুযোগ রয়ে যায় যদি সেনাবাহিনী মাঠ পর্যায়ে
কোনো বেসামরিক ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি বা লিখিত নির্দেশ ছাড়া কিছু করে থাকে। সেনাবাহিনীকে
যখন ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়া হয়, তখন একজন সেনা অফিসার সেই একই কাজ কোনো বেসামরিক
ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি বা লিখিত আদেশ ছাড়াই সম্পন্ন করার বৈধতা পেয়ে যান।ম্যাজিস্ট্রেসি
পাওয়ারবিহীন ৪৩ দিনে সেনাবাহিনীর সার্বিক কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন অনেক দীর্ঘ আলোচনার
বিষয়। তবে কিছু চুম্বক অংশ উল্লেখ করলেই কেবল সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার
প্রদানের প্রেক্ষাপট বা যৌক্তিকতা অনুধাবন করা সহজ হবে। আমরা সবাই জানি ৬ শতাধিক বিশিষ্ট
নাগরিক নিরাপত্তার জন্য সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এ তালিকায় ছিলেন বিচারক, পুলিশ,
শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, আমলাসহ নানা পেশার বিগত দিনের সুবিধাভোগী ও বিতর্কিতরা। কেউ কেউ
আবার পরিবার- পরিজনসহ আশ্রয় নিয়েছিলেন। ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ বা প্রয়োজনের কারণেই
এমনটা হয়েছিল এবং রাস্তায় বা প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড তথা স্ট্রিটফাইট ও মব জাস্টিস
রোধকল্পে এমন ব্যবস্থাপনাকে মেনেও নিয়েছিল দেশবিদেশের সব পক্ষ। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেসি
পাওয়ার ছাড়া এমন নিরাপত্তা হেফাজত বৈধ ছিল না। ৪৩ দিন পর ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ারের
আওতায় ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ১২ (১) ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমিশনপ্রাপ্ত
কর্মকর্তারা সারা দেশে ৬০ দিনের জন্য কিছু বিশেষ ক্ষমতা লাভ করেছেন। এখন সিআরপিসি বা
ফৌজদারি কার্যবিধি ১৪২ ধারা বলে ভবিষ্যতে এমন নিরাপত্তা হেফাজত বৈধ হবে।
দেশের প্রশাসনের
প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ের অভ্যন্তরে অবশিষ্ট এইচএসসি পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে উঠতি বয়সি
একদল শিক্ষার্থীর বিশৃঙ্খলা এবং সচিবালয়ের গেটে অঙ্গীভূত আনসারদের তাৎক্ষণিক দাবি
আদায়ের লক্ষ্যে অনড় অবরোধ ও অনৈতিক অবস্থান শঙ্কায় ফেলেছিল গোটা রাষ্ট্রকাঠামোকে।
এমন ক্রান্তিকালে প্রতি মিনিট এমনকি প্রতিটি সেকেন্ডও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তখন সেনাবাহিনী
মাঠে থাকলে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি বা আদেশ ছাড়া তাদের যেকোনো পদক্ষেপ আইনের দৃষ্টিতে
বিতর্কিত হওয়ার সুযোগ ছিল। তদুপরি বিগত ১৬ বছরে যারা নানা কোটায় নিয়োগ ও পদোন্নতি
পেয়েছেন, তাদের নিয়ে বিতর্কের কারণে বিশেষত ৬৪ জন উপযুক্ত জেলা প্রশাসক খুঁজে পেতেই
জটিলতা সেনাবাহিনীকে প্রশাসনের ওপর নির্ভর করা থেকে মুক্ত করার বিষয়টি সামনে নিয়ে
আসে। এখন ফৌজদারি কার্যবিধির ৬৪ ধারাবলে একজন সেনা কর্মকর্তা এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে
তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারবেন। কার্যবিধির ৬৪ ও ৬৫ নম্বর ধারাবলে একজন সেনা অফিসার
এখন বিচারের উদ্দেশ্যে সরাসরি কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারবেন বা স্থানীয় পুলিশের কাউকেও
গ্রেপ্তারের জন্য আদেশ দিতে পারবেন।
বেসরকারি বাণিজ্যিক
ব্যাংকের পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে গোলাগুলি, রিকশা
ও গার্মেন্টস শ্রমিকদের পুঁজি করে অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি, মসজিদ, মন্দির, মাজার ও পাহাড়ে
ধংসযজ্ঞ কিংবা শিক্ষাঙ্গনে উত্তেজনা থামাতে সেনাবাহিনী প্রয়োগ করতে পারবে ফৌজদারি
কার্যবিধির ১২৭, ১২৮ ও ১৩০ নম্বর ধারা, যা পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তির সমন্বয়ে কোনো সমাবেশ
বা জটলা তাৎক্ষণিক ছত্রভঙ্গের বৈধতা দেয়। এভাবে সেনাবাহিনীকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭টি
ধারা প্রয়োগের সরাসরি এখতিয়ার যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে বলেই
সচেতন মহলের প্রত্যাশা। তবে এ ক্ষেত্রে শঙ্কা যে নেই, তা বলা যাবে না। কারণ সেনাবাহিনীর
সদস্যরা বিশেষত তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের অনেক ক্ষেত্রেই বিভ্রান্ত করে ফেলে সমাজে সাধুর
বেশে লুকিয়ে থাকা স্বার্থান্বেষী মহল ও দেশে থাকা শত্রুর ছদ্মবেশী এজেন্টরা।
নানা রকম সত্য,
অর্ধসত্য কিংবা মিথ্যা তথ্য দিয়ে তরুণ সেনাদের উত্তেজিত করে তাদের দিয়ে প্রকাশ্যে
অন্যদের হেনস্থা করার নাটক অতীতে বহুবার সাজানো হয়েছে। সেই ভিডিও শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘসহ
মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায়ও পাঠানো হয়েছিল। এবারও কেউ
কেউ র্যাবের মতো সেনাবাহিনীর ওপর অবরোধ আরোপের নীলনকশার অংশ হিসেবে ভিডিও বানাতে প্রস্তুত
হয়ে আছে বলেই অভিযোগ আছে। সেনাবাহিনীর এখতিয়ার নয় কিংবা ১৭টি ফৌজদারি কার্যবিধির
আওতায় পড়ে না এমন নানাবিধ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে প্রলুব্ধ করার বহু ইতিহাস সৃষ্টি
হতে পারে বা ইতিহাস রয়েছে সেনাবাহিনীতে। বিশেষত ভূমি দখল কিংবা পুনঃদখল, পাওনা টাকা
উদ্ধার, প্রতারণার কারণে এবং সুনির্দিষ্টভাবে বিদেশে পাঠানোর নামে আটকে যাওয়া টাকা
ফিরে পাওয়া, এমনকি যৌতুক ও পারিবারিক কলহ মিটিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে অবৈধ সুযোগসুবিধা
দেওয়ার প্রস্তাব আসাটা এ সময়কার স্বাভাবিক ঘটনা। সামরিক জীবনে যতবার সেনাবাহিনীকে
দীর্ঘদিন মাঠে থাকতে দেখেছি, ততবারই সেনানিবাসে ফিরে তদন্ত আদালত বসিয়ে বিচার করতে
হয়েছে লোভের কাছে নতিস্বীকার কিংবা ভুল করা সেনা সদস্যদের। আমাদের তরুণ সেনা অফিসাররা
এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন, সুশিক্ষিত ও চৌকশ। তারাও এ যুগের গর্বিত জেনজি। বাংলাদেশ
মিলিটারি অ্যাকাডেমি থেকে তারা এখন তিন বছরের প্রশিক্ষণ ও যুগোপযোগী বিষয়ে স্নাতক
ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর কর্মক্ষেত্রে সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষা তথা
স্নাতকোত্তর সনদের দিকে ধাবিত হন অধিকাংশ সেনা অফিসার।
জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কম্পিউটার প্রযুক্তি ও গাইডিং সিস্টেম সংযুক্ত মিসাইল, ড্রোন ও অন্যান্য কারিগরি সরঞ্জাম আমাদের সাধারণ সৈনিকরাই প্রতিনিয়ত পরিচালনা করেন। সুতরাং তাদের সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের সুফল অচিরেই ঘরে ঘরে পৌঁছাবে, এটা নিশ্চিত বলা যায়। বিশেষত বর্তমানে পুলিশের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রাপ্তিতে প্রতিকূলতার প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীকে প্রদত্ত ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার অবশ্যই আশাজাগানিয়া। তবে ‘পাওয়ার’ শব্দটিকে ক্ষমতার বদলে হাজারো শহীদের দেওয়া দায়িত্ব বা দেশ ও জাতিকে সেবা করার বিরল সুযোগ মনে করলেই সেনাবাহিনীর বর্তমান জেনজি তথা তরুণ সদস্যরা নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারবেন। জাতি বড় আশা নিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের জন্য শুভকামনা।