সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:৩০ এএম
স্মরণকালের ভয়াবহ
বন্যায় সম্প্রতি শিক্ষা খাতে বহুমাত্রিক অভিঘাত লেগেছে। তবে ভয়াবহ বন্যায় দুর্গত জেলাগুলোর
মধ্যে প্রায় অর্ধেক জেলায় বিপর্যস্ততার ছায়া অনেক বেশি প্রলম্বিত হয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ বলা হয়েছেÑফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুরসহ কয়েকটি জেলার
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ধীরগতিতে পানি নামার কারণে
এসব জেলার অনেক স্থানে বাড়ি ফেরার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি দুর্গতদের। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে
সহসাই পাঠদানের সম্ভাবনা নেই। তা ছাড়া অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্যাক্রান্ত হওয়ায় ভবন
ও আসবাবপত্রের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। একদিকে অবকাঠামোগত ক্ষতি, অন্যদিকে আশ্রয়কেন্দ্র
হিসেবে ব্যবহৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দুরবস্থার ফলে দেশের উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে শিক্ষাকার্যক্রমে
যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এর নিরসনে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
মাধ্যমিক ও উচ্চ
শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) বন্যাপরবর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়েছেÑদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে
বন্যায় ১ হাজার ২০৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর
মধ্যে ৫৬৫টিতে শিক্ষাকার্যক্রম সহসা চালানো সম্ভব হবে না। তা ছাড়া চট্টগ্রাম অঞ্চলে
৮৪৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই অঞ্চলে ৬১৮টি প্রতিষ্ঠানে
শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হলেও বাকিগুলো সহসা ব্যবহারোপযোগী করা কঠিন। লক্ষ্মীপুরে ৫৪,
চাঁদপুরে ৪০ ও কুমিল্লায় ২৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কুমিল্লায়
মাত্র ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু হলেও বাকিগুলোয় শিক্ষাকার্যক্রম
কবে শুরু করা যাবে, তা অনিশ্চিত। ফেনীর অবস্থাও তথৈবচ।
আমরা জানি, বৈষম্যবিরোধী
ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় কার্যক্রম চালানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি
হয়। টানা বেশ কিছুদিন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় এর বিরূপ প্রভাব বহুমাত্রিক
হয়ে ওঠে। এর ওপর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেগেছে বন্যার অভিঘাত। দেশের
একটি উল্লেখযোগ্য অংশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যমান দুরবস্থার কারণে সেগুলোয় শিক্ষাকার্যক্রম
কীভাবে চালু করা যায়, তা অনেক বড় ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে শিক্ষা খাতে
যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে যে শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাকার্যক্রমই ব্যাহত হয়েছে
বা হচ্ছে তা-ই নয়, দেশের একটি উল্লেখযোগ্য অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক অভিঘাতও
লেগেছে। আমাদের স্মরণে আছে, করোনা দুর্যোগে দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে যেতে
না পারার কারণে এর ভয়াবহ ফল কতটা মারাত্মক হয়ে উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত যূথবদ্ধ প্রয়াসে
ওই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটিয়ে যখন নতুনভাবে শিক্ষার্থীদের যাত্রা হয় এর কিছুকাল পরই আবার
বৈরী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সামগ্রিকভাবে শিক্ষার জন্য যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে,
এর নিরসনের লক্ষ্যে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে।
আমরা মনে করি,
বন্যাক্রান্ত এলাকাগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম অনতিবিলম্বে
শুরু করতে বিকল্প ব্যবস্থার প্রয়োজন। একই সঙ্গে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে
ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য অবকাঠামো সংস্কারে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা
ও এর বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষার্থীদের কাছে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের বিষয়টি কতটা
গুরুত্বপূর্ণ এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। বন্যাদুর্গত এলাকাগুলোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে
পাঠদান-উপযোগী করে তুলতে যে প্রতিকূলতার সৃষ্টি হয়েছে, এর উপশম সহজসাধ্য না হলেও যতটা
দ্রুততম সময়ে সম্ভব করতে হবে। আমরা মনে করি, যেসব এলাকায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের বিষয়টি
আরও সময়ের ব্যাপার, সেসব এলাকার স্তরভিত্তিক শিক্ষার্থীদের বিকল্প উপায়ে পাঠদানের ব্যবস্থা
কীভাবে করা যায় তা ভাবতে হবে।
বন্যার মতো প্রাকৃতিক
বিপর্যয়ে কারও হাত নেই। কিন্তু যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে এর মোকাবিলা তো সংশ্লিষ্ট
দায়িত্বশীল পক্ষগুলোকেই করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আপাতত অনলাইনভিত্তিক শিক্ষাকার্যক্রম
চালানোর সুযোগ যেসব ক্ষেত্রে রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে তা করা যায় কি না, এও চিন্তার মধ্যে
রাখা বাঞ্ছনীয় বলে আমরা মনে করি। অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির বিষয়গুলো নিরূপণ করে অগ্রাধিকার
ভিত্তিতে এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি। কারণ যতটা সম্ভব উপযুক্ত ক্ষেত্র নিশ্চিত
করে কার্যক্রম শুরু করা যায় সে পরিকল্পনা দরকার। বন্যা উপদ্রুত এলাকায় বন্যা চলাকালে
ও পানি নেমে যাওয়ার পর জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে বহুমুখী বৈরী পরিস্থিতিতে শিক্ষাকার্যক্রমের
বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কীভাবে সুরাহা করা যায়, এই ভাবনাচিন্তাও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোরই
করতে হবে। তবে বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনকেও বাড়তি সহযোগিতার হাত
বাড়াতে হবে। বিষয়টি যেহেতু সহজসাধ্য নয় এবং বহুমাত্রিক প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে
সমাধানের পথ খুঁজতে হবে, সেহেতু এ ক্ষেত্রে সুসমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।