মানবাধিকার
এলিনা খান
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:২৬ এএম
এলিনা খান
সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে যখন কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ হন এবং তার সন্ধান জানা যায় না, তখন ওই ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটিকে গুম হওয়া বোঝায়। জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর কোনো ব্যক্তিকে যদি বিচার ব্যবস্থার কাছে সোপর্দ না করা হয় এবং তাকে আর খুঁজে পাওয়া না যায়, তবে সেটিই গুম। মূলত সরকারের বিরোধী মতকে দাবিয়ে রাখতেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরণের ঘৃণিত উদ্যোগের ব্যবহার দেখা যায়। গুমের শিকার মানুষ বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডেরও শিকার হয়েছেন, এমন উদাহরণও রয়েছে। বাংলাদেশেও গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে অসংখ্য মানুষের গুম হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর উদ্বেগ এবং নিন্দার পরেও দেশে অসংখ্য মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে গুমের শিকার ব্যক্তি পরবর্তীতে পরিবার ও স্বজনদের কাছে ফিরে এলেও সরকারের যেসব সংস্থার বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠেছিল, তারা কখনই অভিযোগ স্বীকার করেনি। সরকারের পক্ষ থেকেও গুম এবং গুমের পেছনে সরকারি সংস্থা বা সরকারের সংশ্লিষ্টতা বরাবরই অস্বীকার করা হয়েছে। দেশে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা প্রিয়জনের খোঁজে ‘মায়ের ডাক’ নামে একটি মঞ্চও গঠন করেছিল। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পতনের পর গুম হওয়া অনেক ব্যক্তি ফিরে এসেছেন। যদিও এখনও অনেক মানুষের কোনো সন্ধান মেলেনি।
গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়
গুমের অভিযোগ ওঠায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবেও ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। গুম শুধু
আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বের নানা দেশেই সরকারের বিরোধী মতকে দাবিয়ে রাখতে ব্যবহৃত।
গুম প্রতিরোধে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেশন ফর প্রোটেকশন অব
অল পারসনস এগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ সম্মেলনে কার্যকর হয় একটি আন্তর্জাতিক
সনদ। যেখানে ৩০ আগস্টকে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে প্রতিবছর দিনটিকে ঘোষণা করা
হয় আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে। আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালিত হওয়ার আগের দিন, অর্থাৎ
২৯ আগস্ট বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড.
মুহাম্মদ ইউনূস গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে সই করেছেন। প্রধান উপদেষ্টার এ উদ্যোগের
জন্য সাধুবাদ জানাই। গুম প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সনদে আমাদের সাক্ষর একটি মাইলফলক। এর
মাধ্যমে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের মানবাধিকার নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার অন্তর্বর্তী
সরকারের তা নিশ্চিত করতে সরকারের ইচ্ছের প্রতিফলন
স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক নয়টি সনদের
আটটিতেই সই করেছে। কিন্তু জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের অনুরোধের পরও বিগত সরকার গুমবিরোধী
সনদে সই করেনি। অন্তর্বর্তী সরকার মানবাধিকার সমুন্নত রাখার পাশাপাশি গুমের
সংস্কৃতি বন্ধ করতে চায়। এ লক্ষ্যে সরকার গুমবিরোধী সনদে যুক্ত হয়েছে।
বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের বরাত দিয়ে
৩০ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত
১৫ বছরে দেশে ৭০০-এর বেশি মানুষের গুম হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৫০ জনের বেশি
মানুষের খোঁজ এখনও মেলেনি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে অভিযোগ করছেন, গুম বিষয়ে
দেশে এখনও স্বচ্ছ ও স্পষ্ট কোনো আইন প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। গত ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের
মুখে আওয়ামী সরকারের পতনের পর এ বিষয়গুলো নতুন করে উঠে আসছে। ‘আয়নাঘর’ প্রসঙ্গের মতো
বেশ কয়েকটি অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে দেশে গুম-হত্যা প্রতিরোধে বা এ ধরনের অপরাধ সংঘঠিত
হলে তার বিরুদ্ধে জন্য কোনো আইন নেই এমন ধারণা ভুল। কারণ আমাদের ফৌজদারি বিধিমালায়
গুম ও হত্যার বিষয়ে সুস্পষ্ট আইনি নির্দেশনা রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সমস্যা হলো, আইনের
বাস্তবায়নে রয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। হত্যা কিংবা গুমের ক্ষেত্রে মামলা হয়। মামলার তদন্তে
দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়। যে ব্যক্তি গুম হয়েছেন, কখন কোথায় গুম হয়েছেন কিংবা তার আপাত-অবস্থান
কোথায়Ñএসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সাধারণত আমরা পাই না। তথ্যের অপ্রতুলতা এবং আইনি ক্ষেত্রে
তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা বাদী কিংবা অভিযোগকারীর ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা
তৈরি করে। এগুলো দূর করা জরুরি।
সচরাচর গুমের অপরাধের তদন্ত যিনি করেন তিনি বা তারা পুলিশেরই কোনো কর্মকর্তা হয়ে
থাকেন। অধিকাংশ গুমের ঘটনায় আমরা দেখছি, সাদা পোশাকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তা
পরিচয়ে অনেককে তুলে নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় ডিবি, ডিজিএফআই, র্যাব ইত্যাদি
সংস্থার নাম-পরিচয় ব্যবহার করেই অধিকাংশ গুম করা হয়। গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তি কোথায় যান,
তাদের অবস্থান সম্পর্কে আমাদের কিছুই জানার উপায় থাকে না। একটিই সূত্র থাকে, আইনশৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একবার জানা গেল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী
দলের রাজনীতিবিদ, সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী এবং কক্সবাজার-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য
সালাহউদ্দিন আহমেদ ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ ঢাকার উত্তরা থেকে অপহৃত হন। তার অপহৃত হওয়ার
প্রায় দুই মাস পরে তাকে পাওয়া গেল ভারতে শিলং শহরে। আবার দলটির আরেক নেতা ইলিয়াস আলী
গুম হওয়ার পরে এখনও তার সন্ধান মেলেনি। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে জানা যাচ্ছে,
অনেকে দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর ‘আয়নাঘর’ থেকে বেরোচ্ছেন। বের হওয়ার পর তারা তাদের
ওপর ঘটে যাওয়া নির্মম অভিজ্ঞতার কথা শোনাচ্ছেন।
যখন গুমের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার নামই সামনে আসে
তখন তাদের দিয়েই তদন্ত করানো হয় বলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব তদন্ত আলোর মুখ দেখবে এমন
আস্থা আমরা রাখতে পারি না। এ ক্ষেত্রে বলতে হবে, গুমের ক্ষেত্রে আইন রয়েছে কিন্তু তার
সঠিক প্রয়োগ নেই। প্রতিটি গুম ও হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দ্রুত নিষ্পন্ন করার চেষ্টা
করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে আমরা সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টানতে পারি। দীর্ঘদিন
ধরেই এ মামলার বিচার চলছে। এ মামলা কেন এত দীর্ঘায়িত হচ্ছে? কারণ আইন প্রয়োগকারী কিংবা
তদন্তে দায়িত্বরত সংস্থা সঠিক ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করছে না। তদন্ত প্রতিবেদন
প্রস্তুত করার ক্ষেত্রেও নানা প্রতিবন্ধকতা তারা তৈরি করেছে। অনেকের আশঙ্কা, এ ঘটনার
সঙ্গে বড় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নাম জড়িত। এজন্য স্বাধীনভাবে সংস্থাগুলো কাজ করতে
পারছে না। সচরাচর গুম কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটে থাকে।
স্মরণে আছে, মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর ওসি প্রদীপের কুকীর্তি আমাদের সামনে উঠে
এসেছিল। মেজর সিনহা সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা হওয়ায় এর তদন্তে বাড়তি গুরুত্ব ছিল। অথচ
এই ওসি প্রদীপ অসংখ্য মানুষের গুম-খুনের সঙ্গে জড়িতÑ এ অভিযোগ উঠেছিল। সেগুলোর সঠিক
তদন্ত নিশ্চিত হয়েছে কি না এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের বরাতে পরে নানা প্রতিবেদনে
মর্মন্তুদ অনেক ঘটনা উঠে আসে। অনেককে থানায় ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। পথিমধ্যে তাকে আর খুঁজে
পাওয়া যায়নি। অনেকে বিদেশ থেকে এসেছে কিন্তু চাঁদা দেননি বলে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে।
এমন অসংখ্য অভিযোগও সংবাদমাধ্যমের বরাতে দেশবাসী জেনেছে। কিন্তু সব গুম কিংবা বিচারবহির্ভূত
হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে তো আমরা এ প্রসঙ্গটি জানতে পারিনি। প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ার
বদৌলতে কোনো এলাকায় যে-কেউ এমনটি করতে পারেন না। তদন্তকারী সংস্থাও স্বাধীন না হওয়ায়
তাদের এসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়। অনেক ক্ষেত্রে
বাদীর মামলাও নেওয়া হয় না এমন অভিযোগ রয়েছে।
গুম ও বিচারবহির্ভূত
হত্যাকাণ্ড বন্ধের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের এ প্রচেষ্টাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। দেশের
আইন গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়টিকে অনুমোদন দেয় না। বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে
অনুধাবন করতে হবে। তার পরও সমাজে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা ঘটে থাকে। এসব অপরাধও তার অংশ।
কিন্তু রাজনৈতিক কারণে এসব অপরাধ যাতে সংঘটিত না হয় সেজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগকে
প্রশংসিত করতেই হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, অতীতেও আমরা অনেক সনদে স্বাক্ষর করেছি। কিন্তু তার
সব কি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে? মানবাধিকার সনদ, সিডও সনদসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ
সনদে আমরা স্বাক্ষর করেছি। কিন্তু এর ইতিবাচক ফল কি পাওয়া গেছে? যা হোক, গুম প্রতিরোধে
একটি সনদে স্বাক্ষর হলেই সমাধান মিলবে না। এখন তদন্ত কার্যক্রম সুগম করতে হবে। আমরা
সংবাদমাধ্যমে দেখি, একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি এলাকায় ৪০০-৫০০ জন মানুষ গুম ও নিখোঁজ
হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট এলাকার থানা ও অন্যান্য সংস্থাকে জবাবদিহির আওতায় নিয়ে
আসতে হবে। এমনকি ওই সময় সেখানে যারা কর্মরত ছিলেন তাদেরও তদন্তের স্বার্থে অন্তর্ভুক্ত
করা জরুরি। যদি এখান থেকেই কাজ শুরু করা হয় তাহলে একটি সুরাহা মিলবে।
গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার করার এখনই সময়। যেহেতু অধিকাংশ গুম বা নিখোঁজের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাম জড়িয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও আইনের অপপ্রয়োগ করে বলে অভিযোগ রয়েছে, সেহেতু এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে আনতে হবে। এ বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ কঠিন ছিল না। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা গেলে এটা বড় সমস্যা হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চেপে বসত না। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভিত কলুষিত হলেই এর অপব্যবহার শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা প্রত্যক্ষভাবে না করলেও রাজনৈতিক প্রভাবেও আইনের অপব্যবহার হতে পারে। রাজনীতিকরা রাষ্ট্রকে একটি সুন্দর কাঠামোর ওপর দাঁড় করানোর জন্য কাজ করেন। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাও তাদের দায়িত্ব। রাজনীতির মধ্যেই যখন প্রতিহিংসা ঢুকে যায় তখন আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কিন্তু এসবেরই প্রতিফলন। কোনো এলাকায় যদি গুমের ঘটনা ঘটে তাহলে থানার ওসি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য সংস্থাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সাদা পোশাকে কখনও কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না কারণ এমনটি আইনবহির্ভূত। ফলে পুলিশকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তা হলেই এ সমস্যার সমাধান হবে।