× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মুক্তিযুদ্ধ

একাত্তর আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি

মহিউদ্দিন খান মোহন

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:২৮ এএম

মহিউদ্দিন খান মোহন

মহিউদ্দিন খান মোহন

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের জাতীয় সংগীত নিয়ে একধরনের ধূম্রজাল সৃষ্টির অপপ্রয়াস লক্ষ করা যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযমের পুত্র সাবেক সেনা কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল আমান আযমীর এ সংক্রান্ত একটি মন্তব্যের পরপরই সামাজিকমাধ্যমে এ নিয়ে ঝড় তোলার চেষ্টা লক্ষণীয় হয়ে উঠে। এ বিষয়ে গত ৫ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশে প্রকাশিত নিবন্ধে আমি কিছু মন্তব্য করেছিলাম। পরিচিতজনদের অনেকে ফোন করে সময়োপযোগী মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ দিয়েছেন। কেউ কেউ আবার বিরোধিতা করে বলেছেন, একজন বহির্দেশীয় কবির গানকে কেন আমরা আমাদের জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করব? কেউ আবার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এ গানটি রচনার সময় ও প্রেক্ষাপটকে সামনে টেনে এনে এটাকে জাতীয় সংগীত করার অসারতা প্রমাণেরও চেষ্টা করছেন। আমি তাদের বলেছি, এ বিতর্ক একেবারেই অর্থহীন। কেননা, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’Ñ এ গানটি আমাদের জাতীয় সংগীত এবং এটি এখন মীমাংসিত ইস্যু। এটা নিয়ে অযথা নাড়াচাড়া করে দেশের ভেতর নতুন করে একটি অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়।

জাতীয় সংগীত প্রশ্নে সৃষ্ট বিতর্কের পক্ষে যারা কথা বলছেন, তাদের মন্তব্য হলো, যেহেতু দেশে একটি বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছে (৫ আগস্ট), তাই রাষ্ট্রের অনেক কিছুই পরিবর্তন করা দরকার। সে হিসেবে গোলাম আযমের পুত্রের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে জাতীয় সংগীত পরিবর্তন করতে হবে। কেউ কেউ আবার আগ বাড়িয়ে নতুন জাতীয় পতাকার দাবিও তুলছেন। যারা এ মতবাদকে সমর্থন করছেন, তাদের অবগতির জন্য বলতে হয়, জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-গণ-আন্দোলন এবং তার অপরিহার্য ফলশ্রুতিতে সৃষ্ট গণবিপ্লবের উদ্দেশ্য ছিল স্বৈরশাসক হাসিনাকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিতাড়ন, জাতীয় সংগীত পরিবর্তন এক নয়। সরকার হটানো মানেই জাতীয় ঐতিহ্য বা ঐতিহাসিক স্মারকসমূহের উৎপাটন নয়।

গত ক’দিন খুব অস্বস্তিতে ছিলাম। কেননা, গোলাম আযম-পুত্রের দাবি ও তৎপ্রেক্ষিতে সামাজিক মাধ্যমে কতিপয় অপরিণামদর্শী ব্যক্তির ঝড় তোলার চেষ্টার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে অফিসিয়াল কোনো বক্তব্য-মন্তব্য পাওয়া যায়নি। যেহেতু বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর, তাই এ ব্যাপারে সরকারের ত্বরিত প্রতিক্রিয়াই বাঞ্ছনীয় ছিল। এরই মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং বিশিষ্টজনেরা এর প্রতিবাদে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। অবশেষে গত ৮ সেপ্টেম্বর সরকারের ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন মুখ খুলেছেন। রাজশাহীতে তিনি সাংবাদিকদের এ-সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘বিতর্ক সৃষ্টি হয়, এমন কোনো বিষয়ে সরকার হাত দেবে না।’ অর্থাৎ জাতীয় সংগীত পরিবতর্নের যে ইস্যুটি তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে, তাতে সরকারের সম্মতি নেই। ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টার এ মন্তব্যের পর দেশবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে, সেটা বলাই বাহুল্য। একটি জাতির কিছু ঐতিহাসিক অর্জন থাকে। থাকে ভিত্তিমূল এবং এর ওপর সে জাতির গর্বের মিনার দাঁড়িয়ে থাকে। যত বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করাই হোক না কেন, এটা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত সত্য যে, আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের ভিত্তি ১৯৭১। থাকতে পারে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক, কিংবা কার নেতৃত্বে আমরা স্বাধীন হলাম তা নিয়ে অযথা বালখিল্য আলোচনা। তবে আজকের বাংলাদেশ যে ১৯৭১ সালে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর সৃষ্ট, তা অস্বীকার করা যাবে না। এ কথা বলা নিশ্চয়ই অত্যুক্তি হবে না, আজকে যারা জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের মতো অবিমৃশ্যকারী চিন্তাভাবনায় আচ্ছন্ন, তারা প্রকারান্তরে আমাদের জাতীয় স্বাধীনতাকেই অস্বীকার করতে চান।

এ নিয়ে ফেসবুকে আমার পরিচিত এক বিএনপিকর্মীর পোস্ট দেখে ফোন করে তাকে বলেছি, তোমরা যদি জাতীয় সংগীত বদলানোর পক্ষে বলো, তার কি প্রতিক্রিয়া হতে পারে ভেবে দেখেছ? তা ছাড়া এ ব্যাপারে তোমাদের দলেরও সমর্থন থাকার কথা নয়, যদিও এখন পর্যন্ত তারা কিছু বলেনি। তাকে বললাম, জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা কোনো দল বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়, পুরো জাতির সম্পদ। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ঘোষক। সেই যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি। সেই মহান স্বাধীনতার ফসল এই পতাকা ও জাতীয় সংগীত। এই সংগীতের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়, রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানগণ পতাকাকে অভিবাদন জানিয়ে থাকেন। জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়াও তাই করেছেন। তাহলে কি তারা ভুল করেছেন? তারা যদি ভুল না করে থাকেন, তাহলে কেন তোমরা এই ইস্যুটিকে নিয়ে ফেসবুক গরম করছ? তোমরা কেন ভুলে যাও তোমাদের দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা একজন শ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা? তার দলের সদস্য হয়ে স্বাধীনতার আদর্শের বিরুদ্ধে যায়Ñ এমনসব ফালতু ইস্যুকে গুরুত্ব দাও কেন? এতে শহীদ জিয়াকেই হেয়প্রতিপন্ন করা হয়। বিএনপির ওই কর্মী আমার কথার প্রত্যুত্তর করতে পারেনি।

আমার মতো অনেকেই বিস্মিত ও শঙ্কা বোধ করছেন। সেটা হলো ৫ আগস্ট দুঃশাসক হাসিনার পতন ও পলায়নের পর একটি বিশেষ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির অনুসারী কতিপয় ব্যক্তি এ বিজয়কে কুক্ষিগত করে আমাদের স্বাধীনতার মৌলিক চেতনা পরিপন্থি ইস্যুকে জনসমক্ষে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই নব্য বিপ্লবীদের বেশিরভাগ দূর দেশে অবস্থান করে নানারকম তত্ত্ব-তথ্যের সমাহার ঘটিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সুদূর আমেরিকায় বাসরত, দেশে থাকতে একদা সাংবাদিক এক ব্যক্তি এমনসব পোস্ট দিচ্ছেন, যেন ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ করাটাই ভুল ছিল। যেমন সদ্য ক্ষমতাচ্যুত নিজেদের স্বাধীনতার সোল এজেন্ট হিসেবে জাহির করা দলটির সমর্থকরা ১৯৪৭ সালের ভারতবর্ষের বিভক্তি ও পাকিস্তান-রাষ্ট্রের জন্মকে ভুল হিসেবে প্রতিপন্ন করতে চায়। এ বিষয়ে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক নূরে আলম সিদ্দিকী (মরহুম) তার অনেক লেখা ও টিভি টকশোয় বলেছেন, ‘আমি কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে স্যালুট করি। কারণ তিনি যদি ভারত ভাগ করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা না করতেন, তাহলে আমরা আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ পেতাম না।’ শ্রদ্ধেয় নূরে আলম সিদ্দিকীর কথার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। তেমনি, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ এবং জাতি হিসেবে আমাদের যা কিছু অর্জন, সবকিছুর  শেকড় প্রোথিত রয়েছে একাত্তরে। মুক্তিযুদ্ধের অধ্যায় একাত্তরপর্ব এড়িয়ে গেলে জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব থাকে কি? সে শেকড়কে উপড়ে ফেললে বা নড়বড়ে করে ফেললে আমাদের জাতীয় অস্তিত্বই বিপন্ন হতে পারে। অতএব সাধু সাবধান।

  • সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা