× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ

প্রেক্ষাপট তৈরির উৎসে কঠোর দৃষ্টি দিন

ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১০:০৫ এএম

ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ

ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ

১০ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘাতের জেরে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পরবর্তী জননিরাপত্তার সংকটজনিত পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে সংঘবদ্ধ দালালচক্র। উল্লেখ্য, সরকার পতনের পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা কমে যায়। এই ঢিলেমির সুযোগ নিয়ে অনেকে রোহিঙ্গাদের দেশে অনুপ্রবেশ করতে সাহায্য করছে বলে জানা যায়। ৯ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়, সীমান্তবর্তী ৩০টি পয়েন্ট দিয়ে এই অনুপ্রবেশ ঘটছে। গত ৫ আগস্টের পর নানাভাবে ৮ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের তথ্য স্বীকার করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

নিঃসন্দেহে রোহিঙ্গা সংকট আমাদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এই মুহূর্তে ভিন্ন একটি দেশের সমস্যা আমাদের বোঝা হয়ে দাঁড়ালে আমাদের নিজস্ব সংকট আরও বাড়বে। রোহিঙ্গা সংকট শুধু আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাই নয়, সামাজিক নিরাপত্তার জন্যও বড় সমস্যা। তা ছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো আমাদের পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপর বিরূপ অভিঘাত ফেলেছে। আবার আমরা যদি বিপরীত দিক থেকে দেখি, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রোহিঙ্গারাও তাদের মৌলিক অধিকার থেকে নানাভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে শরণার্থী সংকট তাদের জন্যও বড় একটি সমস্যা। রোহিঙ্গারাও নিজ দেশে ফেরত যেতে চায়। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরব ভূমিকা বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ।

এই মুহূর্তে সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো সরকার ক্ষমতায় নেই। প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ ও নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সংগত কারণেই সদিচ্ছা থাকলেও এ সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক মহলে রাজনৈতিক সরকারের মতো জোর দিয়ে আলাপের সুযোগ কম। তবে যতটুকুই আছে তার সদ্ব্যবহার করার সদিচ্ছা অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে প্রকাশ করেছে। বিগত ৭ বছর ধরে রোহিঙ্গারা আমাদের ওপর বড় বোঝা হয়ে আছে। বিষয়টি বলতে কিছুটা কটু শোনায়। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা যাচাই করলে এমনটি না বলে উপায় নেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এর আগেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অনেক প্রস্তাবনা ও আলোচনা করেছে। তারা কার্যকর পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছে দফায় দফায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এ বিষয়ে তারা দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি।

সুস্থির রাজনৈতিক সরকার থাকাকালেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন করা যায়নি। সংগত কারণেই অনুমান করে নিতে হয়, শিগগির এ বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হবেÑ সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ ক্ষেত্রে বলতে হয়, আমাদের কূটনৈতিক চ্যানেল অনেকটা ব্যর্থ। বিদায়ি সরকারের সময় আমাদের সহযোগী ও বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের তালিকা বেশ দীর্ঘই ছিল। বুক ফুলিয়ে তাদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের বিষয়টি আলোচনা করা হতো। কিন্তু দেশের ক্রান্তিলগ্নে যদি বন্ধু রাষ্ট্র এগিয়ে না আসে, তাহলে কীভাবে বলা যায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কোন্নয়ন হয়েছে? এক্ষেত্রে আমাদের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক চ্যানেল যে বন্ধু রাষ্ট্রের ভূমিকাকে কাজে লাগাতে পারেনি তা স্পষ্ট। তবে যেহেতু রোহিঙ্গা সংকট আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে, তাই সমাধানের ক্ষীণ সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে।

প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর ওই প্রতিবেদনে স্থানীয়দের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগে প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। অন্যদিকে বিজিবি দাবি করেছে, গত এক মাসে তারা প্রায় ৪ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে। দেশের জননিরাপত্তা এই মুহূর্তে নাজুক। এই নাজুক পরিস্থিতি সীমান্তরক্ষী বাহিনী এমনকি সামরিক বাহিনীর ওপরও পড়েছে। ফলে মিয়ানমার সীমান্তের মতো দুর্গম অঞ্চলে পর্যবেক্ষণ রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর বিষয়টিকে অন্তত এই মুহূর্তে বেশি জোর দিতে হবে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিশেষত, যারা সীমান্তবর্তী এলাকায় দায়িত্বপালন করেন তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। দুর্গম অঞ্চলে দায়িত্বপালন করেন বলে তাদের বিশেষ সুবিধাও দেওয়া হয়। তাই তাদের সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। এক্ষেত্রে পুরোনো কৌশল নয় বরং নতুন কৌশল নিয়ে ভাবতে হবে। পুরোনো টহল ও অন্যান্য প্রটোকল দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না।

সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে সহযোগিতাকারী দালালচক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। যারা এ কাজ করছে, তারা দেশের শত্রু। দেশের ক্রান্তিলগ্নে তারা দেশের পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা সম্প্রতি জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের তৃতীয় একটি দেশে পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। অন্যদিকে ৯ আগস্ট পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন, এখনই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। অনেকেই দুজনের এমন মন্তব্য সাংঘর্ষিক মনে করছেন। কিন্তু এখানে বাস্তবতা বুঝতে হবে। রোহিঙ্গাদের তৃতীয় একটি দেশে পাঠানোর বিষয়ে ভাবলেই হবে না। অন্য একটি দেশের সঙ্গে চুক্তিতেও যেতে হবে। কাজটির জন্য সময় চাই এবং এজন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকারকে এজন্য সময় দিতে হবে। ড. ইউনূসের বক্তব্যে স্বস্তি পাওয়ার কারণ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিদায়ি সরকার রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে যথেষ্ট তৎপর ছিল না। বরং রোহিঙ্গাদের ভরণপোষণ করে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও লবিং চ্যানেল নিয়োগ দেওয়া হয়েছেÑএমন অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে যদিও আমাদের কাছে প্রমাণ নেই। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও এ বিষয়টি একাধিকবার আলোচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে সন্দেহ জাগে। ড. ইউনূস শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন। তার এসব নিয়ে ভাবনা থাকার কথা নয়। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বা ভিন্ন দেশে পাঠানোর বিষয়ে তিনি আন্তরিক তাতে সন্দেহ নেই। রোহিঙ্গাদের এই মুহূর্তে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর পরিবেশ নেই। তাই তৃতীয় দেশের কথা ভাবতে হচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশে জনসংখ্যার হার ঋণাত্মক। আবার অনেক দেশে জনসম্পদ প্রয়োজন। রোহিঙ্গাদের সেখানে প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো যেতে পারে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা শিশুদের নিয়েও ভাবতে হবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিদিন প্রায় ১০০ শিশু জন্ম নেয় বলে সম্প্রতি একটি দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই শিশুরা বড় হওয়ার পর কী পরিচয় ধারণ করবে? তারা তো বাঙালি নয়। আবার তাদের তো নাগরিকত্ব নেই যে, তারা এ দেশের বিদ্যালয়ে পাঠগ্রহণ করবে। তারা কি বাংলা কারিকুলাম পড়বে? নাকি তাদের দেশের কারিকুলাম পড়বে? আবার এই শিশুরা শিক্ষার আলো না পেলে কী কাজ করবে? তারা অসহায় হয়ে পড়বে। আর এই অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়ার জন্য তৃতীয় অনেক পক্ষ তৎপর হয়ে আছে। তারা এই যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে জঙ্গি কার্যক্রমে অংশ নেওয়াতে পারে।

অনেকে বলছেন, রোহিঙ্গাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিতে। তারাই স্বাধীন করুক তাদের দেশ। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, এমনটি উল্টো ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। তারা তো প্রশিক্ষিত সামরিক বাহিনী নয়। অস্ত্র পেলে তার নিয়ন্ত্রণও তাদের থাকে না। তখন দেশের অভ্যন্তরেও তারা অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। তাই রোহিঙ্গা শিশুদের নিয়ে ভাবতে হবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পর অনেক যুদ্ধশিশুকে দত্তক নেওয়া হয়। তারা বহির্বিশ্বে অনেক সুন্দর জীবন পেয়েছে। নাড়ির টানে প্রায়ই আবার আসেন। দেশটাকে দেখেন। রোহিঙ্গাদের জন্যও একটি সুন্দর পৃথিবী নিশ্চিত করা জরুরি। রোহিঙ্গারা এখানে অসহায়। তাই বিভিন্ন অশুভ মহল রোহিঙ্গাদের ভুলপথে পরিচালনা করার চেষ্টা করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। তারা মূলত বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জননিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এমনটি হতে দেওয়া যাবে না।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি এখন আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর আমাদের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সৃষ্টি হলে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। বিশেষত, ভারত ও চীনের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোও এই সংকট থেকে রেহাই পাবে না। তাই আন্তর্জাতিক মহলকে এবার বিষয়টি নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। আমাদের কূটনৈতিক চ্যানেল এবার বিষয়টিকে আরও বেশি প্রাধান্য দিয়ে দ্রুত সমাধান করবেÑ এমনটিই প্রত্যাশা।তবে সবার আগে ফের অনুপ্রবেশ ঠেকাতেই হবে।

  • নিরাপত্তা বিশ্লেষক, অবসরপ্রাপ্ত মেজর ও গবেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা