মোফাজ্জল করিম
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:০৯ এএম
আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৭:১৬ পিএম
মোফাজ্জল করিম
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সফল পরিসমাপ্তি হয়েছে এক মাস আগে আওয়ামী
লীগ সরকারের পতনের মাধ্যমে। এ আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ
একটি বিরল ঘটনা। অতীতেও অনেক আন্দোলন হয়েছে। শিক্ষার্থীরাই করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের
স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও আন্দোলন ত্বরান্বিত করার এমন জোয়ার আগে দেখা যায়নি। আওয়ামী
লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে
অন্তর্বর্তী সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদেও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ দেখা
গেছে। আর এজন্য অন্তর্বর্তী সরকার দেশের আপামর জনতার সমর্থন পেয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারকে
দেখে দেশবাসী আশায় বুক বেঁধেছে। দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পেয়ে মানুষ অবশেষে
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। এবার ফিরে দেখা যাক অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার
পরের একটি মাসের দিকে।

গত এক মাসে আমরা কী দেখতে পেলাম—এ প্রশ্মটি দাঁড়ায়।
আমরা দেখলাম অন্তর্বর্তী সরকারকে দেশের মানুষ সাদরে গ্রহণ করেছে। কারণ সরকারের প্রধান
উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানুষ। তিনি বাংলাদেশের
সফল একজন অর্থনীতিবিদ। গরিবের বন্ধু, গরিবের ব্যাংকার বলে পরিচিত ড. ইউনূস শান্তিতে
নোবেল পেয়েছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এক মাসে তার নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের
সামনে ছিল অনেক চ্যালেঞ্জ। তিনি চ্যালেঞ্জের সবকটিকেই প্রাধান্য দিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের
পর জাতির উদ্দেশে একটি ভাষণ দিয়েছেন। ওই ভাষণে ভবিষ্যতে কী করবেন এবং বর্তমানে কী করছেন
তার সবকিছু দেশবাসীকে জানিয়েছেন। তার ওই ভাষণের পর মনে হয়েছে, ড. ইউনূসের রাজনৈতিক
কোনো দুরভিসন্ধি নেই। এমনকি তিনি যেভাবে সবকিছু পরিচালনা করেছেন তা থেকেও এ কথা বলা
যায়, তিনি সংস্কারের লক্ষ্যেই কাজ করছেন। যে সংস্কারের স্বপ্ন নিয়ে আমাদের তরুণ শিক্ষার্থীরা
আন্দোলন করেছেন, প্রাণ দিয়েছেন তিনি তাদের স্বপ্নপূরণের ভার নিয়েই দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
তার নেতৃত্বাধীন সরকার দেশে একটি সর্বজনগ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের ভাবনা মাথায় রেখেই
কাজ করছে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের মানুষ অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন থেকে বঞ্চিত।
ড. ইউনূস সে আক্ষেপ পূরণের লক্ষ্যেই নেমেছেন। তিনি জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার
দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার
মাধ্যমে সংস্কারের কাজ স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করতে পারলে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার,
নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, নির্বাচন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার মতো কাজগুলো
সম্পন্নের মাধ্যমে খুব শিগগিরই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন হবে না বলেই মনে করি।
এজন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারকার্যের আশ্বাস অন্তর্বর্তী সরকার দিয়েছে। ইতোমধ্যে সরকার প্রশাসনে
প্রয়োজনীয় সংস্কারের কাজও শুরু করেছে। এমনকি সরকারি অন্য অঙ্গসংগঠনকেও শক্তিশালী করার
বিষয়ে তারা কাজ করে যাচ্ছে। গত এক মাসে প্রশাসনে যথেষ্ট রদবদল করা হয়েছে। সংস্কারের
স্বার্থে আরও করা হবেও বলে জানা গেছে। অর্থাৎ এ ব্যাপারে এই সরকারকে যৌক্তিক সময় দিতে
হবে।
এখন দেখা যেতে পারে, এ সংস্কার প্রক্রিয়া আরও গতিশীল করার প্রয়োজনে
কোন দিকগুলো অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। প্রশাসনের কয়েকটি স্তর রয়েছে। কয়েকটি বিভাগ
রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সংস্কারের কথায় সাধারণ মানুষের মনে সবার প্রথমে পুলিশ
বিভাগের কথাই আসে। আওয়ামী লীগ সরকার এক দশকের বেশি সময়ে পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ দেশের
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনীকে ব্যবহার করেছে রাজনৈতিক স্বার্থে। এসব বাহিনীর
নিজস্ব কর্মপরিধির বাইরে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থোদ্ধারের জন্য ব্যবহার করায় বাহিনীগুলো
একদিকে যেমন তাদের সুনাম হারিয়েছে, মানুষের আস্থা হারিয়েছে, তেমন বাহিনীগুলো দুর্বল
হয়েছে, তাদের চেইন অব কমান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ভিন্নমত দমন করার
কাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবহারের কুনজিরের মাধ্যমে বেড়েছে অনিয়ম-দুর্নীতি।
শুধু তাই নয়, পুলিশ বাহিনীসহ প্রশাসন প্রায় ধ্বংসের মুখে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। অন্যায়ভাবে
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবহারে দুর্ভোগ বেড়েছিল মানুষের। যার নেতিবাচক প্রভাব
আমরা দেখেছি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশের
বিভিন্ন স্থানে থানাগুলো জনতার ক্রোধের শিকার হয়ে হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। অন্যায়ভাবে
রাজনৈতিক স্বার্থে পুলিশকে ব্যবহারে এ বাহিনীর সদস্যরাও মানুষের আস্থা হারিয়ে দুঃখজনকভাবে
আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।
অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে পুলিশ বাহিনীসহ
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ওপর মানুষের আস্থা ফেরাতে উদ্যোগী হয়েছে। ইতোমধ্যে
বাহিনীগুলো থেকে অভিযুক্ত সদস্যদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ও হচ্ছে। পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠনের
উদ্যোগের অংশ হিসেবে এবং বাহিনীর সদস্যদের মনোবল ফিরিয়ে আনতেও অন্তর্বর্তী সরকার কাজ
করছে; যা আশার সঞ্চার করে।
শুধু পুলিশ বাহিনী নয়, জনপ্রশাসনকেও বিগত সরকার নানাভাবে দুর্নীতি-অনিয়মের
দিকে ঠেলে দিয়েছিল। বিগত সরকার বিভিন্ন সময় জনপ্রশাসনের স্বচ্ছতাও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বদলে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধিই যেন প্রাধান্য
পেয়েছে বেশি। এমনকি নির্বাচনের সময়ও প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার অভিযোগ
রয়েছে। শুধু নির্বাচনই নয়, যেকোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, প্রকল্প নির্মাণ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও
প্রশাসনের কার্যক্রমের ওপর হস্তক্ষেপের নজির রয়েছে; যা ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে
আমরা স্পষ্টভাবে জানতে পারছি। গত সরকার যখন যেমনটি চেয়েছে, ঠিক সেভাবেই সবকিছু নির্ধারণ
করেছে। নিজেদের খেয়ালখুশিমতো প্রশাসন পরিচালনার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে প্রশাসনের কেউ
কেউ সরকারের এ স্বার্থসিদ্ধির দুর্বলতাকে ব্যবহার করেছে। প্রশাসনের অনেকেই আকণ্ঠ নিমজ্জিত
ছিল দুর্নীতি ও লুটপাটে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, সংবাদমাধ্যমে কখনও
কখনও প্রতিবেদনও প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু আমরা দেখেছি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দৃষ্টান্তমূলক
কোনো শাস্তি হয়নি। অপরাধ করেও নানাভাবে প্রশাসনের অনেকেই ছাড় পেয়েছে। এতে প্রশাসনের
শৃঙ্খলা নষ্ট হয়েছে, যা অন্যদেরও উস্কে দিয়েছে দুর্নীতি, অনিয়মে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের
সঙ্গে প্রশাসনের যারা সমঝোতার পথে গেছেন তারা সবাই নিজের আখের গুছিয়েছেন। অথছ এর দুর্ভোগ
পোহাতে হয়েছে দেশের সাধারণ মানুষকে। সুশাসন বলে কিছুই আর প্রশাসনে তখন ছিল না।
জনপ্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ মাঠ প্রশাসন। অথচ নির্বাচনের
সময় নানাভাবে মাঠ প্রশাসনের অপব্যবহার হয়েছে। এ মাঠ প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য
বিষয় যেমন শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য খাতেও কারচুপি ও অনিয়ম হয়েছে। বাজার ও মাঠ পর্যায়ে
তদারকি সংস্থাগুলোও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। ফলে এসব সংস্থা প্রতিনিয়ত দুর্বল
হয়েছে। হয়ে উঠেছে অকার্যকর। সরকারি নানা সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছিল নামসর্বস্ব।
বিগত পনেরো-ষোলো বছরের শাসনে অনেক প্রতিষ্ঠানই অকেজো হয়ে আছে। এসব প্রতিষ্ঠান দুর্বল
করার ক্ষেত্রে সরকারের সায় ছিল, এ কথা বললে অত্যুক্তি হয় না। এমনকি মাঠ প্রশাসনও সরকারকে
খুশি করার জন্য অনেক স্বাধীন ও সাংবিধানিক সংস্থাকে সহযোগিতা করেনি। তাই পুলিশ বাহিনীর
মতো জনপ্রশাসনেও বড় সংস্কার জরুরি। একটি দেশ জনপ্রশাসন ছাড়া কার্যকর হতে পারে না। জনপ্রশাসনের
প্রশাসনিক স্থবিরতা অর্থনীতি ও সামাজিক নানা ক্ষেত্রে বড় সংকট তৈরি করে। এ সংকট আন্তর্জাতিক
পরিসরে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সুগম রাখার ক্ষেত্রেও বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে থাকে। প্রশাসনিক
কার্যক্রম সুগম করতে হলে বিভিন্ন প্রশাসনিক অঙ্গসংগঠনকে কাজ করার সুযোগ করে দিতে হবে।
প্রশাসন আবার নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে।
প্রশাসনের পর আমাদের হাত দিতে হবে দুর্নীতি ও অনিয়মে। বিগত সরকারের
আমলে বিভিন্ন অবকাঠামোগত প্রকল্পে বড় অঙ্কের নয়ছয়ের অভিযোগ রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, যে
সড়ক নির্মাণে আমাদের ব্যয় হতো এক কোটি টাকা, সেখানে খরচ দেখানো হয়েছে বিশ কোটি টাকা।
অনেক প্রশংসনীয় প্রকল্পেও মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে। ফলে আখেরে আমাদের ব্যয়
বেড়েছে। সে ব্যয় মেটানোর জন্য আমাদের বৈদেশিক ঋণ নিতে হয়েছে এবং সে বোঝা পড়েছে সাধারণ
মানুষের ওপর। অথচ যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হতো
তাহলে আমাদের ব্যয় এত বাড়ত না। অহেতুক ঋণের বোঝা ভারী হতো না। দুর্নীতি লাগামছাড়া হয়ে
উঠত না। আবার অনেক প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর জন্য প্রকল্পের মেয়াদের দীর্ঘসূত্রতাও বড়
সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছিল। যে প্রকল্প পাঁচ বছরে শেষ হওয়ার কথা তার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে
দফায় দফায়। ফলে সঙ্গত কারণেই ব্যয়ও বেড়েছে। এভাবে অপব্যয় না হলে আমাদের অনেক সাশ্রয়
হতো। প্রকল্পের সুবিধা আমরা আরও দ্রুত অনুধাবন করতে পারতাম। বাড়তি ব্যয় ও খরচ আমাদের
অর্থনীতিতে বড় চাপ ফেলেছে। মোটা দাগের এসব অনিয়ম-দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে হবে। কারণ যেকোনো
অনিয়মে দেশের সম্পদের ক্ষয় হয়। দেশের মানুষ ক্ষতির মুখে পড়ে। এমন অনেক প্রকল্প গড়া
হয়েছে যা আমাদের প্রয়োজন ছিল না। নতুন কোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে ভবিষ্যতে এর উপযোগিতা
নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে।
শিক্ষাঙ্গনেও অনেক বড় ক্ষতি হয়েছে। শিক্ষা অবকাঠামোসহ শিক্ষা কারিকুলামও অনেকটা মুখ থুবড়ে পড়ে। বিগত সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে উপাচার্য ও শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। তখন অবকাঠামো উন্নয়নে যতটা জোর দেওয়া হয়েছে শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য ততটা হয়নি। তাই আমাদের শিক্ষা খাতেও বড় সংস্কার জরুরি। আমাদের অনেক কাজ এখনও বাকি। সংবিধানেও যে ধারাগুলো সংস্কারকাজের বাধা হিসেবে উপস্থিত হতে পারে বলে চিহ্নিত, সেগুলোও বাদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমাদের সামনে সংস্কারের যে সুযোগ এসেছে তা হাতছাড়া করার সুযোগ নেই। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর প্রকৃত অর্থে আমাদের সামনে নতুন করে উদ্ভাসিত হয়ে নিজেদের বিকশিত করার পথ তৈরি হয়েছে। সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জাতিকে সংস্কারের পথ ধরে নতুন দিনে, নতুন পৃথিবীর অভিমুখে নিয়ে যাবে, সে প্রত্যাশা করি। তবে এ জন্য সবার সহযোগীতা প্রয়োজন।