× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আর্থিক খাতের অপেক্ষায়

আব্দুল বায়েস

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:২৮ এএম

আব্দুল বায়েস

আব্দুল বায়েস

এক.

‘দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা এসব বৈশিষ্ট্য সব জায়গায় আছে। আমরা পছন্দ করি বা না করি, দুঃখজনকভাবে মানুষের প্রকৃতি এ রকমই। সফল অর্থনীতিগুলো যা করে তা হলো এগুলো যথাসম্ভব নিম্নে রাখা। এ উপাদানগুলোর কোনোটাই কেউ আজ পর্যন্ত নির্মূল করতে পারেনি।’–এলান গ্রিনস্প্যান। (করাপসন, এমবেজেলমেন্ট, ফ্রড, দিজ আর অল কারেক্টারিস্টিকস হুইচ এক্সিস্ট এভরিহোয়ার। ইট ইজ রেগ্রেটেবলি দ্য ওয়ে হিউম্যান ন্যাচার ফাংশন্স, ওয়েদার উই লাইক ইট অর নট। হোয়াট সাক্সেসফুল একোনোমিক্স ডু ইজ কিপ ইট টু আ মিনিমাম। নো ওয়ান হ্যাজ এভার এলিনিনেটেড এনি অফ দিজ স্টাফ।)

গেল বছরগুলোয় বাংলাদেশের আর্থিক খাত যে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় নিমজ্জিত ছিল, সে সম্পর্কে বিতর্কের অবকাশ আছে বলে মনে হয় না। বিশেষত ব্যাংকিং খাতে বিরাজমান ব্যাধিগুলো নিয়ে এমনকি সরকার-সমর্থক বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদরাও বারবার সাবধান করেছিলেন। সবার যুক্তি একইÑঅর্থনীতির হৃৎপিণ্ড বলে খ্যাত ব্যাংকিং খাতে চরদখল চলছে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য সুশাসনের মাধ্যমে এর সুরক্ষা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু এক কান দিয়ে শোনা আর অন্য কান দিয়ে বের করে দেওয়া যেখানে সরকারি ‘কঠোর’ অবস্থান, সেখানে অর্থনীতিবিদদের উপদেশ ছিল উলুবনে মুক্তা ছড়ানোর বই কিছু নয়।

তার পরের ইতিহাস সবার জানা। সরকার পতনের পর ব্যাংকিং খাত নিয়ে যত কেচ্ছাকাহিনি শুনছি এবং পড়ছি, তা রীতিমতো রোমহর্ষক বললে অত্যুক্তি হবে বলে মনে হয় না। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে কেউটের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে। এক সূত্র বলছেন, ইসলামি ব্যাংকের পর্ষদ এবং মালিকানা ছিনতাই করে এস আলম গ্রুপ এ ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণের ৫০ ভাগ হাতিয়ে নিয়েছে। অভিযোগ আছে, প্রাক্তন গভর্নর ফজলে কবির ও পলাতক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার আর্থিক খাতের লুটপাটের মচ্ছবে মদদ দিয়েছিলেন। এমনি আরও অনেক কারণের সঙ্গে যুক্ত ব্যাংকিং খাতে প্রবল রাজনৈতিক এবং অলিগারিক প্রভাবের উপস্থিতি এবং সুশাসনের প্রকট অভাব বাংলাদেশের আর্থিক খাত খাদের কিনারে দাঁড় করায়। অবস্থা দাঁড়ায় আইসিইউতে অক্সিজেন মাস্ক পরা মুমূর্ষু রোগীর মতো।

দুই.

পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাংকিং খাতের বেদনাদায়ক পরিস্থিতি ব্যখ্যা করা এ নিবন্ধের লক্ষ্য নয়; যদিও পরিসংখ্যান ছাড়া যুক্তি মজবুত এবং বিশ্বাসযোগ্য হয় না। তবে দুয়েকটি পর্যবেক্ষণ উল্লেখ না করলেই নয়। অভিযোগ উঠেছে, মাফিয়াদের একটা দুষ্টচক্র এ খাত থেকে ২ লাখ কোটি টাকা লোপাট করে। শুধু তাই নয়, বিদেশে নামে-বেনামে পাচার করেছে লুট করা অর্থের একটা বড় অংশ। ধারণা করা হয়, ব্যাংক খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের ১২-১৫ শতাংশ খেলাপি এবং সার্বিক বিবেচনায় ঋণ খেলাপের পরিমাণ ৪ লাখ কোটি টাকা হতে পারে বলে অনেকের অভিমত। আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেমন তেমন ব্যক্তি খাতের ব্যাংকে পরিবারতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্যে নিয়মকানুন শিথিল করে সব বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। চোরে চোরে মাসতুতো ভাই কিংবা পরস্পরের পিঠ চুলকানির মতো এক পরিবার অন্য পরিবারের ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে উধাও হওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠল। পুরো আর্থিক খাত মাত্র কয়েকটি পরিবারের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ল। এমনিতে, এমনকি সত্তরের দশকের শেষ ভাগ থেকে ‘ঋণ নিলে ফেরত দিতে হয় না’ সংস্কৃতি চালু থাকল।

দ্বিতীয়ত অর্থ মন্ত্রণালয়ে আলাদা ব্যাংকিং ডিভিশন মারফত এ খাতে রাজনৈতিক নিয়োগের এবং সুপারিশের পথ প্রশস্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংককে ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করা হয়। তিন. অভিযোগ আছে বিশেষ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর চাপে টাকা ছাপিয়ে ঋণ দেওয়া কিংবা সংকটে নিপতিত ব্যাংক বাঁচানোর কৌশল অবলম্বন করতেন প্রাক্তন গভর্নর। অথচ মূল্যস্ফীতির সময় এ ছাপানো টাকা আগুনে ঘি ঢেলে দেওয়ার শামিল ছিল। চার. অর্থনীতিবিদদের জোর সুপারিশ সত্ত্বেও সুদের হার ও বিনিময় হার বাজারভিত্তিক না করে ‘ছয়নয়’ এবং ‘নিয়ন্ত্রিত বিনিময় হার’ ভিত্তিতে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার এবং অভ্যন্তরীণ অর্থবাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এবং সব শেষে এবং সম্ভবত সঙ্গত কারণে গেল ক বছরে ব্যাংকিং খাতে ঋণ বিতরণে যে কটা বড় দাগের কেলেঙ্কারি জন্ম নিয়েছে, তার পেছনের কুশীলবদের আইনের আওতায় আনার কিংবা এ সম্পর্কিত শ্বেতপত্র প্রকাশের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। এ কুশীলবরা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান কিংবা ডাইরেক্টর হয়ে দুষ্ট উদ্যোক্তাদের বিপুল ঋণ হাতিয়ে নিতে সাহায্য করেন।

তিন.

তবে হতাশার মধ্যেও আশার আলো আছে যেমন আছে মেঘের পর রোদ। এ ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রয়োজন ছিল একজন দক্ষ নাবিকের। ‘জানি শুধু চলতে হবে এ তরী বাইতে হবে আমি যে সাগর মাঝি রে…’। আর্থিক খাতের সুস্থতা সমুন্নত রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ইতোমধ্যে বেশ প্রশংসনীয় এবং দৃশ্যমান কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং নিতে চলেছেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে তার দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত সবার নজর কাড়ে। তিনি কতটুকু সফল হবেন সে বিচার সময় করবে; কিন্তু তার দৃঢ়চেতা, স্বাধীন এবং তপোনিষ্ঠ প্রচেষ্টার জন্য তাকে অভিনন্দন।

ইতোমধ্যে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের দুর্নীতিবাজ পর্ষদ বিলুপ্ত করে পুনর্গঠন করেছে; কিছু করণীয় নির্ধারণ করেছে কড়া ভাষায়। বন্দুকের নলের মাথায় ছিনতাই করা ব্যাংক যথাস্থানে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। সুসংবাদ যে, বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার জন্য বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা আসতে শুরু করেছে; আশা করা যায় চলমান সুদের হার বৃদ্ধি চাহিদা সংকোচনে অবদান রেখে মূল্যস্ফীতি কমাতে সাহায্য করবে। অর্থনীতিবিদদের দীর্ঘদিনের দাবি ব্যাংকিং কমিশন গঠনের কথাও বলেছেন গভর্নর এবং আমরা আশা করব অচিরেই তা আলোর মুখ দেখবে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টার ত্রুটি রাখবেন না এবং লুটে যাওয়া জব্দ করা অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিক্রি করে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা জানিয়েছেন আহসান এইচ মনসুর।

চার.

আর্থিক খাতের অভিভাবক বাংলাদেশ ব্যাংক নড়েচড়ে বসতে পারছে এটাই সুখবর। অন্তত অবস্থা এমন নয় যে ‘রোম যখন পুড়ছে সম্রাট নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছেন’। অবশ্যই আগুন নেভাতে ফায়ার ব্রিগেড আসছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বসে নেই। কিন্তু এ ক্ষেত্রগুলোয় যত সমস্যা দেখা দিতে পারে তা বিচারিক ব্যবস্থাপনা বা আইন-আদালতে। পূর্ববর্তী সরকার/সরকারগুলোও কিন্তু ঋণখেলাপি হ্রাস করতে উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু আইনের মারপ্যাঁচে ‘ধরিবাজ’ ঋণখেলাপিদের ধরা যায়নি। এমনও হয়েছে বলে শোনা যায়, উদাহরণস্বরূপ, এনবিআর কর ফাঁকির মামলা করেছে যার বিরুদ্ধে, উচ্চ আদালত থেকে স্থিতাবস্থা নিয়ে বিবাদী বছরের পর বছর অপরাধ্মুক্ত থাকতে পেরেছেন এবং পারছেন। সুতরাং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার যে অর্থনীতির অন্যান্য খাতের সংস্কারের সঙ্গে সম্পৃক্ত তা বোধ করি অনুধাবনে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। এমনকি বিশেষ করে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বিচার বিভাগীয় সংস্কার ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে।

পাঁচ.

আর্থিক খাতের জন্য আমরা চাই শিষ্টের লালন ও দুষ্টের দমন। আমাদের চাওয়া তখনই পাওয়া হবে যখন সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে সংস্কারের কাজগুলো সম্পন্ন করবে। তাতে হয়তো কিছু সময় লাগতে পারে কিন্তু সার্বিক সংস্কারের বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, ‘বাংলাদেশ থেকে ব্যাংকের মাধ্যমে প্রচুর অর্থ পাচার হয়েছে। ব্যাংকিং খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাট করা হয়েছে। ফলে অনেক ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়েছে। সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দেওয়া হবে। এজন্য আমরা সংকটে থাকা আট ব্যাংককে প্রয়োজন অনুযায়ী তারল্য সহায়তা দিতে বলেছি। গ্যারান্টার হিসেবে কাজ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমরা সীমিত পরিসরে তারল্য সহায়তা দিতে চাই। সরকার আমানতকারীর কথা ভেবে তাদের পাশে দাঁড়াবে।’

রাখঢাক না রেখে, রক্তচক্ষু কিংবা চাকরির তোয়াক্কা না করে তিনি যে কথাগুলো বলেছেন তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে যায়, এর কম কিছুতেই নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দিলে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব নয়। আমরা সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটা আর্থিক খাতের অপেক্ষায় রইলাম এবং একই সঙ্গে বিগত বছরগুলোয় বিভিন্ন ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি তথা ব্যাংকের তারল্য সংকটের জন্য যারা দায়ী তাদের আইনের আওতায় এনে যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। যত দ্রুত তত মঙ্গল।

হু এভার কমিটস আ ফ্রড ইজ গিলটি নট অনলি অফ দ্য পার্টিকুলার ইঞ্জুরি টু হিম হু ডিসিভস, বাট টু দ্য এলিমিনেশন অব দ্যাট কনফিডেন্স হুইচ কন্সটিটিউটস নট অনলি দ্য ইজ বাট দ্য এক্সিসটেন্স অব সোস্যাইটি স্যামুয়েল জনসন।

  • অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা