বদরুল হুদা সোহেল
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৩:৫৯ পিএম
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি মাসই কোনো না কোনো কারণে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন মর্মন্তুদ ঘটনার তাৎপর্য বহন করে। সঙ্গত কারণে সেপ্টেম্বর মাসটিও স্বাধীনতার আজ ৫৩ বছর পরও আমাদের হৃদয়ের স্মৃতিপটে ভিন্নরূপে উঁকি দেয়। তখনকার মুক্তিযুদ্ধে আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু মানবতাবাদী মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ ১৯৭১ সালে আমাদের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার মর্মবাণী নিয়ে রচনা করেন ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতা। ১৫২ লাইন নিয়ে রচিত কবিতাটি এতটা প্রাঞ্জল ও জীবন্ত যে, এখনও একজন সাধারণ পাঠক কবিতাটি পাঠ করলে পাকিস্তানিদের নির্মম ও নৃশংস গণহত্যার চিত্র তার চোখের সামনে ভেসে উঠবে। সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড কবিতার প্রতিটি লাইন যেন পূর্ব পাকিস্তানের আপামর নিরীহ জনসাধারণের দুর্ভোগ ও যন্ত্রণার এক একটি মহাকাব্য।
১৯২৬ সালের ৩ জুন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিতে জন্ম নেওয়া এ কবির অনবদ্য সৃষ্টি ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি পাকিস্তানি আগ্রাসন ও নির্যাতনের এক নীরব সাক্ষী। অ্যালেন গিন্সবার্গ ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। ছোটবেলা থেকেই তিনি যুদ্ধবিরোধী ছিলেন এবং এ যুদ্ধবিরোধী নীতি ও শ্রমজীবীদের অধিকার নিয়ে প্রায়ই দ্য নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় চিঠি লিখতেন। ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতার শিরোনাম যে গভীর অর্থ বহন করে তা ব্যাখ্যা করলে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে আমরা কী পরিমাণ নির্যাতিত হয়েছি তার খণ্ডচিত্র আমাদের স্মৃতিপটে ভেসে আসবে।
১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে অতিবৃষ্টির করণে এ রোড পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কবি গিন্সবার্গ অতিকষ্টে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে নৌকাযোগে বাংলাদেশের যশোর সীমান্তে আসেন। ক্ষুধার্ত শিশু ও গৃহহীন বাবা-মায়ের কষ্টের দৃশ্য স্বচক্ষে দেখে কবি গিন্সবার্গ গভীরভাবে মর্মাহত ও ব্যথিত হন। তাই যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের প্রতি ধিক্কার ও প্রতিবাদ জানিয়ে এ কবিতাটি রচনা করেন। তিনি শুধু কবিতা লিখেই ক্ষান্ত হননি। তিনি তার বন্ধু বব ডিলানকে (পরে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত) নিয়ে কবিতাটিতে সুর দিয়ে গানে রূপান্তর করেন। বব ডিলান, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, জর্জ হ্যারিসনসহ তারা কনসার্ট আয়োজন করে মানবতাবাদী এ ধরনের গান গেয়ে বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য আর্থিক ফান্ড সংগ্রহ করেন। পরে এ কবিতাটি তার ‘দ্য ফল অব আমেরিকা’ বইতে স্থান পায়।
যুদ্ধ নয় শান্তি-এ নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন গিন্সবার্গ। শুধু আমাদের ’৭১-এর বিভীষিকাময় দিনের সহযাত্রী নন, ১৯৬০ সালেও তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেন। আমেরিকার অনেক জনপ্রিয় শিল্পীকে নিয়ে আয়োজিত এ কনসার্ট অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি প্রোগ্রামটি সারা বিশ্বকে নাড়া নিতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মানুষ প্রতিটি মুহূর্ত ও দিন কীভাবে কষ্টের মাধ্যমে কাটিয়েছিল, কীভাবে তারা খাদ্যের জন্য হাহাকার করেছিল, কোথায় তারা ঘুমিয়েছিল এবং কীভাবে মৃত্যুবরণ করেছিল সে দৃশ্যই তুলে ধরেছেন গিন্সবার্গ তার কবিতায়।’৭১-এ ভারতের কলকাতায় ও বাংলাদেশের যশোর সীমান্তে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১০ লাখ শরণার্থীর দুর্দশা লাঘবে কাজ করা অ্যালেন গিন্সবার্গের কাছে আমরা ঋণী।
দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে থেকে অ্যালেন গিন্সবার্গের মতো যারা আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের গতি ত্বরান্বিত করেছেন তাদের ঘটনা ইতিহাসের পাতায় এমনভাবে রাখতে হবে যেন কালের স্রোতে কখনও তা বিলীন হয়ে না যায়। লাখো শহীদের রক্ত, অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রম, সন্তানহারা মায়ের কান্না আর আর্তনাদ এবং বাস্তুহারা মানুষের আহাজারিসহ সবকিছুর সঙ্গে যোগ হওয়া অ্যালেন গিন্সবার্গের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও সহযোগিতার বিনিময়ে আজ আমাদের এ স্বাধীন বাংলাদেশ। আর তাই ১৯৯৭ সালের ৫ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রে পরলোকগমন করলেও বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু অ্যালেন গিন্সবার্গ এখনও মিশে আছেন আামাদের স্বাধীনতার সত্তায়।