আন্দোলন-কর্মসূচি
এলিনা খান
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৪ ০৮:২১ এএম
এলিনা খান
গত জুলাইয়ের প্রথম
সপ্তাহে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে।
শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক এ আন্দোলন দমনপীড়নের মাধ্যমে থামানোর চেষ্টা হয়। রাজনৈতিক তৃতীয়
পক্ষ আখ্যা দিয়ে এ আন্দোলনের যৌক্তিকতাও দাবিয়ে রাখার চেষ্টা হয়। পরে শিক্ষার্থীরা
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মতো একটি মঞ্চ গড়ে তোলে। এ মঞ্চ দফায় দফায় তাদের দাবি
জানায়। কিন্তু সাবেক সরকার তখনও দমনপীড়নের পথেই চলতে থাকে। বলপ্রয়োগ করে ক্ষমতায় থাকার
চেষ্টা অব্যাহত রাখে। এক পর্যায়ে এ আন্দোলন এক দফায় গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ফলে সরকারকে
পদত্যাগ করতে হয়। সেনা মধ্যস্থতায় অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব
নেওয়ার পর তাদের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। তাদের সামনে রয়েছে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ
এবং দায়িত্ব। দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় রয়েছে যেদিকে
মনোযোগ গভীর করার কোনো বিকল্প নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনও পুরোপুরি কার্যকর
হয়নি সংবাদমাধ্যমে তা বলা হয়েছে।

জননিরাপত্তা এখনও
দেশের অনেক স্থানেই নিশ্চিত করা যায়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ করে পুলিশের
প্রতি জুলাই ও আগস্টে জনআস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। তাদের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য
কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বটে তবে তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত করতে
হবে আস্থা। ইতোমধ্যে পুলিশ বাহিনীতে সংস্কারের কিছু দাবি উত্থাপিত হয়েছে। সেগুলোর অনেক
কিছু বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। তবে এ মুহূর্তে যেগুলো বাস্তবায়নযোগ্য সেদিকে মনোযোগ
দেওয়া জরুরি। আমরা দেখছি, অনেক স্থানেই শিক্ষার্থী এমনকি এলাকার মানুষ নিরাপত্তা নিশ্চিত
করার জন্য সজাগ রয়েছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেভাবে জননিরাপত্তা নিশ্চিত
করতে পারে সাধারণ শিক্ষার্থী বা মানুষের পক্ষে তা অনেকাংশে সম্ভব নয়। ফলে অনেক স্থানে
বিশৃঙ্খলার শঙ্কাও থেকে যায়। এসব শঙ্কা দূর করার স্বার্থেই জননিরাপত্তার দিকে মনোযোগ
বাড়াতে হবে।
আমাদের বিচারব্যবস্থা
অনেকাংশেই স্থবির হয়ে পড়েছিলÑএই জনঅভিযোগ এড়ানো যাবে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে
না পারলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজও অনেকাংশে আটকে থাকে। তখন বিচায়ালয়ে সুষ্ঠু
বিচার কার্যক্রম করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক স্থানে আদালত এখনও চালু হয়নি। শুধু তাই নয়,
বেশ কিছু স্থানে আদালতপ্রাঙ্গণ বা অবকাঠামোয় ভাঙচুর হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আদালত বা বিচার
বিভাগের অবকাঠামো কার্যোপযোগী করা জরুরি। তা ছাড়া অনেক স্থানে সরকারি আইনজীবীরা এখনও
কাজে যুক্ত হননি। তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। অনেক বিচারকার্য দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
মামলাজটের বিষয়টি আমাদের অজানা নয়। শুধু জুলাই ও আগস্টে নানা অপরাধের বিচারকার্যই নয়,
তার আগের স্বাভাবিক বিচার কার্যক্রম স্বাভাবিক করারও উদ্যোগ নিতে হবে। ২৫ আগস্ট জাতির
উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন,
‘গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী
করা হবে এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা হবে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে
সফল পরিণতি দিতে প্রশাসন,
বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও
নির্বাচনব্যবস্থা,
আইনশৃঙ্খলা খাত এবং তথ্যপ্রবাহে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পূর্ণ
করে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা হবে। এর লক্ষ্য হবে দুর্নীতি, লুটপাট ও গণহত্যার বিরুদ্ধে একটি জবাবদিহিতামূলক রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সূচনা।’ তার এ বক্তব্যকে সাধুবাদ জানাতেই
হয়। তবে বিচার বিভাগের সংস্কার ও দ্রুত কার্যকর করার উদ্যোগ না নিলে এ কাজ অনেকটা কঠিন
হয়ে উঠবে।
বিগত সরকারের
আমলেই আমাদের অর্থনীতি অনেকটাই ধীরগতির হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নেওয়া অনেক প্রকল্প
বাস্তবায়ন, খেলাপি ঋণ, রপ্তানি আয় হ্রাস পাওয়া, আর্থিক খাতের দুরবস্থা, রিজার্ভ সংকট
ইত্যাদি বিষয় রয়েছে। আর্থিক খাতে দুর্নীতি নতুন কিছু নয়। শুধু তাই নয়, বাজারে অনিয়ম-বিশৃঙ্খলার
পেছনে দায়ী সিন্ডিকেট বা চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো পক্ষই
যেন নতুন করে আবার এ সিন্ডিকেট গড়তে না পারে সেদিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। সরকারি-বেসরকারি
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা শনাক্ত করতে হবে।
তাদের আলোচনার মাধ্যমে সংকট চিহ্নিত করার পাশাপাশি সমাধানের পরামর্শ খুঁজে বের করতে
হবে। সমন্বিতভাবে যখন এমন উদ্যোগ নেওয়া হবে তখন আমাদের অর্থনীতি আবার গতি ফিরে পাবে।
একটি কথা মনে রাখতে হবে, অন্তর্বর্তী সরকার স্বল্পসময়ের জন্য দায়িত্ব পালন করবে। তাদের
পক্ষে বড় সময় পাওয়া সম্ভব নয়। পরে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে নতুন যে সরকার আসবে তাদের
জন্য একটি মঞ্চ গড়ে যেতে হবে। এ মুহূর্তে বিভিন্ন খাতে সংস্কার করতে হবে। স্বচ্ছতা-জবাবদিহি
নিশ্চিত করার মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠান যখন সুসংহত করা হবে তখন নতুন সরকারের জন্য
কাজ করা সহজ হবে। সংস্কারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলো নিয়ে ভাবতে হবে।
আমরা দেখছি, অন্তর্বর্তী
সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর অনেকেই নানা দাবিদাওয়া নিয়ে সোচ্চার হয়ে উঠছেন। ২২ আগস্ট
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর এক প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি বিগত সরকারের আমলে বিভিন্ন অসমাপ্ত
প্রকল্পে চাকরিচ্যুত কিংবা বৈষম্যের শিকার অনেকেই তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে সক্রিয় হয়ে
উঠছেন। তাদের দাবি যৌক্তিক হলেও এ মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে উত্থাপন করা ঠিক
নয়। কারণ বিগত সরকারের সব অসঙ্গতি অল্প কদিনে অন্তর্বর্তী সরকার সমাধান করতে পারবে
না। বরং এসব দাবিদাওয়া উত্থাপনের ফলে অন্তর্বর্তী সরকার এ মুহূর্তে জরুরি যে বিষয়গুলো
নিয়ে কাজ করবে তার পথে বাধা তৈরি হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, সদ্য সরকার পতনের পর আকস্মিকভাবে
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে এখনও অন্তর্বর্তী
সরকার সমন্বয় করতে পারেনি এবং এজন্য তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে তাদের কাজ করার
সুযোগ দিতে হবে। কারণ দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টারা এখনও দাপ্তরিক ফাইলপত্র আর বিগত সরকারের
অর্ধসমাপ্ত কাজ পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি। এজন্য তাদের অন্তত কিছুদিন সময় দিতে হবে।
এর মধ্যে সচিবালয় ঘেরাও বা নানা দাবিতে একত্র হওয়া তাদের কাজের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি
করা। প্রশ্ন উঠতেই পারে, এখনই এত দাবি একসঙ্গে উঠছে কেন?
দুর্নীতি নির্মূল
করার বিষয়টি এখন প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। দাপ্তরিক নথি ঘেঁটে কোথায় দুর্নীতি হয়েছে,
এখনও দুর্নীতি চলছে এসব সমীক্ষা খুঁজে বের করা এক দিনের কাজ নয়। এর জন্য অনেক সময় দেওয়া
জরুরি। সংস্কার শুরু করার আগেই যদি বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দাবিদাওয়া উঠে আসতে শুরু করে
তখন অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। যেমনটি আমরা দেখেছি, ২৫ আগস্ট আনসাররা সচিবালয় ঘেরাও
করে। ২৬ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের দাবিদাওয়া
মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার পরও কজন সচিবালয় ঘেরাও করে রাখে। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের
সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। এভাবে দাবিদাওয়া আদায় করার পন্থা সংস্কারের পথে বাধা। একটি
প্রশ্ন আনসার বাহিনীর সদস্যদের করতে হয়। তাদের সঙ্গে যে বৈষম্য হয়েছে তা তো নতুন সরকারের
সৃষ্ট নয়। গত ১৫ বছর তারা কেন এ বিষয়ে সোচ্চার হতে পারলেন না? এর মানে এই নয় যে আনসার
বাহিনীর যৌক্তিক দাবিদাওয়ার পক্ষে নই। কিন্তু একটি সংগঠিত বাহিনী দেশের ক্রান্তিলগ্নে
যখন নীতিনৈতিকতার ভিত্তিতে দাবি উত্থাপন করতে ব্যর্থ হয়, তখন তা অন্য আরও অনেক পক্ষকে
উস্কে দেয়।
অন্তর্বর্তী সরকার চাইলেও এখন সব ধরনের দাবি মেনে নিতে পারবে না। আমাদের অর্থনীতির অবস্থা অনেক খারাপ। এখন উচিত আমাদের সম্মিলিতভাবে অন্তর্বর্তী সরকারকে নানা ক্ষেত্রে সহায়তা করা। যেমন বন্যা পরিস্থিতিতে সারা দেশের মানুষ একত্র হয়ে যে সমন্বয় দেখিয়েছে তা দীর্ঘদিন দেখা যায়নি। এ উচ্ছ্বাসটি জিইয়ে রাখতে হবে। এভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য কাজ করাও সহজ হবে। দেশে আস্তে আস্তে রেমিট্যান্স আসতে শুরু করেছে। বিভিন্ন জায়গায় পুনর্গঠনের কাজে এ অর্থনৈতিক গতি কাজে লাগাতে হবে। কিন্তু সবার দাবিদাওয়া মেনে নেওয়া বা এসব নানা অসমাপ্ত বিষয় আবার পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ তো অন্তর্বর্তী সরকারের নেই। ফলে মানুষকেও সচেতন হতে হবে। হ্যাঁ, সবারই অধিকার আছে। বৈষম্যের বিরুদ্ধেই তো আন্দোলন হয়েছে। সামনে যেন তা না হয় সেদিকেই সবার মনোযোগ থাকা জরুরি। অতীতের দায়ভার যাদের তাদের সে দায় এ নতুন সরকারের ওপর চাপালে তা আমাদেরই ক্ষতি ডেকে আনবে।