× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

ভুলগুলো শুধরে নিতে হবে

ড. মো. মাহবুবুল আলম

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:২৩ এএম

 ড. মো. মাহবুবুল আলম

ড. মো. মাহবুবুল আলম

৫ আগস্ট, ২০২৪ বাংলাদেশ একটি অবিস্মরণীয় ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছে। ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের নয় দফা এক দফায় পরিণত হয় এবং তার ফলে পনেরো বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। এ বিজয়ে অবশ্যই ছাত্ররা প্রকৃত বিজয়ীর দাবিদার। কিন্তু এও মনে রাখা দরকার, তাদের সঙ্গে দেশের সিংহভাগ মানুষ ছিল। এ আন্দোলনে গণমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। শুধু মৃতের সংখ্যা হিসাব করলে দেখা যায়, ৫০ শতাংশের অধিক ছাত্র নয় এমন ব্যক্তির মৃত্যু এ দাবির পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করে। অবিচ্ছেদ্যরূপেই তাই এ আন্দোলন ছাত্র-জনতার আন্দোলন হিসেবে পরিচিত হয়ে আসছে।

প্রকৃতপক্ষে এ আন্দোলনের সূত্র লুক্কায়িত আন্দোলনকারী ছাত্র কর্তৃক আদালত ঘেরাও কর্মসূচির মাধ্যমে। ১০ আগস্ট জুডিশিয়াল ক্যু ঘটতে যাচ্ছেÑএ সন্দেহে বিক্ষোভরত ছাত্ররা আদালত ভবন ঘেরাও করেন। ফলে প্রধান বিচারপতিসহ সব বিচারপতির সমন্বয়ে ডাকা ভার্চুয়াল সভাটি বাতিল করেন এবং পরে বিচারপতিরা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। জুডিশিয়াল ক্যুর ধারণাটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার ছিল না। উপরন্তু নতুন অন্তর্বর্তী সরকার যার হাতে একটি সুসংহত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নেই, তার এ রকম জুডিশিয়াল ক্যুর ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ছিল কি না সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। এ পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রসমাজের আন্দোলনই সম্ভবত ছিল একমাত্র উপায় ষড়যন্ত্র বানচালের। ছাত্রসমাজের এ আন্দোলনের সফলতা তাদের কার্যক্রমের কার্যকারিতা নির্দেশ করে। ২৫ আগস্ট রাতে আনসারের একটি অংশের সচিবালয় অবরোধ আরেকটি উদাহরণ। আবারও ছাত্র-জনতার দ্রুত পদক্ষেপে বড় কিছু ঘটনা ছাড়াই আপাতত অঘটন এড়ানো গেছে। কিন্তু এ কৌশলটি ভবিষ্যতে সরকারের বিরুদ্ধেই বারবার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ থেকে যায়। সুতরাং সম্ভব হলে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানোর যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য ভালো হবে বলে মনে করি। সে ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা জরুরি।অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দুটো প্রধানতম চ্যালেঞ্জের একটি হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঠামো ও আচরণগত সংস্কার। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার তেমন কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়নি। প্রায় সব ক্ষেত্রেই সংষ্কার অত্যন্ত জরুরি। এক কথায় সবার আগে সংস্কার।

স্বৈরাচার সরকারের দোসরদের বিরুদ্ধে যেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ মামলা করা হচ্ছে, তা স্বৈরাচার সরকারের দমননীতির মতো বলে অনেকে মনে করছেন। সাধারণ মানুষের একটি ধারণা (পাবলিক পারসেপশন) হলো, এ মামলাগুলো আপাতত আসামিদের আটকানোর জন্য দেওয়া হচ্ছে। পরে সময়সুযোগ বুঝে প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে মামলা রুজু করা হবে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, একজন ব্যক্তির বিপক্ষে করা একটি ভুল বা দুর্বল মামলা, সেই ব্যক্তির বিপক্ষে প্রকৃত মামলা দুর্বল করে দিতে পারে। সাধারণ মানুষ এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দিনশেষে মামলার প্রক্রিয়া এবং গুণমান (মেরিট) নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এবং আদতে দোষী ব্যক্তির খালাস পাওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি হবে। সুতরাং ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট অপরাধের ধরন বিবেচনায় মামলা রুজু করতে হবে। এখন পর্যন্ত এ রকম যত মামলা হয়েছে সেগুলো দ্রুত রিভিউ করে বাতিল বা রিভিশন করতে হবে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার দপ্তর থেকে এ ক্ষেত্রে পরিষ্কার নির্দেশনা দিতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে স্বৈরাচার সরকারের দমনপীড়নের পথে গিয়ে ছাত্র-জনতার এ অর্জন বৃথা করা যাবে না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘মব জাস্টিস’ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সাবেক বিচারপতি মানিক কীভাবে তার বিচারিক ক্ষমতা অপব্যবহার করেছেন অথবা সামাজিকভাবে মানুষকে হেয় করেছেন সে প্রশ্ন বিবেচনা করার পরও, কোনোভাবেই আদালত চত্বরে তার বা তার মতো কারও প্রতি শারীরিক আঘাত বর্তমান সরকার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে ঠিক বার্তা দেয় না। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও সতর্কতা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করি। সরকারের তরফে বঞ্চিত ও নির্যাতিত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত এ পরিস্থিতির উন্নয়নে। নতুবা অনুচিতভাবেই এ শোষক-স্বৈরাচার দোসরদের পক্ষে একটা সহানুভূতি গড়ে উঠছে, যেটি আদতে এ গণজাগরণের স্পিরিটের পক্ষে যায় না।

দ্বিতীয় যে সমস্যাটির কিছুটা ঝলক এখন দেখা যাচ্ছে, তা ছাত্র-সমন্বয়ক সম্পর্কিত। যদিও অনেকে বলবেন, এ সম্পর্কিত প্রশ্ন উত্থাপন এখনও বাস্তবিক হয়ে ওঠেনি। তবু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কিছু ঘটনার সংঘটন আর বিচ্ছিন্ন বলার উপায় নেই। শিক্ষা উপদেষ্টা ইতোমধ্যে জোরপূর্বক ক্ষমতা হস্তান্তরে বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা উল্লেখ করেছেন। যদিও এটি অনস্বীকার্য যে, অন্য প্রতিষ্ঠানের মতো অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও কলুষিত করা হয়েছে। জাতির বিবেক হিসেবে পরিচিত শিক্ষক সম্প্রদায়ের বক্তব্য এবং কার্যক্রম দলীয় ক্যাডার বাহিনীর সঙ্গে পৃথক করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। দেশের প্রচলিত আইনে সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অবশ্যই বিচারের আওতায় আসবে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে সমন্বয়ক বা সহসমন্বয়কের পরিচয়ে যে কর্তৃত্বমূলক দাবির আবরণে শাসন তা চিন্তার খোরাক জোগায় বইকি। অথচ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের একটি বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল কর্তৃত্বমূলক শাসনের অবসান। ইতোমধ্যে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিছু সমন্বয়ক তাদের সমন্বয়ক পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন শুধু এ শঙ্কা থেকেই। তা ছাড়া এইচএসসি পরীক্ষা বাতিলের প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের অন্ততপক্ষে দুজন এ ব্যাপারে তাদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। দাবি আদায়ে আল্টিমেটাম বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বা ব্যক্তির দুর্নীতির তথ্য দেওয়া আর ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে হেনস্থা করা একই কথা নয়। বয়সে ছোট আর আবেগী হওয়ার জন্য হয়তো স্কুল পড়ুয়ারা এ ধরনের কাজের ফল সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। কিন্তু এ ধরনের কাজে অংশগ্রহণ তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক না-ও হতে পারে। সুতরাং তাদের সঠিক পথে পরিচালনা করা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা জরুরি বলে মনে করি।

যেহেতু অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে তাই এখন শিক্ষার্থীদের উচিত এ সরকারের ওপর বিশ্বাস রাখা, তাদের মুক্তভাবে কাজের সুযোগ দেওয়া এবং নিজেদের মূল কাজ পড়াশোনায় পূর্নাঙ্গভাবে ফিরে যাওয়া। পাশাপাশি নিজেদের একটি প্রেশার গ্রুপ বা ওয়াচডগের ভূমিকা বজায় রাখা। যদি সেটি সম্ভব না হয় এবং তারা নিজেদের বর্তমান ভূমিকা প্রয়োজনীয় বলে মনে করে, সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের উচিত দেশব্যাপী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাদের সহসমন্বয়কদের জন্য স্পষ্ট নীতিমালা বা কার্যপ্রণালি তৈরি করা যাতে ব্যক্তির অপেশাদার আচরণ গণবিপ্লবের মাধুর্য ও উদ্দেশ্য ম্লান করতে না পারে। তবে অভিমত এটি করা তাদের জন্য একটু কঠিন হবে। কারণ এ গণজাগরণের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। বরং তাদের এ একতাবদ্ধতা স্বেচ্ছাশ্রম আর দাবিভিত্তিক এজেন্ডার ওপর গড়ে উঠেছে।

স্বৈরাচারের পতন এবং বাকস্বাধীনতার আগল খুলে যাওয়ার পর, সমাজমাধ্যম হয়ে উঠেছে পাবলিক জাজমেন্ট বা পাবলিক ট্রায়ালের একটি মাধ্যম। যে কথাগুলো বলা যেত না, যে ক্ষতগুলো দিনের পর দিন অনেকেই বয়ে বেড়িয়েছেন তা আজ প্রকাশ্যে চলে আসছে। তবে পাবলিক ট্রায়ালের সমস্যা হলো, এতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকে না। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর অভিযোগের সারবত্তা (মেরিট) থাকলেও, এতে নিরীহ ব্যক্তির অভিযুক্ত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অনেক সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির কার্যকারণের ব্যাখ্যা থাকলেও, তার আত্মপক্ষ সমর্থনের আগেই সামাজিক বিচার হয়ে যায়। সুতরাং বাকস্বাধীনতার মানে শুধু একপাক্ষিকভাবে নিজের ইচ্ছেমতো কিছু বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এর মর্ম উপলব্ধি সাপেক্ষে সঠিক মাত্রায় ও উপায়ে ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয় বলেই মনে করি। না হলে হয়তো এ বাকস্বাধীনতার স্বাধীনতা আবার আমরা অচিরেই হারাব।

এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, দেশ এখনও স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছেনি। পতিত সরকারের দোসরসহ বৈশ্বিক শক্তি এখনও এ দেশকে অস্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার জন্য সক্রিয় রয়েছে। সে ক্ষেত্রে জনগণসহ ছাত্রদের সজাগ দৃষ্টি এবং সরকারের প্রতি প্রত্যক্ষ সমর্থন দরকার আছে। তবে এ কথা বলা বাতুলতা হবে না যেএ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার, সরকারের প্রতিষ্ঠানসমূহ, জনগণ এবং সর্বোপরি ছাত্র সম্প্রদায় সংযত, সহমর্মী, পরিশীলিত এবং পেশাদার আচরণে অপরাগ হলে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন আরও একবার থমকে যাবে। অন্তর্বর্তী সরকারকে কোনোভাবেই ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। সুতরাং কালকের জন্য অপেক্ষা না করে আজই দুর্বলতাগুলো দূর করার প্রচেষ্টা শুরু করতে হবে। অর্থাৎ ভুলগুলো শুধরে নিতে হবে।

  • অধ্যাপক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা