× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সম্পাদকীয়

কালো টাকা সাদা না করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৪ ০৮:৩১ এএম

কালো টাকা সাদা না করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত

আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতা জনকদের মধ্যে অন্যতম বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন একাধারে একজন লেখক, চিত্রশিল্পী, রাজনীতিক, বিজ্ঞানী, সংগীতজ্ঞ, উদ্ভাবক, রাষ্ট্রপ্রধান, আন্দোলনকারী এবং কূটনীতিক। তিনি যথার্থই বলেছিলেন, ‘টাকা কখনও একজন মানুষকে সুখী করেনি, হবেও না। একজন মানুষের যত বেশি আছে, সে তত বেশি চায়। একটি ভ্যাকুয়াম পূরণ করার পরিবর্তে, আরেকটি ভ্যাকুয়াম তৈরি করে।’ বেঞ্জামিনের উক্তিটি আমাদের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজের ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য। আমাদের দেশে অবৈধপথে নানাভাবে অর্থ উপার্জনের সুযোগ কতটা অবারিত এর বিস্তর নজির রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সভায় কালো টাকা সাদা না করার সুযোগ বাতিলে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাকে আমরা স্বাগত জানাই। ৩০ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর শীর্ষ প্রতিবেদনে বিগত কয়েক বছরের কালো টাকা সাদা করার এনবিআর সূত্রে যে তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে তাতে সহজেই প্রতীয়মান হয়, এখানে অবৈধ আয়ের উৎস কত বিস্তৃত।

অর্থনীতিবিদ ও সচেতন নাগরিকদের অনেকেই ইতঃপূর্বে বহুবার বলেছেন, কালো টাকা সাদা করার বিশেষ সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে সৎ করদাতাদের প্রতি শুধু অবিচারই করা হয়নি, একইসঙ্গে দুর্নীতির পথও সুগম করে দেওয়া হয়েছে। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরাও বলেছিলাম, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে সমাজে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করার যে সুযোগ বাজেটে বারবার রাখা হয়েছে এর সুদূরপ্রসারী ফল কোনোভাবেই ভালো হতে পারে না। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সংবিধান পরিপন্থি। বিলম্বে হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে এই সুযোগ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত দেশ-জাতির জন্য অত্যন্ত মঙ্গলজনক বলে আমরা মনে করি এবং এজন্য সরকারকে সাধুবাদ জানাই। চলতি অর্থবছরের বাজেটেও ১৫ শতাংশ নগদ অর্থ দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার যে ব্যবস্থা পুনর্বার প্রবর্তিত করা হয়েছিল এর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন মহল থেকে কঠোর সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। আমরা যখন আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বারবার তাগিদ দিয়েছি তখনও এমন সিদ্ধান্ত বিস্মিত, যুগপৎ প্রশ্ন দাঁড় না করিয়ে পারেনি। কালো টাকা সাদা করার অনৈতিক সুযোগ দিয়ে যে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়েছিল এর কঠোর সমালোচনা সত্ত্বেও কেন এই সুযোগটি বহাল রাখা হয়েছিল সেই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর বিগত সরকারের নীতিনির্ধারকদের তরফে মেলেনি। বরং লক্ষ করা গেছে এমন প্রশ্নের তারা যে উত্তর দিয়েছেন, তা নিতান্তিই খোঁড়া যুক্তি বই কিছু ছিল না।

অবৈধ পথে উপার্জন ও দুর্নীতিকে যখন রাষ্ট্র উৎসাহিত করে তখন সংগতকারণেই বৈধ পথে অর্থ উপার্জনের বিষয়টি নিরুৎসাহিত হয়ে পড়তে বাধ্য। চলতি অর্থবছরের বাজেটের অর্থবিলে এও বলা হয়, উৎস যাই হোক উপার্জিত টাকা এর আগে আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করে কর না দিয়ে থাকলে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে তা বৈধ বলে প্রদর্শন করা যাবে এবং এ হারে কর দিলে আয়কর বা অন্য কোনো সংস্থা এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবেন না। এমন বিধান রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য আখেরে কোনো কল্যাণ ডেকে আনতে পারে নাÑ তাও বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়েছিল। সম্প্রীতি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর তরফে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিলের আহ্বান জানানো হয়। কালো টাকাকে অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসতে বিভিন্ন অর্থবছরে নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে দায়মুক্তির আওতায় আনার সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই সুবিবেচনাপ্রসূত ছিল না। আমরা জানি, অনেক দিন ধরেই আমাদের অর্থনীতি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে বিশেষ করে আর্থিক খাতে নৈরাজ্যের যে পথ সুগম করে দেয় তাতে অনেক শুভ উদ্যোগই বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দুর্নীতি আমাদের সমাজের অন্যতম একটি ব্যাধি এবং এর বহুমাত্রিক বিরূপ ফল দেশ-জাতিকে ভোগ করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে একদিকে বিগত সরকার ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’র কথা বলেছে কিন্তু কার্যত বাজেটে বা আর্থিক খাতে নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এমন সুযোগ করে দেওয়া হয়, যাতে দুর্নীতির পথ আরও সুগম হয় এবং কার্যত তা-ই হয়েছিল। আমরা মনে করি, দুর্নীতি নির্মূলে সবার আগে জরুরি কাঠামো ও পদ্ধতিগত সংস্কার। একই সঙ্গে আমরা প্রত্যাশা করি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কারের পাশাপাশি কঠোর অভিযান পরিচালনা করবে।

দুদকের সক্ষমতার ঘাটতি আমরা রাজনৈতিক সরকারের আমলে লক্ষ করেছি। দুদকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় উচ্চ পর্যায়ে যারা আছেন তাদের সিংহভাগ দুর্নীতির সহায়ক শক্তিÑ এই অভিযোগও রাজনৈতিক সরকারের আমলে দফায় দফায় উঠেছে। এও অভিযোগ উঠেছিল, দুর্নীতি দমন কমিশনের হাতে যে ক্ষমতা রয়েছে কিংবা তাদের কাজের ক্ষেত্রে যেভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয় তা ছিল অনভিপ্রেত-অনাকাঙ্ক্ষিত। আমাদের স্মরণে আছে, নিকট অতীতে দুর্নীতি দমন কমিশনের জনৈক চেয়ারম্যান তার মেয়াদের অন্তিমকালে বলেছিলেন, ‘দুদক নখদন্তহীন বাঘ’। আমরা আশা করি, দুদককে ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি অবৈধ পথে আয়ের উৎস সন্ধানে যথাযথ প্রতিবিধান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের কঠোর অবস্থান দৃশ্যমান করে তুলবে। কালো টাকা সাদা করার সুবিধা স্থায়ী হতে পারে নাÑ এই অভিমতও বিভিন্ন মহল থেকে সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল। এমনকি প্রাক-বাজেট আলোচনায় বিশ্লেষকরা এ ব্যাপারে নানা পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু এসব কোনোকিছুই সরকার আমলে না নিয়ে অবাধে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে জাতীয় অর্থনীতির জন্য বিরূপ ফল ডেকে আনে।

আমরা মনে করি, শাসনব্যবস্থা কিংবা রাষ্ট্রপরিচালনার পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে সত্যিকার অর্থেই সংস্কারের দরজা উন্মুক্ত হয়েছে। জনপ্রত্যাশা হলো, সরকার সংস্কারের পথ অবলম্বন করে অর্থনীতির প্রতিবন্ধক সবকিছু দূর করে দুর্নীতিবাজদের অপ্রদর্শিত আয়ের কঠোর প্রতিবিধান নিশ্চিত করবে। কালো টাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ দিয়ে অর্থনীতির যে সর্বনাশ করা হয়েছে এর পুনরুদ্ধার করতে অন্তর্বর্তী সরকারকে অনতিবিলম্বে ব্যবস্থা নিতেই হবে। আর কালো টাকা তৈরি করতে দেওয়া হবে নাÑ সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টার এমন দৃঢ় প্রত্যয়েরও আমরা সাধুবাদ জানাই। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়Ñ এমন পর্যবেক্ষণ কিংবা মতামত উপেক্ষা করেও যে হীনস্বার্থ চরিতার্থকরণের উদ্দেশ্যে এই বিধান রাখা হয়েছিল এরও যথাযথ প্রতিবিধান নিশ্চিত করতে হবে। কালো টাকার উৎস খুঁজে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান আরও অনমনীয় হোক। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা