সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:৩২ এএম
কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার অংশে যুদ্ধ পরিস্থিতির
আরও অবনতি ঘটতে পারে এবং তা ছড়িয়ে পড়ারও আশংকা আছেÑ এই সতর্কবার্তা আমরা নিকট অতীতে এ সম্পাদকীয়
স্তম্ভেই দিয়েছিলাম। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডুতে আরাকান আর্মি ও জান্তা বাহিনীর
সংঘাত ক্রমান্বয়ে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চেষ্টা বাড়তে
পারে, তা-ও আমরা সতর্ক করে দিয়েছিলাম। আমাদের সব আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত বাস্তবে পরিণত
হলো এবং একই সঙ্গে আরও কিছু ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে ৯ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ
প্রকাশিত প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, ওই সীমান্তের প্রায় ৩০টি পয়েন্ট দিয়ে দালালদের সাহায্যে
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দালালরা জনপ্রতি ৪-৫ লাখ কিয়াতের
( বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২০-৩০ হাজার টাকা ) বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ করার
সুযোগ দিচ্ছে। এই বার্তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক , একই সঙ্গে প্রশ্নবোধকও। প্রশ্ন হচ্ছে,
আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে দালালরা এই অপতৎপরতা চালাচ্ছে কীভাবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা গত সপ্তাহে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জানান, ‘বাংলাদেশে ৮ হাজারের মতো রোহিঙ্গা গত কয়েক দিনে
অনুপ্রবেশ করেছে। মিয়ানমার থেকে কীভাবে এই অনুপ্রবেশ ঠেকানো যায়, তা নিয়ে দ্রুতই উপদেষ্টা
পরিষদে আলোচনা হবে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘নীতিগতভাবে আমরা কোনো রোহিঙ্গাকে নতুন করে আশ্রয়
দেব না, যদিও দুঃখ লাগে কথাটা বলতে, কিন্তু আমাদের জন্য সাধ্যের অতীত; আর পারব না তাদের
আশ্রয় দিতে।’ কয়েকজন অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গার বরাতে জানা যায়, তারা দালালদের সহায়তায়
বিভিন্নভাবে অনুপ্রবেশের পথ খুঁজে নিচ্ছেন। স্থল সীমান্তের পাশাপাশি রোহিঙ্গারা নৌকা
দিয়ে নাফ নদ অতিক্রম করে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের একটি ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়ার সর্বশেষ বার্তাও
মিলেছে। টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, সীমান্তের
বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে। কিছুদিন আগে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে
নাফ নদ থেকে পুনরায় মিয়ানমারে ফেরতও পাঠানো হয়েছে। তার আরও ভাষ্য, অনুপ্রবেশ ঠেকাতে
নাফ নদ ও সীমান্তে টহল জোরদার করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা যেখানে ৮ হাজার রোহিঙ্গার
অনুপ্রবেশের কথা স্বীকার করেছেন সেখানে বিজিবি কীভাবে বলে তাদের কাছে অনুপ্রবেশের কোনো
সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই? আমরা মনে করি, সম্প্রতি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক
উৎসমুখের সৃষ্টি হয়েছে। সীমান্তে কঠোর প্রহরাসহ নানামুখী প্রয়াস সত্ত্বেও বাংলাদেশে
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না; এর জন্য উৎসে নজর দেওয়া জরুরি। ইতঃপূর্বে
অনুপ্রবেশ বন্ধ করা এবং সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত একজন বিজিবি কর্মকর্তার
দালালদের হাতে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও আমরা বিস্মৃত হইনি। এর সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের
আওতায় আনার পাশাপাশি তাদের আন্তর্জাতিক জাল ছিন্ন করে দেওয়ার বিষয়টি তখন সংবাদমাধ্যমে
আলোচনায় এসেছিল। দফায় দফায় রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে
তাদের ফেরতও পাঠিয়েছে আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি। কিন্তু আমরা মনে করি, ফেরত
পাঠানোর প্রচেষ্টার চেয়ে অনুপ্রবেশ চিরতরে কীভাবে বন্ধ করা যায় সেদিকেই এখন সংশ্লিষ্টদের
মনোযোগ বাড়াতে হবে। প্রায় ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার বোঝা বাংলাদেশের ওপর চেপে আছেÑ
এই তথ্যের বাইরেও এখন অন্য হিসাবে এই সংখ্যা আরও বেশি। কারণ জনমিতি হারের সূত্র অনুসারে,
বিগত প্রায় সাত বছরে এ সংখ্যা যে আরও বেড়েছে তা খুব সাধারণ হিসাব। এজন্য বাড়তি কোনো
গবেষণার প্রয়োজন নেই।
মিয়ানমার সীমান্তে যুদ্ধাবস্থার কারণে সেখানে আগ্নেয়াস্ত্র সহজলভ্য
হওয়ায় সন্ত্রাসী দল বা গোষ্ঠী আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ব্যবহার
করতে পারেÑ এমন আশঙ্কাও অমূলক নয়। ইতঃপূর্বে আরাকান আর্মি বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে
উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে বলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক বার্তায়
বলা হয়েছিল। মিয়ানমারের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে দেশটির নিরাপত্তা
বাহিনীর লড়াই চলছে দীর্ঘদিন ধরে। আরাকান আর্মির সঙ্গে টিকতে না পেরে প্রাণ বাঁচাতে
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে এ পর্যন্ত দেশটির নিরাপত্তা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর
কয়েকশ সদস্য ইতঃপূর্বে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ও টেকনাফে দফায় দফায় আশ্রয় নেয়। পরে
তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
কক্সবাজার টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে খুনখারাবি প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক
ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শরণার্থী শিবিরের বিভিন্ন গ্রুপের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, চাঁদাবাজি,
মাদকব্যবসা ইত্যাদি বহুবিধ নেতিবাচক অপতৎপরতার খবরও আমাদের অজানা নয়। তা ছাড়া রোহিঙ্গা
শিবিরকে কেন্দ্র করে আরসার অপতৎপরতার বিষয়টিও আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। নিকট
অতীতে রোহিঙ্গা নেতা মহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও শিবিরগুলোর
নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। আরসা বা এ ধরনের কোনো সংগঠন যাতে এখানে
কোনো অপতৎপরতা চালাতে না পারে, সে ব্যাপারে আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে কঠোর অবস্থান
নেওয়ার তাগিদও বারবার দেওয়া হয়েছে। আমরা দেখছি, রোহিঙ্গা সংকট আমাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাসহ
পরিবেশ-প্রতিবেশের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদে তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে
নেওয়ার পদক্ষেপ ইতোমধ্যে নেওয়া হলেও এর কোনো ইতিবাচক ফল দৃশ্যমান হয়নি।
পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো
প্রয়োজন। বাংলাদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের দ্রুত তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তার
কথা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসও বলেছেন। ৮ সেপ্টেম্বর
তার কার্যালয়ে ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের (আইওএম) কর্মকর্তাদের সঙ্গে
আলোচনা সভায় প্রধান উপদেষ্টা রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে আইওএম-এর
কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আমরা মনে করি, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঘিরে এবং
ফের অনুপ্রবেশের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিকভাবে নতুন করে উপস্থাপনে বাড়তি গুরুত্ব
দেওয়া সংগত কারণেই জরুরি হয়ে পড়েছে। মিয়ানমারে সেনাবাহিনী ও বিপ্লবী গোষ্ঠীর মধ্যে
সংঘাত যেভাবে প্রকট হয়ে উঠছে, এই প্রেক্ষাপটে আরও রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশের চেষ্টা চলতে
পারে। এমতাবস্থায় সরকারের উচিত এ ব্যাপারে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া। একই সঙ্গে দালালচক্রকে
আইনের মুখোমুখি করে সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই।
কোনোভাবেই নতুন করে কোনো রোহিঙ্গাকে অনুপ্রবেশের সুযোগ দেওয়ার অবকাশ নেই। নির্যাতিত জনগোষ্ঠীটির মানুষকে স্বদেশে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে দেনদরবার অব্যাহত রাখায় কোনোভাবেই উদাসীনতা দেখানো যাবে না। তবে সর্বাগ্রে রোধ করতে হবে নতুন অনুপ্রবেশ এবং এজন্য আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।