ডেঙ্গু পরিস্থিতি
ডা. লেনিন চৌধুরী
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:৩৭ এএম
ডা. লেনিন চৌধুরী
ঋতু পরিবর্তনের ছক কিংবা পরিক্রমায় শরৎকাল চলছে। বর্ষা শেষে এ শরতে ডেঙ্গু নিয়ে
উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে তা অনেকটা অনাকাঙ্ক্ষিতই ছিল। ৩১ আগস্ট প্রতিদিনের
বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। গত দুই মাসে
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় চল্লিশের কাছাকাছিÑএ বার্তাও মিলেছে ওই প্রতিবেদনেই।
গত আট মাসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার এবং মৃত্যু ৭৯। মৃতের মধ্যে নারীর সংখ্যাই
বেশি এবং ৬০ শতাংশরই মৃত্যু হয়েছে ঢাকায়। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে আরও বলা
হয়েছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় মশক নিধন কার্যক্রমে ভাটার কারণকেই দায়ী করছেন
বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, এর আগের বছরগুলোয় ডেঙ্গু পরিস্থিতির ক্রমেই
অবনতি ঘটার কারণ একদিকে ছিল জনসচেতনতার অভাব, অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের দায়িত্বহীনতা।
মশক নিধন কার্যক্রম এবং ডেঙ্গুর উৎসস্থল বিনাশে সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল
কোনো সংস্থারই ইতিবাচক কার্যক্রম বা সাফল্য লক্ষ করা যায়নি।

গত বছরের তুলনায় চলতি বছর এডিস মশার ঘনত্ব বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এডিস মশার ঘনত্ব
বাড়া মানে ডেঙ্গুর প্রকোপও বাড়বে। ফলে চলতি বছর ডেঙ্গু একটি বড় সংকট হিসেবে দেখা দিতে
পারে। মৌসুমের শুরুতেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ডেঙ্গুর প্রকোপের বিষয়ে সতর্কতা প্রচারের
পাশাপাশি প্রস্তুতিও রেখেছিল। বর্ষার শুরুতে গরম ছিল। বর্ষায় বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর
থেকে চিকুনগুনিয়া বিস্তারের খবরও পাওয়া গিয়েছিল। আবহাওয়া, জলবায়ু পরিস্থিতি এবং মশার
ঘনত্ব ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের চোখ রাঙানি দিচ্ছে। সতর্ক না হলেই বিপদ।
নিকট অতীতে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর ভিন্ন একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এবার ডেঙ্গু
আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ডেঙ্গুর প্রকোপে নারীর মৃত্যুহার বেশি,
এও আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল। ইতোমধ্যে সতর্কতার বিষয়ে ব্যাপক জোর দেওয়া হলেও প্রথমে
বোঝা জরুরি ডেঙ্গু রোগের জীবাণুবাহক এডিস মশার জন্মহার কেমন, জন্মানোর
জন্য সহায়ক পরিবেশ বা স্থান কতটা আছে এবং এ রকম স্থানের হ্রাস-বৃদ্ধি কেমন। এ কয়েকটি
বিষয় পর্যালোচনা করে ডেঙ্গু সম্পর্কে সম্ভাবনা পরিমাপ করা হয়। চলতি বছরের শুরুর দিকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি
সম্পর্কে জানার জন্য ঢাকা শহরে একটি সমীক্ষা হয়। এ ধরনের সমীক্ষায় এডিস মশার
সংখ্যা যে পদ্ধতিতে হিসাব করা হয়, তাকে বলে ‘ব্রুটো ইনডেক্স’। এবারের
ব্রুটো ইনডেক্স বলে,
এডিস মশার লার্ভা ও প্রাপ্তবয়স্ক মশা গতবারের চেয়ে বেশি। এজন্যই
বলা হচ্ছে, এডিস মশাবাহিত রোগ বেড়ে যাবে।
এডিস মশার কারণে বাংলাদেশে দুটি রোগ দেখা গেছে–ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া।
ধারণা করা হচ্ছে,
এবার চিকুনগুনিয়া রোগীও বেশি দেখা যাবে। এ ক্ষেত্রে
কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। ডেঙ্গুর মতো চিকুনগুনিয়া রোগ নির্ণয়ের
পরীক্ষা দেশে সহজলভ্য নয়। আইসিডিডিআরবিতে আছে। এ সংস্থাটির পাশাপাশি অল্প আরও কিছু জায়গায় আছে। দেশব্যাপী এ ব্যবস্থা
না থাকায় শঙ্কা আরও বেড়েছে। চিকিৎসকরা চিকুনগুনিয়ার
লক্ষণ দেখে চিকিৎসা করছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিছুটা সমস্যা থাকে। মনে রাখতে
হবে, গত বছর ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও অনেক বেশি ছিল। এ সতর্কবার্তা
দায়িত্বশীল সবার তো বটেই, নাগরিকসমাজকেও আমলে নেওয়া প্রয়োজন। আমরা যেন নাগরিকসমাজের
দায়দায়িত্বটুকু ভুলে না যাই। এমন দুর্যোগ মোকাবিলায় যূথবদ্ধ প্রয়াসের বিকল্প নেই। জনসচেতনতা
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জনসচেতনতার অভাবে আমাদের সমাজে অনেক কিছু ঘটে, যা একটু
সচেতন হলেই রোধ করা যায়। তাই সব ক্ষেত্রে এ বোধটুকু পুষ্ট করা খুব জরুরি।
যদি এডিস মশা একজনকে কামড় দেয়, তাহলে
১০০ জনের দেহে ডেঙ্গুর জীবাণু ঢুকবে। হয়তো মাত্র ২০ জনের দেহে এর লক্ষণ ফুটে উঠবে, বাকি ৮০ জনের মধ্যে ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা যাবে না। তাদের বলা হয় লক্ষণবিহীন বা অ্যাসিম্পটোমেটিক ডেঙ্গু রোগী। আবার লক্ষণধারী ২০ জনের
মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের দেহে ডেঙ্গুর মৃদু লক্ষণ থাকে। অনেকে এজন্য চিকিৎসকের
কাছে না গিয়ে প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধ খেয়ে থাকেন এবং অধিকাংশ
সময় সুস্থ হয়ে যান। বাকি ৮-১০ জন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। হাসপাতালে
অল্প কয়েকজন যান। তিন-চার জনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে গোটা দেশের
প্রাদুর্ভাব বোঝা সম্ভব নয়। বাকি ৯৬-৯৭ আক্রান্তের বিষয়টি ভাবনায়
থাকে না। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাটিকে ‘টিপ
অব দ্য আইসবার্গ’ বলা যেতে পারে। গত বছর ডেঙ্গুতে রেকর্ড মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে
রোগীর সংখ্যাও বিবেচনায় রাখা জরুরি। কারণ ওপরের হিসাবটি বিবেচনা করলে গত বছর রোগীর সংখ্যাও ছিল যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর চারটি ধরন বা স্ট্রেইন দেখা গেছে। একবার
যদি কারও দেহে একটি স্ট্রেইনের সংক্রমণ ঘটে, তাহলে
সাধারণত তার দেহে জীবনব্যাপী ওই স্ট্রেইনের প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠে। পরবর্তী অন্য
কোনো স্ট্রেইনের ডেঙ্গু তাকে আক্রমণ করতে পারে, প্রথম
ধরনটি নয়। কিন্তু কারও দেহে দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হলে তীব্রতা সাধারণত বেশি হয়। ফলে
মৃত্যুহারও বেশি হয়। ডেঙ্গুর মৃদু লক্ষণ দেখার পর অনেকেই সতর্ক হন না। প্রধানত দুই ধরনের ডেঙ্গু আছে। প্রথমত, হেমোরেজিক
বা রক্তক্ষরা ডেঙ্গু; দ্বিতীয়ত, সনাতন
বা ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু। রক্তক্ষরার ক্ষেত্রে দেখা যায়, রোগীর
তীব্র ব্যথা হয়তো নেই। প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধ খেয়ে রোগী স্বস্তি
পান। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অনেক সময় প্লাটিলেট
কাউন্ট কমে এবং হঠাৎ রক্ষক্ষরণ শুরু হয়। রক্তক্ষরণ মানে পানিশূন্যতা সৃষ্টি।
যেকোনো স্থানে রক্তক্ষরণ ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি মস্তিষ্কেও তা হতে পারে। ফলে রোগীকে
বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে। রক্তক্ষরণ না হলেও প্লাটিলেট কমে গিয়ে
রক্তনালিগুলো থেকে তরল পদার্থ বেরিয়ে এসে শরীরের বিভিন্ন ফাঁকা জায়গা যেমন ফুসফুস
বা পেটে জমা হয়। ফলে রোগীর শ্বাসতন্ত্রে জটিলতা শুরু হয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় চলে
যায়। ডেঙ্গু হলে যত মৃদু লক্ষণই থাক, পরীক্ষা
করাতে হবে।
প্রয়োজনে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
২০১৯ সালে ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণের পর আমাদের
স্বাস্থ্যব্যবস্থার নীতিনির্ধারক পর্যায়ের অনেকে বলতে থাকেন, এটি
মহামারি নয়। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহামারিবিষয়ক সংজ্ঞাও যেন কেউ কেউ মানতে
চান না। যেন অস্বীকার করলেই বাস্তবতা বদলে যাবে। মহামারি অস্বীকারের মধ্য দিয়ে
ডেঙ্গু ঢাকা শহর থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল। এমনকি গ্রামেও
ডেঙ্গুর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। এভাবে আমাদের জন্য আরও বড় সংকট দেখা দিল। ডেঙ্গুর রূপ পাল্টে গেল। মৌসুমি বা বর্ষার রোগ হয়ে গেল সারা বছরের সংকট।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কিছু কাজ করছে। আধুনিক কিছু ব্যবস্থার প্রয়োগও
হয়েছে। মশা মারতে কামান দাগার মতো এসব পদক্ষেপ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। কারণ,
সাধারণত দুই ধরনের এডিস মশাকে এখানে ডেঙ্গুর জন্য দায়ী করা
হয়। একটি এডিস ইজিপ্টাই বা গৃহবাসী এডিস; আরেকটি বুনো এডিস, যাকে এশিয়ান টাইগারও বলে। বুনো এডিস বাস করে বাড়িঘরের আশপাশে ঝোপঝাড়, গাছের পাতা বা খোঁড়লে জমে থাকা পানিতে। সিটি করপোরেশন হয়তো ঘরবাড়িতে থাকা এডিস
ইজিপ্টাই মারার ব্যবস্থা করছে। কিন্তু বুনো এডিস মারার ক্ষেত্রে
কার্যক্রম নেই।
অনেক দিন ধরে এডিস নিধনে জাতীয় পরিকল্পনার কথা বলা হলেও
সেদিকে যেন কারও ভ্রুক্ষেপ নেই।
সম্প্রতি ডেঙ্গুর টিকা নিয়েও বিস্তর আলোচনা চলছে। ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে
পরীক্ষানিরীক্ষা ইতোমধ্যে মোটামুটি সফল। মার্কিন টিকা নিয়ে কিছু সমস্যা ছিল। তবে
সম্প্রতি জাপানে যে টিকা আবিষ্কৃত হয়েছে, থাইল্যান্ডের মাহিদল
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় দেখা গেছে, ডেঙ্গুর চারটি ধরনের বিরুদ্ধেই
এ টিকা সফল। ইতোমধ্যে ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে এর প্রয়োগও ঘটেছে। আপাতত এ ভ্যারিয়েন্টের
টিকা দেশে ডেঙ্গুর হটস্পটগুলোয় প্রয়োগ করা
যায়। স্কুলগামী শিশুদের প্রথমে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য
মন্ত্রণালয়ও ভাবছে। এই টিকাটি নিয়ে ভয়ের কারণ নেই। কারণ বিশ্ব
স্বাস্থ্য সংস্থা এর অনুমোদনও দিয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ চিকিৎসার যথাসাধ্য কাজ করছে। চিকিৎসক, নার্সসহ প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু রোগের উৎস খোলা থাকলে চিকিৎসাব্যবস্থা উপাদেয় হয় না। এজন্যই ডেঙ্গুর উৎস বন্ধ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে জনগণকেও যুক্ত করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কোনো কারণ নেই। আমি মনে করি, জাতীয়ভাবে তিন দিন উদ্যোগ নিলেই এডিস মশার বেশির ভাগ উৎস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এক্ষেত্রে জনসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। যূথবদ্ধভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কাজ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলোÑনজর দিতে হবে একেবারে উৎসে। এক্ষেত্রে জনসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। সিটি কর্পোরেশন তাদের দায় এড়াতে পারে না। অতীতে আমরা সিটি কর্পোরেশনের ব্যর্থতা প্রত্যক্ষ করেছি এবং এখনও করছি। এডিস মশা তিন দিনের জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে এবং সে ডিম থেকে বাচ্চা হয়। তাহলে টানা তিন দিন যদি ঘরে-বাইরে দুই ধরনের মশা নিধনে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক বা স্বেচ্ছাসেবী সংঠনের কর্মীদের যুক্ত করে অভিযান চালানো যায়, ডেঙ্গু মোকাবিলা কঠিন নয়। ম্যালেরিয়ার জন্য জাতীয় পরিকল্পনা হয়েছিল, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে যা এখনও দৃশ্যমান নয়।