সমাজ
মযহারুল ইসলাম বাবলা
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:০৮ এএম
মযহারুল ইসলাম বাবলা
ছোটবেলায় ঈশপের
সারস ও শিয়ালের বন্ধুত্বের গল্পটি পড়েছিলাম। পশু এবং পাখির ভেতর বন্ধুত্ব হয়েছিল বটে,
তবে একে অন্যের ঘরে নিমন্ত্রণ খেতে গিয়ে তারা চরম বিড়ম্বনার মুখে পড়ে। খাবার খেতে পর্যন্ত
পারেনি। পশু ও পাখির এ অসম বন্ধুত্বের সারবস্তু তখন ঠিক বুঝিনি। মানুষে মানুষে শ্রেণিপার্থক্যের
উপমা হিসেবে গল্পটি খাপ খায়। শ্রেণিবিভাজন অতিক্রম করে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্প্রীতি,
হৃদ্যতা, অনাবিল আন্তরিকতার প্রকাশ ও বিকাশ ঘটা যে সম্ভব নয়, জীবন বাস্তবতায় আমরা সেটা
প্রত্যক্ষ করে থাকি।
সমাজে অপ্রতিরোধ্য
গতিতে বিস্তার ঘটেছে বৈষম্যের ও বিচ্ছিন্নতার। একান্নবর্তী পরিবারে ভাই-বোনেরা পরস্পর
যেভাবে আন্তরিকতায় বেড়ে ওঠে, পরবর্তী জীবনে সেই ভালোবাসায় ভাটির টান পড়ে পরিবারের সদস্যদের
ভেতর অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে। একই বাবা-মায়ের সন্তানদের মধ্যে কেউ যদি অন্যদের তুলনায়
বিত্তশালী হয়ে ওঠে তবে অন্য ভাই-বোনদের থেকে তার বিস্তর দূরত্বের সৃষ্টি হয়ে যায়। বদলে
যায় দৃষ্টিভঙ্গি এবং নৈকট্যের জগৎ। অনাত্মীয় হয়ে পড়ে আত্মীয় আর নিকটাত্মীয় হয়ে যায়
অনাত্মীয়। সমাজে আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে আমরা বিত্তবান ও প্রভাবশালীদের পরিচয় দিতে পছন্দ
করি নিজের মর্যাদা বৃদ্ধির তাগিদে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, যার পরিচয় দেওয়া হয় তিনি
কিন্তু তুলনায় নিম্ন অবস্থানের আত্মীয়ের পরিচয় দেওয়া পরের কথা, তাদের স্মরণেও রাখতে
চান না। একটি ঘটনার কথা শুনেছিলাম। বিত্তবান ভাইয়ের বাড়ির মূল ফটকে দাঁড়িয়ে ছিল নিম্নবিত্ত
এক ভাই। পথচারী একজন বিশাল ওই বাড়িটির মালিক কে জানতে চাইলে ফটকে দাঁড়িয়ে থাকা ভাইটি
সগর্বে বলে ওঠেন, ‘কেন, আমাদের বাড়ি।’ পথচারীটি বলেন, ‘ভাই বড্ড তেষ্টা পেয়েছে, এক
গ্লাস পানি খাওয়াবেন?’ ভীষণ বিপদ-সংকোচে পড়ে যায় নিম্নবিত্ত ভাইটি। অগত্যা সত্য কথাটি
বেরিয়ে আসে তার মুখ থেকে। ‘ভাই দুঃখিত, বাড়ির ভেতরে যাওয়ার আমার অনুমতি নেই। আমি অনুমতির
অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি।’ জানি না এটি সত্য ঘটনা, না গল্প। অসত্য নয় বলেই মনে হয়। নিকটাত্মীয়ের
ঘন ঘন চাকরির দাবিতে বাধ্য হয়ে উচ্চমধ্যবিত্ত এক ব্যক্তি নিজেদের যৌথ মালিকানার অনেক
প্রতিষ্ঠানের একটিতে হিসাবরক্ষকের চাকরি দেন। তবে ছেলেটির আত্মীয় পরিচয় গোপন রেখে অংশীদারদের
কাছে পরিচয় দেন গ্রামের ছেলে বলে। ছেলেটি আত্মীয়ের বাড়িতে ঠাঁই পায়নি। মেসে থেকে চাকরি
করছে। এমনকি সেই আত্মীয়র বাড়িতে এক দিনের জন্যও তার প্রবেশ ঘটেনি। এটিও ব্যতিক্রমী
ঘটনা নয়, বিচ্ছিন্নও নয়।
বৈষম্য সব কালেই
ছিল, তবে এত নগ্নভাবে কখনও ছিল না। বৈষম্য এখন মোটা দাগে দৃশ্যমান। একটি অভিজ্ঞতা মনে
আছে। বছর ছয়েক আগে এক সংবাদকর্মী বন্ধুর সঙ্গে গিয়েছিলাম ঢাকার বনেদি এলাকার এক বৃদ্ধাশ্রমে।
বন্ধুটি ঈদ সংখ্যার জন্য পরিবারবিচ্ছিন্ন প্রবীণদের নিয়ে সংবাদ আলেখ্য লিখবেন। বৃদ্ধাশ্রমের
একজন অত্যন্ত বয়স্ক সাবেক আমলার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তিনি। সাক্ষাৎকারের ফাঁকে আমি
ভদ্রলোকের কাছ থেকে জেনেছিলাম তার ব্যক্তিগত কিছু কথা। তিনি কৃষকের সন্তান। পিতা ও
ভাইদের সহায়তায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করার পর ভর্তি হন জেলা শহরের
কলেজে। উচ্চমাধ্যমিকে ভালো রেজাল্টের পর ঢাকায় এসে ভর্তি হন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওঠেন বিশ্ববিদ্যালয়ের
আবাসিক হলে।
অনার্স-মাস্টার্সেও
ভালো রেজাল্ট করে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যোগ দেন সিভিল সার্ভিসে।
পড়াশোনার সমস্ত খরচ কৃষক পরিবার থেকেই জোগান দেওয়া হতো। ঈদ-পার্বণে তিনি পরিবারের কাছে
ছুটে যেতেন। পত্রালাপে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পর পরিবারের
অজান্তে তার ঊর্ধ্বতন এক আমলার মেয়েকে বিয়ে করে পরিবার থেকে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে
যান। শুরুতে কৃষক ভাইয়েরা তার বাড়িতে এলে সবার অলক্ষ্যে কিছু টাকাপয়সা দিয়ে মূল ফটক
থেকেই বিদায় করতেন। এতে ভাইয়েরাও অভিমানে তার কাছে আসা বাদ দেন, তাকে ভুলেই যান। তিনিও
পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। স্ত্রী-সন্তানদের এবং শ্বশুরপক্ষের আত্মীয়দের
নিয়ে পৃথক এক ভুবন গড়ে তোলেন।
এক ছেলে, এক মেয়ের
পিতা তিনি। ছেলেটি স্ত্রীসহ থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়, ডাক্তার মেয়ে স্বামীর সঙ্গে কানাডায়।
স্ত্রী মারা যাওয়ার পর অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডা দুই দেশেই সন্তানদের আশ্রয়ে থাকার ইচ্ছায়
দেশত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু ছেলেমেয়ে কেউ তাকে বেশিদিন বহন না করে দেশে পাঠিয়ে দিয়ে
পিতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য পালনের তাগিদে এ বৃদ্ধাশ্রমে ভর্তি করে দেন। ভদ্রলোক
পেনশন পেতেন। কিন্তু পেনশনের টাকা তোলার ঝামেলায় সন্তানদের পরামর্শে পেনশন বিক্রি করে
দিয়েছেন। ওই টাকা ব্যাংকে আছে। ব্যাংকের সুদের টাকায়ই এ বৃদ্ধাশ্রমের ব্যয় মেটানো হয়।
ছেলেমেয়েরা সময়-সুযোগে ফোনে খোঁজ নেন। তবে দু-তিন মাসে একবারের বেশি নয়। গ্রামের ভাই-বোন,
আত্মীয়স্বজনদের সংবাদ কী? জানতে চাইলে ভদ্রলোক আক্ষেপ ও অনুশোচনায় বলেছিলেন, ‘ওদের
সংবাদ নেওয়ার মুখ আমার নেই। নয়তো এ দুঃসময়ে ওরাই হতে পারত আমার অবলম্বন। আমি ভুল করেছি।
ভুল নয়, মহাভুল।’ ভদ্রলোকের গভীর কষ্ট ও অনুশোচনা মর্মস্পর্শী হলেও তাকে তার জীবনের
অবশিষ্ট সময় এখানেই একাকী কাটাতে হবে। শ্রেণি উত্তরণের কালে নিজ পরিবার, পিতা-মাতা,
ভাই-বোনদের পরিত্যাগ করতে তিনি দ্বিধা করেননি। বৈবাহিকসূত্রে বসবাস ছিল নতুন আত্মীয়-পরিমণ্ডলে;
অনাত্মীয়রা হয়ে উঠেছিল পরম আত্মীয়। আজ এ বৃদ্ধ বয়সে তিনি অনুশোচনা করছেন বটে, তবে যে
কৃষক পিতা ও ভাইদের কষ্টার্জিত অর্থে তার বিদ্যালাভ এবং সমাজে প্রতিষ্ঠা তাদের সঙ্গে
এখন তিনি সম্পর্কহীন। শ্রেণি পরিবর্তনে তিনি পাল্টে গিয়েছিলেন। আমার সংবাদকর্মী বন্ধু
পুরো ঘটনা শুনলেও প্রতিবেদনে এসব কথা উল্লেখ না করে বৃদ্ধাশ্রমে থাকাদের একাকিত্বের
কষ্টের কথাই কেবল লিখেছিলেন।
আরেকটি ব্যক্তিগত
অভিজ্ঞতা। প্রতিবেশী এক পরিবারের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সখ্য ছিল। ওই পরিবারের মেয়েরা
সবাই বড় এবং ছেলে দুজন খুবই ছোট। মেয়েরা আমার বোনদের সঙ্গে একই স্কুলে-কলেজে পড়ত। সদ্যস্বাধীন
দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর চরম আকাল তখন। তাদের পিতার পক্ষে অফিস কামাই করে
দীর্ঘ লাইন ধরে রেশন তোলা, কেরোসিন তেল আনা, ন্যায্যমূল্যের দোকান থেকে সওদা সংগ্রহ
সম্ভব ছিল না। কাকভোরে লাইনে দাঁড়িয়ে ছয়-সাত ঘণ্টা পর রেশন নিয়ে আমি ফিরতে পারতাম।
আমার বোনের অনুরোধে ওই পরিবারের সাপ্তাহিক রেশন, কেরোসিন তেল, ন্যায্যমূল্যের দোকানের
সওদা আমাদের গুলোর সঙ্গে একত্রে আনার অনুরোধ মানবিক বিবেচনায় রাজি হয়ে যাই। সপ্তাহের
রেশন একত্রে তুলে মুটে দিয়ে তাদের গুলো তাদের বাসায় পৌঁছে দিয়ে আমাদের গুলো নিয়ে বাসায়
ফিরতাম। বিনিময়ে তাদের স্নেহ যে পাইনি তা নয়। তারা যথেষ্ট স্নেহ করতেন। পরে তারা নতুন
ঢাকায় চলে যায়। তাদের মেয়েদের প্রত্যেকেরই প্রতিষ্ঠিত পাত্রের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। অনেক
দিন পর তাদের বাড়িতে গেলে প্রায় সব বোন ও বোনের স্বামীর সঙ্গে দেখা। বড় দুই বোনের স্বামীদের
চিনতাম। কিন্তু ছোট চার বোনের স্বামীদের সঙ্গে পরিচয় ছিল না। আমাকে দেখামাত্র আমেরিকাপ্রবাসী
তৃতীয় বোনটি চার বোনের স্বামীর উদ্দেশে বলে ওঠেন, ‘বলেছিলাম না একজন আমাদের রেশনসহ
অনেক কাজ করে দিত। ইনি সেই ব্যক্তি।’ আমি চমকে উঠি, শেষ পর্যন্ত বাজার সরকার? কিছুটা
সময় ভদ্রতায় কাটিয়ে এক ফাঁকে সটকে পড়ি।
কিশোর বয়সে ভালো ক্যারাম খেলতাম। আমার দাদির বাড়ির গৃহকর্মী আলীও আমাদের সঙ্গে খেলত। একদিন সে আমাদের বাড়িতে এলে ওকে নিয়ে ক্যারাম খেলছিলাম, বাড়ির লাগোয়া প্রতিবেশী ও বন্ধু জিয়াকে ক্যারাম খেলার জন্য ডাকতে যাই। জিয়াকে জানাই যে আলী এসেছে। গায়ে জামা চাপিয়ে জিয়া আমার সঙ্গে বের হবে, ঠিক সেই মুহূর্তে জিয়ার আম্মা তীব্র তিরস্কারে জিয়াকে বলে ওঠেন, ‘চাকরবাকরের সঙ্গে ক্যারাম খেলার অত শখ কেন? যাও, ঘরে যাও।’ পাশাপাশি আমাকেও উপদেশ দেন আমি যেন চাকরের সঙ্গে ক্যারাম না খেলি। দেন আত্মমর্যাদা রক্ষার উপদেশও। অনেকে বলেন শিশু-কিশোরদের মধ্যে বৈষম্য থাকার তো উপায় নেই। ওরা বৈষম্যের কী বোঝে! কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, শিশু-কিশোরদের পাশেই রয়েছেন অভিভাবকরা। কোমল মনে তারাই বৈষম্যের বীজ বপন করে দেন। এর প্রভাবে ওই কৈশোরেই বৈষম্যের ধারণা গেড়ে বসে। এবং সেটা আজীবন ধারণ ও পালনের স্থায়ী সংস্কৃতি হয়ে পড়ে। বৈষম্য ও বিচ্ছিন্নতার ছায়া সরাতে চাই যূথবদ্ধ প্রয়াস।