১২ রবিউল আউয়াল
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০০:৪৯ এএম
জুলুম
একটি বড় পাপ। জুলুম অতীতের নেক আমল নষ্ট করে দেয়, ভবিষ্যতের জন্য ডেকে আনে কঠিন পরিণতি।
জুলুমের কারণে লোকে ঘৃণা করে, মজলুম বদদোয়া করে। সর্বোপরি আল্লাহর অসন্তুষ্টি নেমে
আসে জুলুমের কারণে। জুলুমের শাস্তি ও পরিণতিও সুদূরপ্রসারী। দুনিয়া ও আখেরাত, সবখানে
জুলুমকারী শাস্তি পেতে থাকে।
জুলুম
একটি সামাজিক ব্যাধি। অন্যের ওপর অবিচার করে নিজের পতন ও ধ্বংস ডেকে আনে জালেমরা। আপদ-বিপদ
ও দুর্যোগ-বিশৃঙ্খলায় আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো জুলুম। তাই আল্লাহতায়ালা
সবাইকে তা থেকে নিষেধ করেছেন। অত্যাচারিত ব্যক্তির অন্তরের আকুতি মহান আল্লাহর কাছে
খুব দ্রুত পৌঁছে যায়। হজরত রসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া আল্লাহর
কাছ থেকে ফেরত আসে না। এক. ইফতারের সময় রোজাদারের দোয়া। দুই. ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া।
তিন. মজলুমের দোয়া। আল্লাহতায়ালা তাদের দোয়া মেঘমালার ওপরে তুলে নেন এবং তার জন্য আসমানের
দরজাগুলো খুলে দেন। মহান রব বলেন, আমার সম্মানের শপথ, কিছুটা বিলম্ব হলেও আমি তোমাকে
অবশ্যই সাহায্য করব।’Ñ জামে তিরমিজি : ৩৫৯৮।
ইবনে
আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (স.) যখন হজরত মুয়াজ (রা.)-কে ইয়েমেনে শাসক হিসেবে
পাঠান এবং তাকে বলেন, মজলুমের ফরিয়াদকে ভয় করবে। কেননা তার ফরিয়াদ এবং আল্লাহর মধ্যে
পর্দা থাকে না। সহিহ বোখারি : ২৪৪৮।
কেউ
কারও ওপর জুলুম করলে ইহকালেই এর শাস্তি পেতে হয়। কোনোভাবে ইহকালে পার পেয়ে গেলেও পরকালে
অবশ্যই এই জুলুমের প্রতিশোধ নেওয়া হবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
হজরত রসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রমহানি বা অন্য কোনো বিষয়ে
জুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার কাছ থেকে মাফ করিয়ে নেয়, ওইদিন আসার আগে, যে
দিন তার কোনো দিনার বা দিরহাম থাকবে না। সেদিন তার কোনো সৎকর্ম না থাকলে তার জুলুমের
পরিমাণ তা তার কাছ থেকে নেওয়া হবে আর তার কোনো সৎকর্ম না থাকলে তার প্রতিপক্ষের পাপ
হতে নিয়ে তা তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।Ñ সহিহ বোখারি : ২৪৪৯।
উল্লিখিত
হাদিসগুলোতে রয়েছে মানুষের জন্য শিক্ষা। এসব শিক্ষা জীবনে ধারণ করলে, সমাজ হবে শান্তিময়
ও বৈষম্যহীন। যে কাঙ্ক্ষিত সমাজ প্রতিষ্ঠার পেছনে মানুষ ছুটছে, পথঘাটে কষ্ট করছে, ইতিহাসে
রচিত হচ্ছে নানা উপাখ্যান।
আমরা
জানি, পৃথিবীর নানা পেশার, নানা যোগ্যতার, নানা রুচি-প্রকৃতির অসংখ্য মানুষ সবাই ব্যস্ত।
কেউ কথায় ব্যস্ত, কেউ কাজে ব্যস্ত, কেউবা ব্যস্ত চিন্তাভাবনায়, কর্মপরিকল্পনায়। দৃশ্যত
অতি বিচিত্র ও বিক্ষিপ্ত হলেও জীবনব্যাপী আমাদের এই ব্যস্ততা কিন্তু সাধারণ কিছু বিষয়কে
কেন্দ্র করেই আবর্তিত। সময়ের স্রোতে এভাবেই চলছে আমাদের জীবন।
ভেবে
দেখার বিষয় হলো, দিন-রাতের এই প্রাকৃতিক নিয়মে, নিদ্রা ও জাগরণের এই প্রাত্যহিকতায়,
কোলাহল-নীরবতার আমাদের জীবনকে কে বন্দি করলেন? জীবনের সব বিক্ষিপ্ততাকে কে এভাবে বিন্যস্ত
করলেন? যা অতিক্রম করে যাওয়ার সাধ্য আমাদের নেই। অতিক্রম চেষ্টায় কোনো লাভ নেই।
তিনি
আল্লাহ। আমাদের রব। গোটা সৃষ্টিজগতের প্রভু-পরওয়ারদেগার। তার প্রভুত্বের ছাপ খোদাই
করা আছে বিশ্বময়। তার ইচ্ছা ও আদেশের অধীন আমরা সবাই। যে মহান মালিক আমাদের জীবনের
সবকিছুকে আবদ্ধ ও সুবিন্যস্ত করেছেন এক অদৃশ্য প্রাকৃতিক সূত্রে, তিনিই দান করেছেন
আমাদের জীবন ও কর্মের এক অনন্য আদর্শিক সূত্র। তা হচ্ছে দ্বীন ইসলাম।
আমাদের
জীবনের সবক্ষেত্রে তা যত বিচিত্র হোক, সব কাজকর্মে, তা যত বিক্ষিপ্ত হোক; রয়েছে ইসলামের
সঠিক নির্দেশনা। আমাদের ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন, সবক্ষেত্রেই
আছে ইসলামের সুমহান নীতি ও আদর্শ, যে আদর্শের অনুসরণে জীবনের সব ব্যস্ততা, তার সব বৈচিত্র্য
সত্ত্বেও, ভেতরে-বাইরে এক কল্যাণ-আদর্শের ছাঁচে-ঢালা হয়ে যায়। জীবনব্যাপী নানাবিধ কর্মতৎপরতার
খণ্ড খণ্ড অংশগুলো একত্র হয়ে অখণ্ডরূপ লাভ করে। জীবনের গতি হয় একমুখী। অর্থাৎ মহান
আল্লাহমুখী।
জীবন
ও কর্মের এই একমুখিতা মানুষকে দান করে এক অনির্বচনীয় প্রশান্তি। বিক্ষিপ্ততা, বিচ্ছিন্নতা
ও লক্ষ্যহীনতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়ে, মানুষ লাভ করে এক বেহেশতি অনুভূতি, যার তুলনা
এই মাটির পৃথিবীর আর কোনো কিছুর সঙ্গে হতে পারে না। মানুষের মুক্ত-স্বাধীন, পরিতৃপ্ত
হৃদয় থেকে তখন উৎসারিত হয়Ñ আলহামদুলিল্লাহ।
এই
পবিত্র আদর্শ আল্লাহতায়ালার অতি বড় দান। মানুষের জীবনধারণের জন্য তিনি চারপাশের প্রকৃতিতে
সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য উপাদান তিনিই মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের জন্য দান করেছেন সুমহান
আদর্শ দ্বীন ইসলাম। মহান দ্বীন যে মহামানবের সূত্রে আমরা লাভ করেছি, তিনি আমাদের প্রিয়নবী
হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তার ওপর কোরবান আমাদের জানমাল সবকিছু।
কোরবান আমাদের সব স্বজন-প্রিয়জন-প্রিয় বস্তু।
তিনি
আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। সমগ্র মানবতার মুক্তির দূত। এই পৃথিবীর শেষ পর্যন্ত তার আনীত
আদর্শই অনুসরণীয়-অনুকরণীয়। তারই ওপর নাজিল হয়েছে সর্বশেষ আসমানি কিতাব কোরআনে কারিম।
আর তার পবিত্র জীবন ও কর্ম হচ্ছে কোরআনে করিমের প্রায়োগিক ব্যাখ্যা। তার পবিত্র সিরাত
কিয়ামত পর্যন্ত সব আল্লাহমুখী বান্দার চোখের জ্যোতি, আত্মার দ্যুতি, হৃদয়ের আলো, জীবন
ও কর্মের আলোকবর্তিকা। মানবজাতির জন্য তিনি মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত।
তার
ওপর ঈমান আনা ছাড়া কেউ মুমিন বলে গণ্য হয় না। তার সুন্নাহর অনুসরণ ছাড়া কোনো ইবাদত,
ইবাদত হিসেবে গণ্য হয় না। তার অনুসরণ ছাড়া কোনো ভালো কাজ নেক আমল হয় না। তার জীবনাদর্শের
অনুসরণ ছাড়া কোনো জীবন আদর্শ জীবন হয় না। তাকে ভালোবাসা ঈমানের অঙ্গ। তার আনুগত্য আল্লাহর
নৈকট্য অর্জনের উপায়। তার পবিত্র জীবনের অনুসরণ দুনিয়া-আখেরাতে সফলতার চাবিকাঠি।
কেমন
ছিলেন তিনি, যার সাহচর্য ও স্পর্শে দিকে দিকে জ্বলে উঠেছে হেদায়েতের অনির্বাণ শিখা।
যে আদর্শের অনুসরণে জীবন হয় আল্লাহমুখী, জীবনের সব কাজকর্ম আল্লাহমুখিতার আলোকিত সূত্রে
সুবিন্যস্ত হয়; তিনি সেই আদর্শের শ্রেষ্ঠ নমুনা। তার জীবনেই রয়েছে উত্তম আদর্শ, তার
আদর্শ অনুকরণেই মুক্তি। তিনি সবার জন্য অনুসরণীয় ও মুক্তির কান্ডারি। পবিত্র কোরআনে
মহান আল্লাহ এভাবে ঘোষণা দিয়েছেন, ‘হে রসুল! তুমি লোকদের বলে দাও, যদি তোমরা আল্লাহকে
ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহও তোমাদের ভালো বাসবেন।’ Ñ সুরা আলে
ইমরান : ৩১