অধিকার
ড. হারুন রশীদ
প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:৫৯ এএম
ড. হারুন রশীদ
বৈষম্যবিরোধী
ছাত্র আন্দোলনের পর এখন সব ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার বিষয়টি জোরেশোরে উচ্চারিত
হচ্ছে। বাস্তবতা হচ্ছে, শ্রমিকদের বঞ্চনার ইতিহাস নতুন নয়। দেশে দেশে, কালে কালে
নানাভাবে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষ। রাতদিন পরিশ্রম করেও
তারা ঠিকমতো মজুরি পায় না। তার ওপর বেতন বকেয়া থাকা, কথায় কথায় শ্রমিক ছাঁটাই,
লকআউট এসব কারণেও শ্রমিকদের দুর্দশার সীমা থাকে না। কর্মস্থলের পরিবেশ নিয়েও রয়েছে
অভিযোগ। অনেক ফ্যাক্টরির কাজের পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত নয়। ঝুঁকিমুক্ত নয় অনেক
কর্মস্থল। ফলে কাজ করতে গিয়ে অনেককে জীবনও দিতে হয়। সঠিক অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা না
থাকায় অনেক শ্রমিকের জীবন গেছে। তামাকজাত কারখানা, চামড়া, লবণ, জাহাজভাঙাসহ এ-জাতীয়
ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে স্বাস্থ্যজনিত নানা সমস্যায় ভুগতে হয় শ্রমিকদের। কিন্তু তারা
কোনো চিকিৎসা সুবিধা পায় না, মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণও পাওয়া যায় না। সার্বিকভাবে
বাংলাদেশে শ্রমিকদের জীবন তাদের জন্য কল্যাণকর নয়, এটা বলা যায়। অনেক ক্ষেত্রে
বেতন-ভাতা আদায়ের জন্য রাস্তায় নামতে হয় তাদের। কিন্তু সেখানেও নানা ঝক্কি।
পুলিশের লাঠিপেটা, মালিকের চোখ রাঙানি। চাকরিচ্যুতির ভয়। এ যেন অমোঘ নিয়তি।
বাংলাদেশে
সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় আছে শিশু শ্রমিকরা। শিশুশ্রম আইনগতভাবে স্বীকৃত নয়। কিন্তু
বিশ্বের কোনো দেশই শিশুশ্রমের বাইরে নয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ সমস্যা
আরও প্রকট। বাংলাদেশের শিশুদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই শিশুশ্রমে নিয়োজিত। মূলত দরিদ্র
পরিবারে অর্থনৈতিক সহায়তার জন্যই এদের শ্রমে নিযুক্ত হতে হয়। আর এরা শুধু দিনান্ত
পরিশ্রমই করে না বরং তাদের এমনসব কাজ করতে হয়, যা তাদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী শিশুদের বাধ্যতামূলক শ্রম, সশস্ত্র সংগ্রামে ব্যবহারের জন্য
বাধ্যতামূলক নিয়োগ, পর্নোগ্রাফিসদৃশ কোনো কাজে ব্যবহার, মাদকদ্রব্য উৎপাদন ও
পাচারে ব্যবহার এবং যেসব ব্যক্তিগত পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে শিশুর স্বাস্থ্য,
নিরাপত্তা কিংবা নৈতিকতার ক্ষতিসাধন করে তা শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বলা
হয়েছে।
বাস্তবতা
হচ্ছে, আমাদের দেশে এক বিরাটসংখ্যক শিশু এ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। ওয়েল্ডিং, লবণ
ও সাবানের কারখানা, বিড়ি ফ্যাক্টরি এমনকি ভারী জিনিসপত্র বহনেও তাদের নিয়োগ করা
হয়, যা তাদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। এমনকি জীবন পর্যন্ত হুমকিগ্রস্ত
করে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের ফলে সারা বিশ্বে প্রতি বছর ২২ থেকে ২৫ হাজার শিশু
প্রাণ হারায়। মধ্যপ্রাচ্যে উটের জকি হিসেবেও শিশুদের ব্যবহার করা হয়, এর মধ্যে
অধিকাংশই বাংলাদেশের শিশু। শিশুশ্রম অপেক্ষাকৃত সস্তা এবং সহজলভ্য হওয়ায়
বাংলাদেশের শিশু শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অপরাধমূলক ও অনৈতিক কাজের সঙ্গে
তাদের যুক্ত করা হচ্ছে জোর করে। বলা হয়, আজকের শিশুই আগামী দিনের সম্পদ। কিন্তু
দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত শ্রমজীবী শিশুদের ভবিষ্যৎ আজ অন্ধকারে নিমজ্জিত।
অধিকারবঞ্চিত এসব শিশুকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে না পারলে দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন কি
আদৌ সম্ভব? অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে গার্মেন্টস সেক্টরকে শিশুশ্রম মুক্ত করা গেছে। তাহলে
অন্যান্য সেক্টর শিশুশ্রম মুক্ত করতে বাধা কোথায়? একদিকে স্কুলগামী শিশুদের বিরাট
অংশ শিশুশ্রমে বাধ্য হচ্ছে, অন্যদিকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা। এ
বৈপরীত্যের মানে কী?
বাংলাদেশে
নারী শ্রমিকরাও বৈষম্যের শিকার। শুধু নারী হওয়ার কারণে একই শ্রমের ক্ষেত্রে পুরুষ
ও নারী শ্রমিকের মজুরিপার্থক্য রয়ে গেছে। ধরা যাক, একজন পুরুষ শ্রমিক সারা দিন
ইটভাঙার কাজ করে ৩০০ টাকা পান, এ ক্ষেত্রে নারী শ্রমিক পাবেন ২৫০ টাকা। এর কোনো
যৌক্তিক ভিত্তি নেই। তবু চলছে এটাই। আসলে নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই
এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। রাজনীতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার, সম্পদ ও
ভূমিতে সমঅধিকার, কর্মসংস্থান, বাজার ও ব্যবসায় নারীর সমান সুযোগ ও অংশীদারি এখনও
নিশ্চিত হয়নি। ফলে বৈষম্য রয়েই যাচ্ছে।বাংলাদেশে রপ্তানি খাতের সর্বোচ্চ স্থানে
অবস্থানকারী গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। অথচ
বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানাগুলোর অবকাঠামো, কর্মপরিবেশ, শ্রমিক নিরাপত্তা ও
অধিকারের ব্যাপারে আন্তর্জাতিকভাবেই চাপ রয়েছে। কিন্তু গার্মেন্টস মালিকরা এসব
বাস্তবায়ন না করায় একের পর এক ঘটছে দুর্ঘটনা। সরকারের কারখানা পরিদর্শকের
কার্যালয়ের লোকবল সংকট, ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ, অবহেলার কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনার
জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি না হওয়া, যৎসামান্য ক্ষতিপূরণ এবং আইনি দুর্বলতা
ইত্যাদি কারণে প্রতি বছর নিহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কিন্তু তাদের পরিবার
ক্ষতিপূরণও পাচ্ছে না। অথচ মারাত্মক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার জন্য ১৯৫৫ সালের আইনে
নিহত শ্রমিকের সারা জীবনের আয়ের সমপরিমাণ অর্থ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রয়েছে।
বৈদেশিক
মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস জনশক্তি রপ্তানি। বিদেশের মাটিতে ঘাম-শ্রম ঝরিয়ে লাখ লাখ
প্রবাসী এ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছে। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, এসব শ্রমিকের
অনেকেই বিদেশের মাটিতে গিয়ে নানা রকম প্রতারণার শিকার হন। যে বেতন দেওয়ার কথা তা
দেওয়া হয় না। যে কাজ করার কথা তার চেয়ে নিম্নমানের কাজ দেওয়া হয়। এ ছাড়া
থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও মানসম্মত হয় না। এসব কারণে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশিদের
যেমন মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়, তেমন তারা কাঙ্ক্ষিত অর্থ উপার্জন করতে না পারায়
রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে শুধু শ্রমিকরাই
ক্ষতিগ্রস্ত হন না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের অর্থনীতিও। দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যদি
তাদের ওপর অর্পিত কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করতেন তাহলে এ সমস্যার উদ্ভব হতো না।
লাখ লাখ টাকা
খরচ করে বিদেশ গিয়ে তারা সামান্য আয় করলে নিজে চলবেন কী আর দেশেই বা পাঠাবেন কী। এ
অবস্থায় প্রতিশ্রুত বেতন যাতে পান শ্রমিকরা তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কথা। অভিযোগের তিরটা
সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসের প্রতিও। বাংলাদেশি শ্রমিক অধ্যুষিত
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় বাংলাদেশ দূতাবাসের অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে শ্রমিকদের
সমস্যাদি দেখা। কিন্তু সমস্যা দেখবে তো দূরের কথা, শ্রমিকরা তাদের সমস্যা জানাতে
গিয়ে দূতাবাস কর্মকর্তাদের দেখাটাও পর্যন্ত পান না। অথচ এসব শ্রমিকের অর্জিত
অর্থেই দূতাবাসওয়ালাদের বেতন-ভাতা হয়। এ বোধটুকু যদি তাদের মধ্যে থাকত তাহলে
শ্রমিকরা কি আর এতটা সমস্যায় পড়েন? এসব বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট
দেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সবার সমন্বিতভাবে কাজ
করা উচিত; যাতে বিদেশে গিয়ে কোনো অবস্থায় বাংলাদেশি শ্রমিকরা ন্যায্য পাওনা থেকে
বঞ্চিত না হন। শুধু শ্রমিক অধিকারই নয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গতিপ্রবাহ ঠিক
রাখতে হলে এটি করতে হবে।
শ্রমিকের অধিকার সংরক্ষণের জন্যই প্রতি বছর পালন করা হয় মে দিবস। আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসেবে দিনটি ১৮৯০ সালের ১ মে থেকে পালিত হয়ে আসছে। শ্রমিকদের রাজনৈতিক অধিকার ও আট ঘণ্টা কাজের দাবি আদায় কেন্দ্র করে ইউরোপে গড়ে ওঠে মেহনতি মানুষের সংগঠন ‘দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক’। এ দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ১৮৮৯ সালে এক সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেয়, ১৮৯০ সাল থেকে শিকাগোয় শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে প্রতি বছর ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস পালন করা হবে। তখন থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পালিত হয়ে আজ তা সর্বজনীনতা লাভ করেছে। আর শ্রমিকের আট ঘণ্টা কাজ করার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মে দিবসে সভা-সেমিনারে উচ্চারিত হয় অগ্নিউদ্গারী ভাষণ। কিন্তু আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এখনও বিদ্যমান পর্বতপ্রমাণ বেকার সমস্যা। শ্রমিকরা অধিকারবঞ্চিত। নানা রকম বৈষম্যের শিকার। সেখানে মে দিবস পালন কেবলি আনুষ্ঠানিকতালব্ধ আয়োজন হয়তোবা। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধতাড়িত সমাজব্যবস্থা এ স্বরচিত অন্ধকারে পথ দেখাতে পারে। এ আত্মোপলব্ধি কাজ করুক সবার মধ্যে।