× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মিয়ানমার

রাখাইনে চলমান গণহত্যা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যৎ

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৪ ০৮:২৯ এএম

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

২৫ আগস্ট পালিত হলো রোহিঙ্গা জেনোসাইডের এবং বাংলাদেশে আসা বড় মাপের রোহিঙ্গা ঢলের সপ্তম ব‍‍র্ষপূতি। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নি‍‍র্মম জেনোসাইডের শিকার হয়ে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে। কিন্তু সাত বছর পরে এসেও মিয়ানমারে বসবাসরত রোহিঙ্গারা নতুন করে জেনোসাইডের শিকার হচ্ছে। মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে যখন রোহিঙ্গাদের ওপর পুনরায় জেনোসাইড শুরু হয়েছে, হাজার হাজার রোহিঙ্গা যখন রাখাইন থেকে জান নিয়ে পালানোয় ব্যস্ত, তখন বাংলাদেশে বসবাসকারী প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কোন জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটা এক বড় প্রশ্ন আকারে হাজির হয়েছে এবারের জেনোসাইডের ব‍‍র্ষপূ‍র্তির সমাবেশে। এ পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসন কোনোভাবে সম্ভব নয় বলে মনে করছেন রোহিঙ্গা নেতারাও। উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কমিউনিটি নেতা রজ্জাক আলী বলেন,মিয়ানমারে আরাকান আর্মি ও জান্তার লড়াইয়ের কারণে মংডু শহর এবং তার আশপাশে থাকা কয়েক লাখ রোহিঙ্গার জীবন এখন বিপন্ন। ওখানে রোহিঙ্গাদের ঘর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। জীবন বাঁচাতে তারা এদিক-ওদিক ছুটছে। অনেকেই হতাহত হচ্ছে। অনেক মরদেহ নাফ নদ দিয়ে এপারেও ভেসে আসছে। অনেকেই গোপনে সীমান্ত অতিক্রম করে এপারে পালিয়ে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা ফিরতে পারবে না।’ (প্রতিদিনের বাংলাদেশ : ২৫.০৮.২০২৪)

এ রকম পরিস্থিতিতে উখিয়া এবং টেকনাফে অবস্থিত ২৩টি অস্থায়ী শরণ‍া‍র্থী ক্যাম্পের ১১টিতে রোহিঙ্গা জেনোসাইড স্মরণ করে রোহিঙ্গাদের জমায়েত হয়েছে। সবচেয়ে বড় সমাবেশ হয়েছে কুতুপালং ক্যাম্প-৪-এ। সে সমাবেশে উপস্থিত রোহিঙ্গারা পাঁচ দফা দাবি উপস্থাপন করেনÑএক. অবিলম্বে আরাকানে রোহিঙ্গাদের ওপর সব ধরনের গণহত্যা, সহিংসতা ও হামলা বন্ধ করতে হবে। দুই. নাগরিকত্বসহ মিয়ানমারের বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের দ্রুত প্রত্যাবাসন করাতে হবে। তিন. জাতিসংঘের মাধ্যমে মিয়ানমারের অন্যান্য জাতিগত জনগণের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জীবিকা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। চার. মিয়ানমার জান্তা এবং আরাকান আর্মি উভয়কেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জাতিসংঘের কাছে জবাবদিহি করতে হবে এবং পাঁচ. ২০১৭ সালে সংঘটিত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জেনোসাইডের সুষ্ঠু বিচার করতে হবে।

নাফ নদের এপারে যখন এসব দাবিদাওয়া ও জমায়েত-সমাবেশ চলছে, ওপারে চলছে নি‍র্বিচার গুলি। প্রতিদিনের বাংলাদেশে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ‘১৮ জুন মঙ্গলবার সকালে মিয়ানমারের ওপার থেকে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ ভেসে আসতে শুরু করে; যা শনিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত থেমে থেমে অব্যাহত ছিল। এর আগে ১৫ জুন শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ছয়টি ও রাত সাড়ে ১২টার দিকে থেমে থেমে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছিল। ১৬ জুন রবিবার ও ১৭ জুন সোমবার (ঈদের দিন) আর কোনো শব্দ শোনা যায়নি। ঈদের পরদিন ১৮ জুন মঙ্গলবার থেকে আবারও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে থেমে থেমে। সর্বশেষ শুক্রবার থেকে মাঝরাতে মর্টার শেল ও শক্তিশালী গ্রেনেড বোমার বিস্ফোরণে ঘুম ভাঙল টেকনাফ সীমান্ত বাসিন্দাদের। শুক্রবার রাত দেড়টার পর মিয়ানমার সীমান্তের ওপার থেকে বিকট শব্দ ভেসে আসে। মাঝরাত থেকে শনিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত থেমে থেমে মুহুর্মুহু বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। শনিবারের পর থেকে বিস্ফোরণের শব্দ বন্ধ ছিল। মঙ্গলবার থেকে ফের শোনা যাচ্ছে।’ এভাবেই একটা আতঙ্কময় অবস্থা বিরাজ করছে সীমান্তে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তব‍‍র্তী এলাকার প্রায় ১০ হাজার জেলের মাছ ধরার পেশা দী‍র্ঘদিন ধরে বন্ধ। সীমান্ত বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত আরও হাজারো মানুষের জীবনজীবিকা সংকটের মুখে। এ রকম অবস্থায় না হচ্ছে বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছাপ্রত্যাবাসনের কোনো ব্যবস্থা, না হচ্ছে সীমান্তব‍‍র্তী মানুষের জীবনজীবিকার সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান। এ রকম পরিস্থিতিতে পালিত হলো রোহিঙ্গা জেনোসাইডের ও রোহিঙ্গা ঢলের সপ্তম ব‍‍র্ষপূ‍র্তি।

এরই মধ্যে রোহিঙ্গা শরণা‍র্থী শিবিরগুলোয় বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যকার নিজেদের অন্ত‍‍‍র্দ্বন্দ্বে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ক্রমাবনতিশীল। কক্সবাজার জেলা পুলিশের তথ্যমতে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে ২০১৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ১১ ধরনের অপরাধে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক ৩ হাজার ৮৩২টি মামলা হয়েছে। যার মধ্যে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৩৫টি। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত খুনের মামলা হয়েছে ৩২টি। এ সাত মাসে অস্ত্র উদ্ধারের মামলা ৯৪টি, মাদকের মামলা ১৬০টি।’ সাত বছরে শুধু রোহিঙ্গারা নিজেরা খুনোখুনি করে নিজেদের হত্যা করেছে প্রায় ২৩৫ জনকে; যা প্রকারান্তরে ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের চলমান সংঘাত একদিকে যেমন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন পুরোপুরি অনিশ্চিত করে তুলছে, অন্যদিকে নিজেদের মধ্যকার অর্ন্ত‍দ্বন্দ্বে বাংলাদেশের মানুষের কাছেও রোহিঙ্গাদের একটি সন্ত্রাসী চরিত্র উপস্থাপিত হচ্ছে; যা স্থানীয় আত্তীকরণের ন্যূনতম সম্ভাবনাকে কবর দিয়ে দিচ্ছে। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে পালিত হলো রোহিঙ্গা জেনোসাইডের ও রোহিঙ্গা ঢলের সপ্তম বর্ষপূ‍র্তি।

সম্প্রতি বাংলাদেশে ঘটে গেছে ছাত্র-জনতার একটি ঐতিহাসিক বিপ্লব। সরকার পরিব‍‍র্তন হলো। প্রায় ৬৫০ জনের জীবন, ৪ শতাধিক মানুষের অন্ধত্ব ও সহস্রাধিক মানুষের পঙ্গুত্বের বিনিময়ে একটি নতুন বাংলাদেশের জন্ম হলো। গঠিত হলো একটি অন্ত‍‍র্ব‍‍র্তী সরকার। একটি নতুন বাংলাদেশের যাত্রা হলো। নতুন সম্ভাবনা, নতুন আকাঙ্ক্ষা, নতুন সংস্কারের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা হলো নতুন বাংলাদেশের। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুটাও নতুন করে ডিল এবং নতুন করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও শুরু করতে হবে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কামনা করে রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, এ দেশে কোন সরকার এলো বা গেল সেটা আমাদের মাথাব্যথার বিষয় নয়। তবে আমরা চাই এখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকুক। কারণ এখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলে আমাদের আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে বেগ পেতে হবে। আমরা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই। আমরা এ দেশে আর কত বছর থাকব!’ ফলে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে রোহিঙ্গাদের তেমন কোনো উদ্বিগ্নতা না থাকলেও তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কামনা করে যাতে আন্ত‍‍র্জাতিক সহযোগিতার ধারা অব্যাহত থাকে এবং তাদের বক্তব্য আন্ত‍‍র্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে যথাযথ পৌঁছানো যায়। তবে বিভিন্ন রোহিঙ্গা সংগঠন এবং আন্ত‍‍র্জাতিকভাবে পরিচিত অনেক রোহিঙ্গা ডায়াসপোরা অ্যাকটিভিস্ট বাংলাদেশে নতুন গঠিত অন্ত‍‍র্ব‍‍র্তী সরকারকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন। অনেক রোহিঙ্গা ডায়াসপোরা অ্যাকটিভিস্ট মনে করেন, অন্ত‍‍র্ব‍‍র্তী সরকারের প্রধান প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া ব্যক্তি। তিনি নিশ্চয় রোহিঙ্গাদের জন্য সত্যিকার শান্তি ফিরিয়ে আনবেনÑতাদের এই প্রত্যাশা অমূলক নয়।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, রাখাইনের মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যেভাবে নিয়মিতভাবে আরাকান আ‍‍র্মির হাতে মার খাচ্ছে এবং পরাজিত হচ্ছে, সেখানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনা করা খুব একটা কাজের কাজ হবে বলে আমার মনে হয় না। আবার আরাকান আ‍‍র্মির সঙ্গেও বাংলাদেশের পক্ষে কোনো ফ‍রমাল ডায়ালগ শুরু করা সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আরাকান আ‍‍র্মির সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সম্প‍‍র্ক ব‍‍র্তমানে খুবই খারাপ অবস্থায় আছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও ফরটিফাই-রাইটস প্রভৃতি আন্ত‍‍র্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বা‍র্মিজ সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর যেভাবে নি‍‍র্বিচারে অত্যাচার, নি‍র্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, আরাকান আ‍‍র্মি ২০২৪ সালে এসে সেই একই কায়দায় এবং একই তরিকায় অত্যাচার, নি‍‍র্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে।

ফলে সময় ও পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই রাষ্ট্রেই উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিয়েছে। তাই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও অনেকটা অনিশ্চয়তার দিকে যাত্রা করেছে এবং নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই এ মুহূ‍র্তে খুব একটা আশার বাণী শোনানো নতুন সরকারের পক্ষে হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু রোহিঙ্গা জেনোসাইডের ও রোহিঙ্গা ঢলের সপ্তম ব‍‍র্ষপূ‍র্তিতে রোহিঙ্গারা আশা করে তাদের পাঁচ দফার ভিত্তিতে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। সেজন্য দুই রাষ্ট্রকেই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের তরফ থেকে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় আমরা কখনই আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি আমরা দেখিনি। নতুন সরকারের প্রধান উপদেষ্টাও ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করবেন। আমরা আশা রাখতে চাই, রোহিঙ্গা সমস্যার অচিরেই একটি সমাধানের আলো দেখবে।

  • নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা