রাজনীতি
ড. মো. শামসুল আলম
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৪ ০৯:০৩ এএম
ড. মো. শামসুল আলম
উইনস্টল চার্চিলের
ভাষায় বলতে হয়, বাংলাদেশ সত্যিই রহস্যঘেরা প্রহেলিকাচ্ছন্ন হেঁয়ালি। দেশে নানা ক্ষেত্রে
অপ্রতুলতার পরও অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। অথচ সুশাসনের ক্ষেত্রে
বরাবরই অবক্ষয় ঘটেছে। রাজনৈতিক অবক্ষয় ও সুশাসনের ক্রমাগত অধোগতি বর্তমান প্রজন্ম তো
বটেই দেশের সচেতন মানুষের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এই স্তম্ভেই অতীতেও
লিখেছি, দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়তে না পারার
ব্যর্থতার দায় সব রাজনৈতিক পক্ষকেই নিতে হবে। চলতি বছর আগস্টে এরই প্রতিফলন ঘটেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একটি গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব
দিয়ে সরকারের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। দায়িত্বে নতুন
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা অনেক।
সব ধরনের আর্থিক ও সামাজিক বৈষম্য পরিহার করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কল্যাণ
রাষ্ট্র গড়ার জন্য যে সময় দরকার তা এ সরকারের নেই, এমন বাস্তবতা আমাদের মেনে
নিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোও অন্তর্বর্তী সরকারকে আরও সময় দেওয়ার
বিষয়ে একমত হয়েছে। দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য
এমনটি অবশ্যই ইতিবাচক একটি দিক।
অন্তর্বর্তী সরকার এখনও গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। আপাতত তারা প্রাথমিকভাবে
গোছানোর পর্যায়ে রয়েছে। এ সরকারের সামনে অনেক কাজ। আমরা জানি,
একটি সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর নতুন সংসদ নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করে দেওয়া
আছে আমাদের সংবিধানে। এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে একটি স্বচ্ছ-সুষ্ঠু
নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে মনোযোগ বাড়াতে হবে। রাষ্ট্র মেরামতের
বৃহত্তর দায়িত্ব অর্পণ করতে হবে আগামী দিনের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ওপর। কারণ
জনসংশ্লিষ্টতা ও দায়বদ্ধতা থাকে কেবল নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরই। এরই মধ্যে দেশের
ছাত্ররা এক বড় পরিবর্তন সাধন করেছে। ভবিষ্যতে এর সুবিধাভোগী হবে তারাই। আগামী
দিনে বাংলাদেশ পরিচালিত হবে এই সচেতনদের মাধ্যমেই। আপাতত শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে রাষ্ট্রের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ
দায়িত্ব পালন করেছে এবং করছে। কিন্তু তাদের ফিরে যেতে হবে পড়ার
টেবিলে। মেধা ও মননে তারা গড়ে উঠবে উত্তম নাগরিক হিসেবে। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান
শেষেও ছাত্ররা রাজপথ ছেড়ে চলে গিয়েছিল তাদের শ্রেণিকক্ষে। তবে এত বড় পরিবর্তনের
কারিগর যে ছাত্ররা,
তারা সব সময়ই সরকারের ব্যবস্থাপনার বিষয়ে উৎসুক ও সংশ্লিষ্ট
থাকতে পারে। আশা করি,
দেশের জনগণ এবারের অভ্যুত্থানে ছাত্রদের অবদান যথার্থভাবে
মূল্যায়ন করবে। প্রত্যেকটা হত্যার বিচার হবে। আহতদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনের
সুব্যবস্থা হবে। নিহত ও আহতদের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া
হবে।
সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে রাজনীতিবিদরা প্রায়শই প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন। সুন্দর ভবিষ্যৎ
বিনির্মাণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। প্রকৃতপক্ষে এসবের
অধিকাংশই বাস্তবায়ন করা হয় না, এমন অভিযোগ নতুন নয়। গণতন্ত্র ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কে নানা কথা শোনা গেলেও এর বাস্তব প্রতিফলন প্রায়ই দেখতে পাই না। গণতন্ত্রের লেবাস পরে এ দেশে অতীতে
একাধিক সরকার এসেছে। কিন্তু কালক্রমে তা রূপ নিয়েছে স্বৈরতন্ত্রে।
ক্ষমতার মোহ কোনো কোনো মানুষকে এতই আকর্ষণ করে যে তা অনেকেই ছাড়তে স্বেচ্ছায়
চায় না। ছলে-বলে-কৌশলে তা আঁকড়ে ধরে রাখতে চান।
তার পরিণতি হয় দুঃখজনক। গত আগস্ট আমাদের তা প্রমাণ করে দিয়েছে। স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার জনগণের কাছ থেকে
বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একসময় এই কাঠামোর সাজানো ক্ষমতার বলয়
তাসের ঘরের মতো ভেঙে যায়। সম্প্রতি শেখ হাসিনা সরকারের পতন থেকে আমরা এ শিক্ষাই
গ্রহণ করতে পারি। রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে এ থেকে শিক্ষা নিতে
হবে। দেশের জনগণকে বিচ্ছিন্ন করে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় টিকে থাকা কঠিন। চার্লস
দ্যাগস বলতেন, রাজনীতি এতটাই জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, শুধু রাজনীতিকদের ওপর ছেড়ে
দিলে হবে না। মূলত রাজনীতির অংশ দেশের প্রতিটি মানুষও। আগস্টে দেশের মানুষের মধ্যে
ইতিহাস ও রাজনৈতিক সচেতনতার বিষয়ে আগ্রহ অনেক বেড়েছে। এমনটি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু
সে ক্ষেত্রেও কিছু সংকট থাকে।
দীর্ঘদিন রাজনীতির সঙ্গে সংযুক্ত না থাকার ফলে রাজনীতি সম্পর্কে অনেকেরই কিছু ভ্রান্ত
ধারণা তৈরি হয়েছে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দল পেশিশক্তির ব্যবহারে বা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের
চেষ্টাই করেছে বেশি। অথচ তারা যদি জনসংযোগ বা সচেতনতামূলক রাজনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত
হতো তাহলে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারত। রাজনৈতিক কর্মসূচি মানুষের জন্য শান্তিপূর্ণ
কিছু আনেনি। বিগত কয়েক বছর যেকোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিকে মানুষ দেখেছে নিরাপত্তার সংকট
হিসেবে। রাজনৈতিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে সৃজনশীলতার অভাব থাকায় জনসংযোগ ঘটেনি। অধিকাংশ
ক্ষেত্রে মানুষ অনেক কর্মসূচি এড়িয়ে গেছে। সংস্কারের এই সময়ের মাঝে
যত বেশি সম্ভব জনকল্যাণে কাজ করা উচিত। সুখ-শান্তির জন্য কাজ করে দায়িত্বশীলদের নন্দিত হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। যদি রাজনৈতিক দলগুলো তা করতে পারে তাহলে
এর সুফলভোগী হবে তারাই। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা
রয়েছে সবার। তবে তাদের অন্তর্বর্তীকালীন কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে যার ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতে
নির্বাচিত পক্ষ কাজ করতে পারবে। এসব বিষয় নিয়ে বিশদ আলোচনা জরুরি।
রাজনৈতিক অস্থিরতা একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিম্নগামী
করে দেয়, জিডিপি হ্রাস করে এবং এমনটি দীর্ঘ মেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর ফেলে নেতিবাচক প্রভাব। এমনই এক
প্রেক্ষাপটে, অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখা এবং সব রাজনৈতিক দলের জন্য
সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এ ছাড়া পরবর্তী নির্বাচনে যেন
প্রকৃতপক্ষে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে এবং গণতন্ত্র জয়যুক্ত হয়Ñ এ ব্যাপারেও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি)
একটি সমীক্ষা দেখিয়েছে, দেশের ৮৫ শতাংশ জনগণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে
কার্যকর পদক্ষেপ আশা করে। জনগণ প্রত্যাশা করে, অন্তর্বর্তী সরকার চলমান
সহিংসতা শক্ত হাতে মোকাবিলা করবে। প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি পরিবর্তন করবে
গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নীতি ও আইন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুস্থ গণতান্ত্রিক
প্রক্রিয়ার অংশ। ২০২৩ সালের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স অনুযায়ী, বাংলাদেশ
১৮০ দেশের মধ্যে ১৬২তম স্থান অর্জন করেছে, যা দেশের সংবাদমাধ্যম এবং
সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। অন্তর্বর্তী সরকারকে
এই মৌলিক অধিকারগুলো রক্ষা করতে হবে, যেন দেশের নাগরিক ও মিডিয়াগুলো
স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারে। বর্তমান বাংলাদেশে কৃষির
আধুনিকায়ন এবং শিল্পব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য। পুরোনো পদ্ধতির বিলুপ্তকরণ
এবং প্রয়োজনীয় আধুনিক প্রযুক্তির দুষ্প্রাপ্যতা দূর করে দুর্যোগ সহনশীল ও অধিক
ফলনশীল ফসলের চাষ বাড়াতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারকে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি প্রবর্তন
এবং কৃষিব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নত করতে হবে। এ ছাড়া শহরাঞ্চলে শিল্পকারখানার
জনঘনত্ব কমিয়ে উৎসাহিত করতে হবে আঞ্চলিক উন্নয়ন।
বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সুবিধা জরিপ-২০২২ বলছে, মাত্র
৩৮ শতাংশ পাবলিক স্বাস্থ্যসুবিধা মৌলিক সেবা দিতে সক্ষম। অন্তর্বর্তী সরকারকে
স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি, চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ
প্রদান এবং প্রান্তিক পর্যায়ে এই সেবা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে নাগরিক সুস্থতা
নিশ্চিত করতে হবে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য কমিয়ে
সর্বসাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, জুন
২০২৪ সালে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি হার রিপোর্ট করেছে, যা
দেশের মানুষের জীবনযাত্রায় ফেলছে বহুমাত্রিক বিরূপ প্রভাব।
ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরবরাহ চেইন উন্নতকরণ এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের
জন্য সাবসিডি পরিচালনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতির নিয়ন্ত্রণ, দেশের
স্থিতিশীলতা বজায় রেখে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রতিরোধ করতে রাখবে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন
প্রতিষ্ঠা করা গণতান্ত্রিক শাসনের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। বিশ্ব বিচার প্রকল্প রুল
অব ল ইনডেক্স ২০২৩ অনুযায়ী,
বাংলাদেশ ১৪০ দেশের মধ্যে ১০৫তম স্থান অর্জন করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বচ্ছতা
বাড়াতে হবে। গণতান্ত্রিক অখণ্ডতা রক্ষা ও সর্বত্র ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে
জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে নিশ্চিত করতে হবে সুষম আইন, সমান অধিকার। এসব চ্যালেঞ্জ
এখনও রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলী সদস্যরা, তাদের মেধাকে যদি তারা সংস্কারের কাজে লাগাতে পারেন তাহলে আমরা এবার সত্যিই সুন্দর একটি দেশ গড়ার দিকে এগিয়ে যেতে পারব। সংস্কারই মূল চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন খাতে সংস্কারের দাবি নতুন নয়। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক সরকারের শাসনামলেই তা গুরুত্ব পায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীলরা ইতোমধ্যে বলেছেন, সংস্কার শেষ করে তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যাওয়ার অর্থাৎ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সরকার গঠনের পথ সুগম করবেন। তাদের এই প্রচেষ্টা সফল করতে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা ও অনুশীলনের পথ যেন আর অমসৃণ কিংবা কণ্টকাকীর্ণ না হয় এই দায়িত্ব রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট সবার।