পরিপ্রেক্ষিত
হাজেরা শম্পা
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৪ ০৮:২৩ এএম
বাংলাদেশ প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হলো সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে।
টুর্নামেন্টের ষষ্ঠ আসরে এসে বাংলাদেশের যুবারা প্রথমবারের মতো শিরোপা জয় করল। এর আগে
২০২২ সালে আমাদের যুবাদের ফাইনালে ওঠার অভিজ্ঞতা ছিল। সেবার স্বপ্নভঙ্গ হয় ভারতের কাছে
হেরে। নেপালের আনফা কমপ্লেক্স স্টেডিয়ামে স্বাগতিক সমর্থকদের সামনে ৪-১ গোলের ব্যবধানে
নেপালকে হারিয়ে শিরোপা জয় করে বাংলাদেশ। শিরোপা জয়ের পর অধিনায়ক এই জয় বৈষম্যবিরোধী
ছাত্র আন্দোলনে নিহতদের প্রতি উৎসর্গ করেছেন। ফুটবলে শক্তিশালী দল ভারত ও নেপালকে হারিয়ে
দেশবাসীকে গর্বিত করেছে তরুণরা। আমাদের অনেকের কাছেই এ জয় এভারেস্ট জয়ের সমতুল্য। সাফজয়ী
যুব দলকে আন্তরিক অভিনন্দন।
বিগত কয়েক বছরে ক্রীড়াক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বেশি সাফল্য এসেছে ক্রিকেটে।
সে তুলনায় ফুটবল ছিল অনেকটাই ম্লান। অথচ ফুটবলই ছিল আমাদের প্রধান খেলা। ফুটবলের ঐতিহ্য
বাঙালিকে মাতিয়ে রেখেছিল। ফুটবলের হারানো অতীত ও গৌরবের কাহিনীও আজ রূপকথার মতো। বিশ্বাসই
হতে চায় না। অথচ রাজধানী তো বটেই জেলাশহরগুলোও ছাপিয়ে গ্রামেও একসময় নিয়মিত ফুটবল আসর
বসত। দেশের এমন অঞ্চল খুঁজে পাওয়া মুশকিল যেখানে বছরে অন্তত একবার ফুটবলকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতার
আয়োজন হতো না। গ্রামে গ্রামে, স্কুলে স্কুলে এমনকি পাড়ায় পাড়ায় গড়ে ওঠা ক্লাবগুলোর
মধ্যেও আন্তঃপ্রতিযোগিতা হতো। বসত ফুটবলের জমজমাট আসর, যা উপভোগ করতেন এলাকার মানুষ।
আর নিয়মিত ফুটবলের এই আয়োজনগুলো থেকেই বেরিয়ে আসত জেলা দলের ফুটবলার, রাজধানীর নামি
ক্লাবগুলোর ফুটবলার এবং জাতীয় দলের খেলোয়াড়।
বিপুল উৎসাহ, উদ্যম, উদ্দীপনায় ভরা সেই দিনগুলো এখন যেন শুধুই স্মৃতি।
ক্রিকেট জোয়ারে আমরা যেন ভুলতেই বসেছিলাম ফুটবলের গৌরব।
সংগঠকদের অবহেলা এবং আনাদরে ফুটবল হারিয়ে যেতে বসেছিল। জেলা বা উপজেলা
পর্যায় তো দূরের রাজধানীর ক্লাবগুলোর নিয়মিত আসরও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। দ্বিতীয় বিভাগ,
প্রথম বিভাগসহ বিভিন্ন লিগগুলোও অনিয়মিত এবং জৌলুস হারিয়ে ফেলেছিল। একসময় আমাদের ক্লাব
ফুটবলেও বিদেশি ফুটবলারদের দাপট ছিল লক্ষ করার মতো। তাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের
ফুটবলাররাও সমৃদ্ধ হয়েছেন। ঘরোয়া ফুটবলের মতো আন্তর্জাতিক ফুটবলেও আমাদের অংশগ্রহণ
ছিল চোখে পড়ার মতো। ফুটবলের প্রতি মানুষের আগ্রহ এবং ভালোবাসায় টান পড়েনি, কিন্তু ফুটবলকে
শ্রীহীন করে তুলেছেন কিছু হীনস্বার্থের মানুষ। সেই জায়গা থেকে আমাদের ফুটবল আবার বেরিয়ে
আসবেÑ এমন আশা জাগিয়ে তোলে আমাদের যুবাদের সাফল্য।
নেপালে অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্টে দেশের পক্ষে সর্বোচ্চ গোলদাতা মিরাজুল, তিনি টুর্নামেন্টেরও সর্বোচ্চ গোলদাতা। প্রথম গোল করেছিলেন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে। এর পর দ্বিতীয় ম্যাচে নেপালের বিপক্ষেও গোল করেন। ফাইনালেও করেছেন দুই গোল। মোট ৪ গোল করে মিরাজুল টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলদাতা। দলের আরেক ফুটবলার রাব্বি হোসেন প্রিমিয়ার লিগেই নিজেকে চিনিয়েছিলেন। সেই ধারাবাহিকতা তিনি ধরে রেখেছেন সাফ ফুটবলেও। দেশের হয়ে নেপালে অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জনে যুব দলের আক্রমণের প্রাণভোমরা হয়ে উঠেছিলেন। দেশের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ চারটি ম্যাচে কখনও তিনি রাইট উইং, কখনও লেফট উইং, কখনও-বা মাঝমাঠে সক্রিয় ছিলেন। সাফ অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্টে শিরোপা জয়ের মাধ্যমে আমাদের ফুটবলে আবার আশা জাগছে। ফুটবল আবার তার হারানো গৌরব ফিরে পাক, এ প্রত্যাশা ফুটবলপ্রেমীদের। যথাযথ প্রশিক্ষণ, পরিচর্যা ও প্রণোদনার মাধ্যমে আমাদের ফুটবল ফিরে পেতে পারে তার হারানো গৌরব। আগামীতে দক্ষ সংগঠকদের হাতে এগিয়ে যাক আমাদের ফুটবলÑ এই প্রত্যাশা।