মব জাস্টিস
নাছিমা বেগম
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:৫৪ এএম
নাছিমা বেগম
সব অপরাধের জন্যই
আইনানুগ শাস্তি রয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অর্থ অপরাধীকেও তার সাজা শেষে পুনর্বাসন
প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাজে বসবাসযোগ্য মানসিকতার মধ্যে ফিরিয়ে দেওয়া। সেইসঙ্গে অপরাধ
যদি একেবারেই ঘৃণ্য হয় তাহলে তার চরম শাস্তি নিশ্চিত করা। সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার
জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। কিন্তু যখন অপরাধীর সাজা নিশ্চিতের জন্য আইন
প্রয়োগকারী সংস্থা কিংবা আদালতের দ্বারস্থ না হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া হয় তখন
তা কোনোমতেই মেনে নেওয়া যায় না। ২০ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে
প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে ‘মব জাস্টিস’ নিয়ে যে খবর দেখতে পাই তা উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে
তোলে। উদ্বেগাকুল করে তোলে। বিশেষত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সারা দেশে বড় পরিবর্তনের
এই সময়ে সুযোগসন্ধানী অনেকেই এক ধরনের অরাজকতার সুযোগ নিচ্ছেন। অনেকে নিজেই অযাচিতভাবে
আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন এবং করছেন অপরাধ। অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে উস্কে দিচ্ছেন
এমন অভিযোগও রয়েছে। সভ্য সমাজে এ ধরনের অপরাধ কল্পনাও করা যায় না। অথচ নিকট অতীতে যেমন
তেমন সাম্প্রতিক সময়েও আমরা এ প্রবণতাগুলোর মুখোমুখি হচ্ছি; যা সমাজেও নিম্নগামিতার
উদাহরণ তৈরি করছে। এমন প্রবণতা শক্তভাবে দমন করতে না পারলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্র।
মানুষের বেঁচে
থাকার অধিকার মানবাধিকার। মানুষের জীবন, অধিকার, সমতা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের
জন্য অত্যাবশ্যকীয় সুযোগসুবিধাগুলিই মানবাধিকার। এ অধিকার মানুষের জন্মগত। এগুলো কখনোই
কেউ কারও থেকে কেড়ে নিতে পারে না। মানুষের এ মৌলিক অধিকারগুলো স্বীকৃতি দিয়ে ১৯৪৮ সালের
১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গ্রহণ করা হয়। সেখানে মানুষের
মৌলিক মানবাধিকারগুলো চিহ্নিত করে বলা কথাগুলো পুরোটাই উদ্ধৃত করছিÑ‘যেহেতু মানব পরিবারের
সকল সদস্যের সমান ও অবিচ্ছেদ্য অধিকারসমূহ এবং সহজাত মর্যাদার স্বীকৃতিই হচ্ছে বিশ্বে
শান্তি, স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তি; যেহেতু মানবাধিকারের প্রতি অবজ্ঞা এবং
ঘৃণার ফলে মানুষের বিবেক লাঞ্ছিত বোধ করে এমন সব বর্বরোচিত ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এবং
যেহেতু এমন একটি পৃথিবীর উদ্ভবকে সাধারণ মানুষের সর্বোচ্চ কাঙ্ক্ষারূপে ঘোষণা করা হয়েছে,
যেখানে সকল মানুষ ধর্ম এবং বাক স্বাধীনতা ভোগ করবে এবং অভাব ও শঙ্কামুক্ত জীবনযাপন
করবে; যেহেতু মানুষ যাতে অত্যাচার ও উত্পীড়নের মুখে সর্বশেষ উপায় হিসেবে বিদ্রোহ
করতে বাধ্য না হয় সেজন্য আইনের শাসন দ্বারা মানবাধিকার সংরক্ষণ করা অতিপ্রয়োজনীয়;
যেহেতু জাতিসমূহের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উন্নয়নের প্রয়াস গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক;
যেহেতু সদস্য জাতিসমূহ জাতিসংঘের সনদে মৌলিক মানবাধিকার, মানবদেহের মর্যাদা ও মূল্য
এবং নারী-পুরুষের সমান অধিকারের প্রতি তাদের বিশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং বৃহত্তর
স্বাধীনতার পরিমণ্ডলে সামাজিক উন্নতি এবং জীবনযাত্রার উন্নততর মান অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ
হয়েছেন; যেহেতু সদস্য রাষ্ট্রসমূহ জাতিসংঘের সহযোগিতায় মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতাসমূহের
প্রতি সর্বজনীন সম্মান বৃদ্ধি এবং এদের যথাযথ পালন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্য অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ;
যেহেতু এ স্বাধীনতা এবং অধিকারসমূহের একটি সাধারণ উপলব্ধি এ অঙ্গীকারের পূর্ণ বাস্তবায়নের
জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণÑএজন্য এখন সাধারণ পরিষদ এ মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র
জারি করছে।’
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায়
কিছু মৌলিক অনুষঙ্গ রয়েছে। সুষ্ঠু আইন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করা তার একটি।
সমাজের সাধারণ মানুষ তো বটেই, একজন অপরাধীরও বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। বিচারিক এ
কাঠামো এমনভাবে বিন্যস্ত করা, যাতে কোনো একটি পক্ষই ন্যায়বিচার না পাওয়ার অভিযোগ তুলতে
পারে না। আইন এভাবেই চলে। ফলে আইনের শাসনকে আমরা বলি সুশাসন। সুশাসনের মাধ্যমেই সমাজে
স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায়। এজন্যই যখন কোনো ব্যক্তি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয় তখন
তার বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও আদালত যুক্ত হয়।
কিন্তু সাধারণ মানুষ যখন নিজে থেকে বিচারকার্যের দায়িত্ব নিতে শুরু করে তখন তা অরাজকতার
লক্ষণ। অনেক মানুষ গণপিটুনির শিকার হন। কারণ এখানে কেউ কোনো কিছু যাচাই করার চিন্তা
করে না। তারা মনে করে এটি এক ধরনের বিচার কিন্তু বাস্তবে তা নয়। ফলে যিনি পণপিটুনির
শিকার হন তার মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়। একজন নিহত হওয়ার পর তিনি তো বটেই তার পরিবার ও পার্শ্ববর্তী
সবকিছুতেই এর বড় প্রভাব পড়ে। এ প্রভাব কখনোই ইতিবাচক নয়। ফলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার
মাধ্যমেই বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত এবং অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
‘মব জাস্টিস’-এর
বর্বরতা নিয়ে সম্প্রতি উত্তপ্ত দেশের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোবাইল
ফোন চুরির সন্দেহে ফজলুল হক মুসলিম হলে মানসিক ভারসাম্যহীন তোফাজ্জল হোসেন নামে এক
যুবকের ওপর নির্মম অত্যাচার হয় এবং শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু ঘটে। এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৯তম আবর্তনের সাবেক শিক্ষার্থী শামীম মোল্লাকেও গণপিটুনি দেওয়া হয়।
পরে তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হলে অসুস্থ অবস্থায় নেওয়া হয় সাভারের একটি হাসপাতালে এবং
কর্মরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। একই সময়ে একই সঙ্গে দেশের দুটি উচ্চ বিদ্যাপীঠে
এমন বর্বরতা মেনে নেওয়ার অবকাশ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু আমাদের উচ্চশিক্ষার দ্বার এমনটি
ভাবলে ভুল হবে। বড় একটি ক্যাম্পাসে নানা ব্যবস্থা ও সুবিধার পাশাপাশি সৃজনশীলতার বিকাশ
ঘটানো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সবার জন্যই গর্বের। বিশেষত শিক্ষার্থীদের জন্যও আদর্শনীয়।
দেশে যেকোনো বড় আন্দোলন ও অন্যায়েও এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা
ও মানবিক মূল্যবোধের পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছেন। এর ফলেই একটি অভ্যুত্থান হয়েছে। কিন্তু
যখন দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠেই ‘মব জাস্টিস’-এর মতো ঘটনা ঘটে এবং সেখানেও বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষার্থীদের সংযোগ থাকে তখন তা দুঃখজনক।
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়
তো বটেই, শিক্ষার্থীদের ভাবমূর্তিও হয়েছে এবং ক্ষুণ্ন হচ্ছে। স্মরণে আছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়
বুয়েটেও আবরার ফাহাদকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। তবে ওই ঘটনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন
ছিল। কিন্তু এও ভেবে দেখতে হবে, কারা ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল? বুয়েটেরই শিক্ষার্থীরা
তাকে নির্যাতন করেছিলেন। আমরা জানি, বুয়েটে ভর্তি হওয়ার প্রক্রিয়া সহজ নয় এবং এ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে
অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থীরাই ভর্তি হন। কিন্তু মেধাবী এবং মানবিক মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা
চর্চার পরিবেশ না থাকলে অরাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হতে পারে তা আবরার হত্যাকাণ্ডে স্পষ্ট
হয়ে উঠেছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশ যখন সংস্কারের পথে হাঁটতে শুরু করেছে,
তখন সঙ্গত কারণেই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। তারা আশা করছে, এবার আইনের শাসন
প্রতিষ্ঠা এবং একই সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘন হওয়ার মতো ঘটনা বন্ধেরও সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়
কার্যক্রম শুরু হবে। কিন্তু সম্প্রতি মব জাস্টিসের ঘটনা বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনকেও
যখন উত্তাল করে ফেলে তখন সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে, পুরোনো ব্যবস্থা থেকে আমরা কতটা
বের হতে পেরেছি?
মানবাধিকার প্রসঙ্গে
সমাজের সচেতন অংশ সব সময়ই সোচ্চার। এমনকি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর সংস্কারের
মধ্যেও দেখা দিয়েছে এক ধরনের সদিচ্ছা। কিন্তু ওই সদিচ্ছার স্ফুরণও সাম্প্রতিক বর্বরোচিত
ঘটনাগুলোর মাধ্যমে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। কারণ, এ ধরনের হত্যাকাণ্ডে বিশেষত বিনা বিচারে
কাউকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধে সমাজের প্রতিটি অংশই উৎকণ্ঠিত। মানুষকে
বিচারবহির্ভূতভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনার পুনরাবৃত্তির মধ্য দিয়ে সমাজের অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায়
ভুগতে শুরু করছেন। অথচ মানবাধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হলে দেশের কোনো নাগরিকেরই নিরাপত্তাহীনতায়
ভোগার কথা নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র একটি কাঠামো। এই কাঠামোর ভেতরে থাকে নানা
শ্রেণি-পেশা ও মতের মানুষ। সেখানে আইনের শাসন নিশ্চিত না হলে সঙ্গত কারণেই আইনবহির্ভূত
ঘটনা ঘটে। এজন্য আমাদের আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। অপরাধীর
বিচার ব্যক্তির হাতে নয় বরং এজন্য রয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, রয়েছে বিচারিক আদালত।
কিন্তু এ কাঠামোর কাছে না গিয়ে মানুষই বিচার হাতে নিলে তা কোনোভাবেই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা
কিংবা সুশাসন প্রতিষ্ঠার নজির তৈরি হবে না। গণপিটুনি দিয়ে কাউকে হত্যা করা মানবাধিকার
কেন কোনো সভ্য সমাজেরই অংশ হতে পারে না। অন্তত সমাজের যৌথতার দৃষ্টিতে দেখলেও আমরা
এমনটি মেনে নিতে পারি না। ফলে আমাদের মর্মাহত হতে হয় এবং আইনের শাসন নিশ্চিতের মাধ্যমে
বিচার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে দাবি জানাতে হয়। তাই রাষ্ট্র
যেন দ্রুত এসব ঘটনার তদন্ত এবং সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করে এ দাবি সবার। আইনের শাসনই
পারে সমাজকে স্বাভাবিক করতে।
যেকোনো অপরাধ সংঘটিত হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শরণাপন্ন হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কোনো কোনো বাহিনীর কতিপয় সদস্যের বিরুদ্ধে যদিও নানা অভিযোগ রয়েছে তবুও তাদের দায়বদ্ধ ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে। যখন অপরাধ সংঘটিত হবে তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আইন প্রয়োগের প্রক্রিয়া দ্রুততর বাস্তবায়িত হয়েছে কি নাÑএ জবাবদিহি সমাজের সচেতন নাগরিক হিসেবে সবাই করতে পারেন। সমাজের এ যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সংস্কার করা সম্ভব। সরকারও তখন নানাভাবে এ ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার আনতে বাধ্য হবে। আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সোপর্দ করতে হবে। কোনো বিচারবহির্ভূত ঘটনাকেই সমর্থন দেওয়া যায় না। এগুলোকে অপরাধের দৃষ্টিতেই দেখতে হবে। আইন যেন কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে সেজন্য সামাজিক সচেতনতাও বাড়ানো জরুরি। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে মব জাস্টিস কোনো পক্ষ বা কতিপয় মানুষের ইন্ধনেই হয়ে থাকে। এ বিষয়গুলো সুশৃঙ্খলভাবে তদন্ত করে আইনের শাসন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতাও গড়া দরকার। তা না হলে আমাদের সমাজ গভীর অন্ধকারে নিপতিত হবে।