পরিপ্রেক্ষিত
আর কে চৌধুরী
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:০৩ এএম
নিত্যপণ্যের মূল্য যেকোনো সরকারের জনপ্রিয়তার মাপকাঠি বলে
বিবেচিত হয়। পতিত কর্তৃত্ববাদী সরকারের শেষ দুই বছর নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে গড়ে
প্রায় দ্বিগুণ। আদা,
রসুন, পেঁয়াজ, আলুর মতো পণ্যের দাম বেড়েছিল
গড়ে ৩ থেকে ৮ গুণ। মানুষের কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি পেটে ক্ষুধার
জ্বালা শুরু হওয়ায় স্বৈরাচারের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়। কোনো সংগঠন নয়, সাধারণ
ছাত্রদের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, তাতে দেশের
সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিয়ে এক অতুলনীয় গণ-অভ্যুত্থান ঘটায়।
নিত্যপণ্যের দাম বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কমতে শুরু
করে। মুনাফাখোররা বুঝতে পারে ছাত্র-জনতার রক্তের উত্তরাধিকার অন্তর্বর্তী সরকার
মুনাফার লকলকে জিহ্বা সংবরণে মোটেও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগবে না। কিন্তু চার সপ্তাহ
না কাটতেই আবারও শুরু হয়েছে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির পাঁয়তারা। বেড়েছে চাল, ডিম, মুরগির
দাম। চাঁদাবাজি বন্ধ হলেও গরুর মাংসের দাম কমেনি। চালের দাম প্রতি কেজিতে বেড়েছে ১
থেকে ২ টাকা। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে এক সপ্তাহের ব্যবধানে ফার্মের মুরগির ডিমের
দাম বেড়েছে ডজনপ্রতি ১০ টাকা হারে। বেড়েছে মাছের দামও। এ কথা ঠিক দেশের একাংশ
বন্যাকবলিত। অতিবৃষ্টির শিকারও কিছু এলাকা। তারপরও আমাদের ধারণাÑ নিত্যপণ্যের দাম
কেন বাড়ছে সে বিষয়ে সরকারকে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। দাম বৃদ্ধির পেছনে অযৌক্তিক
কিছু থাকলে শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে। বিশেষ করে চাঁদাবাজি এবং অতি মুনাফার
বিষয়ে কঠোর হতে হবে তাৎক্ষণিকভাবে। দেশবাসীর আস্থা ধরে রাখতে এ ব্যাপারে দৃঢ়
সংকল্পবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই।
সম্প্রতি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, আমাদের দায়িত্ব দেশের সব মানুষকে একটি পরিবারের বন্ধনে আবদ্ধ করা। পরিবারে মতভেদ থাকবে, বাগবিতণ্ডা হবে। কিন্তু আমরা ভাই-বোন, আমরা বাবা-মা। আমরা কেউ কারও শত্রু নই। এটি নিয়ে তৃতীয়বারের মতো ‘পরিবার ভাবনা’র কথা বললেন শান্তিতে নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ। ৮ আগস্ট দেশে ফিরে বিমানবন্দরে তিনি গোটা বাংলাদেশকে একটি পরিবার বলে অভিহিত করেন। শপথ নেওয়ার পরপরই জাতির উদ্দেশে ভাষণেও তিনি বাংলাদেশকে একটি পরিবারের সঙ্গে তুলনা করেন। যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ পৌনে ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনে জাতি যখন বহুধাবিভক্ত, তখন জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে সরকারপ্রধানের বক্তব্য দেশের ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। সরকারপ্রধান সুস্পষ্টভাবে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, ছাত্রদের আহ্বানে তারা দায়িত্ব নিয়েছেন। ছাত্ররা তাদের প্রাথমিক নিয়োগকর্তা। দেশের আপামর জনসাধারণ এ নিয়োগ সমর্থন করেছেন। আমরা ক্রমাগতভাবে সবাইকে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে যাব, যাতে হঠাৎ করে এই প্রশ্ন উত্থাপিত না হয়Ñ আমরা কখন যাব। তারা যখন বলবে আমরা চলে যাব। প্রধান উপদেষ্টা তার বক্তব্যে বন্যাদুর্গত এলাকার বিপদাপন্ন মানুষের ত্রাণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের কথা স্মরণ করেছেন। বলেছেন, ভবিষ্যতে যাতে বন্যা নিয়ন্ত্রণে অভ্যন্তরীণ এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে যৌথভাবে কর্মসূচি গ্রহণ করা যায়, সে লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে সরকার। স্পষ্টভাবে বলেছেন, গণরোষের মুখে ফ্যাসিবাদী সরকারপ্রধান দেশত্যাগ করার পর এখন নাগরিকের মানবাধিকার সমুন্নত থাকবে। উদার গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ও ঘোষণা করেছেন তিনি। যার বাস্তবায়নে উন্মুখ দেশের প্রতিটি মানুষ।