ওজোন স্তর
মো. অহিদুর রহমান
প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৫:৩১ পিএম
অস্বাভাবিকভাবে ক্লোরোফ্লুরোকার্বন ও ওজোন
স্তর ক্ষয়কারী গ্যাস উৎপাদন ও ব্যবহারের ফলে ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বিশ্বব্যাপী
উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটেই চলেছে। ভূপৃষ্ঠ এতটাই উত্তপ্ত হচ্ছে যে, সামগ্রিকভাবে
বদলে গেছে আবহাওয়া, প্রকৃতি ও পরিবেশ। ১৯৮৫ সালে বিশ্বের সরকারগুলো ওজোন স্তর সংরক্ষণের
জন্য ভিয়েনা কনভেনশন গ্রহণ করেছিল। এর দুই বছর পর ১৯৮৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর কানাডার
মন্ট্রিলে ২৪টি দেশ স্বাক্ষর করে ওজোন স্তর ধ্বংসকারী ক্লোরোফ্লুরোকার্বন নিঃসরণ সীমাবদ্ধ
রাখার একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে। চুক্তি অনুযায়ী ১৯৯৪ সালের মধ্যে তা শতকরা ২৯ ভাগ
কমানো হবে, ১৯৯৯ সালের মধ্যে ৫০ ভাগ এবং ২০০০ সালের মধ্যে ক্লোরোফ্লুরোকার্বন সম্পূর্ণ
নিষিদ্ধ করা হবে। তারপর আরও আটবার চুক্তিটি সংশোধন করা হয়েছে। বর্তমানে ১৯৫টি দেশ এ
চুক্তি মেনে চলার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ। ২০১৬ সালের অক্টোবরে রুয়ান্ডার কিগলিতে মন্ট্রিল
প্রটোকল ২৮তম সভার সংশোধনে সিদ্ধান্ত হয় হাইড্রোফ্লুরোকার্বনের ব্যবহার অস্থায়ীভাবে
পরিচালিত হবে।
প্রতি বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক
ওজোন স্তর সুরক্ষা দিবস পালিত হয়। এবারও হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে পালিত একটি সচেতনতা
দিবস। ওজোন স্তরের ক্ষয় ও এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী গণসচেতনতা তৈরিতে
দিবসটি পালন করা হয়। ১৯৮৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর ক্ষয়ের জন্য দায়ী
দ্রব্যগুলোর ব্যবহার নিষিদ্ধ বা সীমিত করার জন্য ভিয়েনা কনভেনশনের আওতায় ওজোন ধ্বংসকারী
পদার্থের ওপর মন্ট্রিল প্রটোকল গৃহীত হয়। এ দিনের স্মরণে ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ
পরিষদ ১৬ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সুরক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০২৪
সালের ওজোন স্তর সুরক্ষা দিবসের প্রতিপাদ্য ছিলÑ জীবনের জন্য ওজোন : বৈশ্বিক সহযোগিতার
৩৫ বছর। ২০২৩ সালে প্রতিপাদ্য ছিল মন্ট্রিল প্রটোকল : ওজোন স্তর ঠিক করা এবং জলবায়ু
পরিবর্তন হ্রাস করা। ২০২২ সালে ছিল বিশ্বব্যাপী সহযোগিতা : পৃথিবীতে জীবন রক্ষা করে।
২০২১ মন্ট্রিল প্রটোকল : আমাদের খাবার ও ভ্যাকসিনগুলোকে ভালো রাখে। ২০২০ সালের প্রটোকল
: জীবনের জন্য ওজোন : ৩৫ বছর ওজোন স্তর সুরক্ষা করো। ২০১৯ সালে ছিলÑ৩২ বছরে ওজোন স্তর
নিরাময়। ২০১৮ সালে ছিলÑঠান্ডা রাখুন এবং চালিয়ে যান।
২০১৭ সালে মন্ট্রিল প্রটোকল ছিলÑসূর্যের
নিচে সমস্ত জীবনের যত্ন নাও। ২০১৬ সালে ছিলÑওজোন এবং জলবায়ু : বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে
সুরক্ষা করা। এর পূর্ববর্তীগুলো ছিল- ২০১৫ সালেÑএকসঙ্গে ওজোন নিরাময়ের ৩০ বছর। ২০১৪
সালেÑওজোন স্তর সুরক্ষা : মিশন চলছে। ২০১৩ সালেÑএকটি সুস্থ পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ আমাদের
কাম্য। ২০১২ সালেÑআগমী প্রজন্মের জন্য আমাদের পরিবেশ রক্ষা করা। ২০১১ সালেÑএইচসিএফসি
ফেজ আউট : একটি অনন্য সুযোগ। ২০১০ সালেÑওজোন স্তর সুরক্ষা : সর্বোত্তমভাবে শাসন ও সম্মতি।
২০০৯ সালেÑসর্বজনীন অংশগ্রহণ : ওজোন সুরক্ষা বিশ্বকে একত্রিত করে। ২০০৮ সালেÑমন্ট্রিল
প্রটোকল : বৈশ্বিক সুবিধার বিশ্বব্যাপী অংশীদারি। ২০০৭ সালেÑঅগ্রগতির ২০ বছর পালন করা।
২০০৬ সালেÑওজোন স্তর রক্ষা করে পৃথিবীর জীবন বাঁচান। ২০০৫ সালেÑওজোনের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ
আচরণ করুন; সূর্য থেকে নিরাপদ থাকুন। ২০০৪ সালেÑআমাদের আকাশ বাঁচান : ওজোন বন্ধুত্বপূর্ণ
গ্রহ। ২০০৩ সালেÑআমাদের আকাশ বাঁচান : শিশুদের জন্য অনেক কিছু করার আছে। ২০০২ সালেÑআকাশ
বাঁচান নিজেকে রক্ষা করুন। ২০০১ সালেÑআকাশ রক্ষা করে শিশুদের রক্ষা করি। ২০০০ সালেÑওজোন
স্তর ভালো রাখো : আমাদের শিশুদের জন্য আরও অনেক কিছু করার আছে্ ১৯৯৯ সালেÑওজোন স্তর
সুরক্ষার ৪০ বছর। ১৯৯৮ সালেÑওজোন স্তর রক্ষা বৈশ্বিক দায়িত্ব। ১৯৯৭ সালেÑওজোন একটি
বৈশ্বিক সম্পদ। ১৯৯৬ সালেÑআল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির সাথে যুদ্ধ করে ওজোন স্তর রক্ষা করো।
১৯৯৫ সালেÑওজোন সুরক্ষা একটি বৈশ্বিক দায়িত্ব। প্রতি বছরই এ রকম সুন্দর সুন্দর প্রতিপাদ্য
থাকে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
জলবায়ুর পরিবর্তনে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি
পেলে অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলে ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে ২
মিটারের কাছাকাছি। সে ক্ষেত্রে এশীয় অঞ্চলের নিম্ন এলাকা অস্তিত্বসংকটে পড়বে। ওজোন
গ্যাস সম্পর্কে সর্বসাধারণের খুব একটা ধারণা নেই। এ ছাড়া অধিকাংশ মানুষ বিষয়টির বিপরীত
বোঝে। ওজোন স্তর তীব্র গন্ধযুক্ত হালকা নীল বর্ণের গ্যাসীয় পদার্থ। এটি ক্ষতিকর গ্যাস
হলেও পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে। ফলে বলা যায়, এটি হচ্ছে প্রকৃতির
পর্দা বা পৃথিবীর ছাদ। যে পর্দা বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে অথবা ভূপৃষ্ঠে
বিকিরণ ঘটাতে বাধা সৃষ্টি করে। মোট কথা ওজোন স্তর হচ্ছে পৃথিবীর ফিল্টার। সূর্যও প্রায়
১ লাখ ১৫ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছেঁকে বিশুদ্ধ করে পৃথিবীর জন্য প্রায় ১০-৪২
ডিগ্রি সেলসিয়াস পাঠায়, যা আমাদের কাছে সুষম তাপমাত্রা হিসেবে পরিচিত।
বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর প্রতিনিয়তই ক্ষতিকর
অতিবেগুনি রশ্মিগুলো প্রতিহত করে পৃথিবীর প্রাণিকুল রক্ষা করছে। ওজোন স্তর হচ্ছে পৃথিবীর
বায়ুমণ্ডলের একটি স্তর, যেখানে তুলনামূলকভাবে বেশি মাত্রায় ওজোন গ্যাস থাকে। এ স্তর
থাকে প্রধানত স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের নিচের অংশে, যা ভূপৃষ্ঠ থেকে কমবেশি ২০-৩০ কিমি ওপরে
অবস্থিত। ওজোন স্তরে ওজোনের ঘনত্ব কম হলেও প্রাণিজগতের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সূর্য অতিবেগুনি রশ্মি মানবদেহের ত্বক এমনকি হাড়ের ক্যানসারসহ
অন্যান্য মারাত্মক ব্যাধি সৃষ্টি করে। এ ক্ষতিকর রশ্মি পৃথিবীর জীবজগতের সব প্রাণের
প্রতি হুমকিস্বরূপ। কারণ বায়ুমণ্ডলে এখনও প্রচুর সিএফসি গ্যাস রয়ে গেছে, যা শোষণ করে
নিঃশেষ করতে হলে আমাদের প্রচুর বনায়ন সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি অবশ্যই সিএফসি গ্যাস
নির্গমন পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইড
গ্যাসের নির্গমন। অর্থাৎ কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে।
শিল্পোন্নত দেশগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা, নির্বিচার গাছপালা নিধন ও কালো ধোঁয়ার প্রকোপ বন্ধ করতে হবে। এসব নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ক্রমে বৃদ্ধি পাব, যার প্রমাণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ঘন ঘন বজ্রপাত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ নানান দুর্যোগের শিকার হচ্ছে বিশ্ববাসী। বনায়ন সৃষ্টির ক্ষেত্রে তালগাছকে প্রাধান্য দিতে হবে। কারণ তালগাছ বজ্রনিরোধকের ভূমিকা রাখে। আসুন, বনায়নের পরিসর বাড়িয়ে আমরা বজ্রপাত ঠেকাই এবং কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনে বায়ুমণ্ডলে ওজোন স্তর রক্ষা করি। পাশাপাশি শিল্পোন্নত দেশগুলোর শুভবুদ্ধি কামনা করছি, যাতে সিএফসি গ্যাসের উৎপাদন বন্ধ করে ওজোন স্তরকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।