আঞ্চলিক সম্পর্ক
ড. ফরিদুল আলম
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৪:১১ পিএম
আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৪:১২ পিএম
দক্ষিণ এশিয়ার তিন বৃহৎ শক্তি ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। বৈশ্বিক রাজনীতি এবং ভূকৌশলগত কারণে বৃহৎ শক্তিবর্গের কাছে এ তিন দেশেরই বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে তিক্ততার বহুমাত্রিকতা এবং ১৯৭১-পরবর্তীতে পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্ক এক অম্লমধুর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। অথচ জনসংখ্যার বিবেচনায় বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষের বসবাস এ অঞ্চলে। ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগর তীরবর্তী হওয়ায় বিশ্ববাণিজ্য এবং শক্তির ভর রক্ষার ক্ষেত্রেও এ অঞ্চলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষাই ছিল এ অঞ্চলের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সূত্র। বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরে ১৯৮৫ সালে এ অঞ্চলের মোট সাতটি দেশ মিলে গঠন করে দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)। প্রতিষ্ঠার পর বেশ কয়েক বছর নিয়মিত শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে কিছুটা হলেও সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই খুঁড়িয়ে চলা শুরু হয় এ সংস্থাটির।
৩০ বছরের মাথায় আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে না গেলেও সার্কের কর্মকাণ্ডে অচলাবস্থা নেমে আসে, যা এখনও বিরাজ করছে। যদিও এ সংস্থাটির প্রতিষ্ঠার পেছনের মূল উদ্যোগটি গ্রহণ করা হয়েছিল বাংলাদেশের পক্ষ থেকে, একপর্যায়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় দ্বন্দ্বের রেশ এসে পড়ে অন্য দেশগুলোর মধ্যেও। মূলত ভারতের অনাগ্রহের ছায়া এসে পড়ে অন্য দেশগুলোয়। ফলে ভারত যে এ অঞ্চলে একক কর্তৃত্বের অধিকারী হয়ে উঠেছে, তা-ও বলার উপায় নেই, কারণ বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় চীনের রাজনৈতিক অভিসন্ধির ছায়া ভর করেছে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে। জনসংখ্যা, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সামর্থ্য; সর্বোপরি অবস্থানগত কারণে যখন বিশ্বে বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে, এমন অবস্থায় ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় সম্পর্ক কীভাবে নতুন করে ঢেলে সাজানো যায় এ নিয়ে আলোচনার সময় এসেছে বলে মনে করা যায়।
এও ঠিক যে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সরকার পরিবর্তনের পর ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার অবকাশ রয়েছে। দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের মধ্যে বর্তমানে যে অস্বস্তি কাজ করছে এর মূলে রয়েছে ক্ষমতা হারিয়ে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। যদিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে কোনো অনুরোধ জানানো হয়নি, তার পরও বিষয়টি নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে এ মুহূর্তে এক ধরনের ভারতবিরোধী মনোভাব কাজ করছে, যা দিল্লির জন্যও অস্বস্তিকর। বিভিন্ন সূত্রের খবরে যা জানা যাচ্ছে, ভারত এ বিষয়টি নিয়ে এখনও এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে আছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগসহ আর্থিক অনেক বিষয়ে বাংলাদেশের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা ব্যাপক। এটা সত্য, শেখ হাসিনার সরকারের কাছ থেকে তারা যে ধরনের সুযোগসুবিধা পেয়ে আসছিল, সেসব অনেকাংশেই ভারতের জন্য চাওয়াপাওয়ার মতো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আবার অন্যদিকে এও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের নিবিড়তাও ছিল, যা শেখ হাসিনার সরকারের শেষ কয়েক বছরের মধ্যে অনেকটা বাংলাদেশকে পেয়ে বসার মতো অবস্থায় পরিবর্তিত হয়ে যায়। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে সংগত কারণেই এসব আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশকে দিয়ে ভারত তাদের উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যের নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা পেলেও বাংলাদেশের চাওয়া তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি ঝুলিয়ে রেখেছে ১৫ বছর ধরে। এক বছর ধরে যখন তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে চীনের তরফ থেকে বিকল্প প্রস্তাব পাওয়া গেল, এমন অবস্থায় এসে একই প্রস্তাব ভারতের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশকে দেওয়া হলে ভারতই সবুজ সংকেত পায়। ফলে যা দাঁড়ায় তা হলো, দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের মধ্যে সমতলভূমি বলতে আর কিছুই থাকল না। কূটনীতিতে দরকষাকষি বলে একটি কথা আছে, যা বাংলাদেশ সঠিকভাবে বিগত দিনে ভারতের কাছ থেকে আদায় তো করতেই পারল না, উপরন্তু দেড় দশকের বেশি সময় ধরে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য বৃহৎ রাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দূরত্ব সৃষ্টি করেছে। নতুন সরকারের সামনে এটা এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী, তাদের সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরস্পর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যু আছে, এটা যেমন সত্য আবার এও সত্য যে, পাকিস্তানের সঙ্গে এতদিন ধরে সম্পর্কের যে শৈথিল্য বিরাজমান তার পেছনের যে কারণগুলো রয়েছে, সেগুলো নিরাময় করতে পারলে উভয়ের সঙ্গেই একটা কার্যকর সম্পর্কে উপনীত হয়ে আমাদের নিজ স্বার্থের জন্য বিকল্প রাখা যায়। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে যুগপৎভাবে বাংলাদেশ সুসম্পর্ক বজায় রাখবে নাকি ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার বর্তমান সম্পর্ক এগিয়ে নিতেই বেশি উদ্যোগী হবে, এটা এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সদ্যোসাবেক সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজন বেশি অনুভব করার ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দৃশ্যমান অবনতি ঘটে। এ ক্ষেত্রে এ বিষয়ে দ্বিধার কোনো অবকাশ নেই যে, ভারতের চিরশত্রু পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের অবনতিশীল সম্পর্কের পেছনে বাংলাদেশের তরফ থেকে অধিক তাগিদ অনুভূত হওয়ার মূল কারণ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি এবং বাংলাদেশের তিন দিক বেষ্টিত ভারতের মন জয় করে চলার নীতি অনেকাংশেই দায়ী। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পাকিস্তানের তরফ থেকে এ সম্পর্ক উন্নয়নে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অনীহার কারণে বিষয়টি খুব বেশিদূর এগোতে পারেনি।
সম্প্রতি সরকার পরিবর্তনের পর পাকিস্তানের তৎপরতা থেকে অনুমান করা যায় ভূকৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় তারা নতুন সরকারের সঙ্গে একত্রে কাজ করতে বেশ আগ্রহী। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ প্রধান উপদেষ্টাকে অভিনন্দন জানিয়ে সমাজমাধ্যম এক্সে বার্তা পোস্ট করেন। ৩০ আগস্ট নিজে ফোন করে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলে একত্রে কাজ করার আগ্রহের কথা জানান। এর মধ্যবর্তী সময়ে এবং পরেও বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার প্রধান উপদেষ্টা এবং সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই সঙ্গে পাকিস্তানিদের জন্য বাংলাদেশের ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং সরাসরি ফ্লাইট চালু করার অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে ফোন করে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খোঁজখবর নেন। এরই মধ্যে পাকিস্তানের হাইকমিশনসূত্রে জানানো হয়েছে, পাকিস্তানের ভিসা প্রক্রিয়ার জন্য বাংলাদেশিদের কোনো ফি দিতে হবে না।
এদিকে পাকিস্তান সরকারের তরফ থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন করে সুসম্পর্ক সৃষ্টির জন্য এক বিশেষ কৌশলপত্র তৈরি করে তা প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। দুই দেশেরই স্বার্থ সংরক্ষিত হয় এমন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কয়েকটি বিষয় নিয়ে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। প্রথমত. আটকে পড়া বিহারি, যাদের সংখ্যা ৭১-পরবর্তীতে আড়াই লাখ থেকে বর্তমানে কমপক্ষে ২০ লাখে উন্নীত হয়েছে এবং দ্বিতীয়ত. পাকিস্তান সরকারের কাছে বাংলাদেশের পাওনার বিষয়টি, যার পরিমাণ ২৫০ কোটি ডলার। এসব বিষয় নিয়ে পাকিস্তানের কাছ থেকে সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিষয়টি নিয়ে গভীর মনোযোগ দিচ্ছেন বলে অনুমান করা যায়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আসন্ন অধিবেশনের ফাঁকে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার সাইডলাইন বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদিও চান দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অব্যাহত থাকুক। বাংলাদেশের নতুন সরকার গঠনের পর তিনিই প্রথম এক্স হ্যান্ডলের মাধ্যমে সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। তবে বাংলাদেশ এ অঞ্চলে একটি ভারসাম্যমূলক কূটনীতির প্রচেষ্টা হিসেবে সার্কের পুনরুজ্জীবনের পক্ষে। এর মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে যদি সহযোগিতার ক্ষেত্রটি নতুন করে শুরু করা যায়, তাহলে কেবল ভারত বা পাকিস্তানই নয়, উপকৃত হবে সার্কের প্রতিটি দেশ। নতুন সময়ে এসে নতুন বাস্তবতায় ভারতের দিক থেকে যেমন সম্পর্কটি ধরে রাখার তাগিদ রয়েছে, তেমন পাকিস্তানের দিক থেকেও বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন করে শুরু করার তাগিদ রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে আগামী দিনগুলোয় দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে।